ইবাদতের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো পবিত্রতা অর্জন করা। এর জন্য ওজু বা গোসল করতে হয়। কিন্তু মরুপ্রান্তরে, সফরে, মারাত্মক অসুস্থতায় কিংবা পানির তীব্র সংকটে পড়লে বিকল্প হিসেবে ইসলামে ব্যবস্থা রয়েছে। এটাই ‘তায়াম্মুম’।
‘তায়াম্মুম’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে, যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘সংকল্প করা’ বা ‘ইচ্ছা করা’। ইবাদতের উদ্দেশ্যে পবিত্র মাটি বা মাটিজাতীয় বস্তু দিয়ে মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করে পবিত্রতা অর্জন করাকে তায়াম্মুম বলা হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, “...যদি তোমরা অসুস্থ হও কিংবা সফরে থাকো অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা সেরে আসে কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করো; তা দিয়ে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৬)
মহানবী বলেছেন, “সমগ্র পৃথিবী বা জমিনকে আমার জন্য সেজদার স্থান এবং পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম (তায়াম্মুমের উপাদান) বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৮)
সকল আলেম ও ফকিহদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তায়াম্মুম ওজু ও গোসলের স্থলাভিষিক্ত।
তায়াম্মুমের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ওজর বা গ্রহণযোগ্য কারণ থাকতে হয়। যেমন:
১. পানির অনুপস্থিতি: ওজু বা গোসলের জন্য পর্যাপ্ত পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম করা নিয়ম। মহানবী (সা.) এক ব্যক্তিকে জামাতে নামাজ না পড়ে একা বসে থাকতে দেখে কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। লোকটি বলল, ‘আমি অপবিত্র হয়ে পড়েছি (গোসল লাগবে), কিন্তু কোনো পানি নেই’। নবীজি (সা.) তাকে নির্দেশ দিলেন, ‘তুমি পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করে নাও, সেটাই তোমার জন্য যথেষ্ট।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৮)
২. অসুস্থতা বা ক্ষতির আশঙ্কা: অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা ক্ষতের কারণে পানি ব্যবহারে যদি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার বা জীবন সংশয়ের সম্ভাবনা থাকে, তবে তায়াম্মুম করা জায়েজ। আহত অবস্থায় এক সাহাবির গোসলের প্রয়োজন হলো এবং গোসল করার কারণে ক্ষত বেড়ে তিনি মারা যান। মহানবী (সা.) এই খবরে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “তায়াম্মুম ও মাসেহ করে নিলেই চলত।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৬)।
৩. তীব্র কনকনে ঠান্ডা পানি: পানি যদি তা এতটাই ঠান্ডা হয়ে থাকে যা গরম করার কোনো সুযোগ নেই এবং তা ব্যবহার করলে মৃত্যুর বা মারাত্মক শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, তবে তায়াম্মুম করা অনুমোদিত। জাতে সালাসিলের যুদ্ধে প্রচণ্ড ঠান্ডার রাতে সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.) গোসলের বদলে তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজের ইমামতি করেন এবং নবীজি (সা.) তা অনুমোদন করেছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৪)
৪. নিরাপত্তা ও তৃষ্ণা নিবারণ: পানি দূরে অবস্থান করছে কিন্তু সেখানে যেতে শত্রু, হিংস্র প্রাণী বা জীবনের ঝুঁকি রয়েছে—এমন অবস্থায় তায়াম্মুম করা যায়। এছাড়া নিজের ও পশুপাখির পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে পানি বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনে ওজুর বদলে তায়াম্মুম করা সম্পূর্ণ বৈধ।
তায়াম্মুমের পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ:
১. নিয়ত ও বিসমিল্লাহ: প্রথমে মনে মনে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত করতে হবে এবং ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করতে হবে।
২. মাটিতে হাত লাগানো: উভয় হাতের তালু খোলা রেখে পবিত্র মাটি, বালু বা ধুলোযুক্ত বস্তুর ওপর একবার হালকাভাবে আঘাত করতে হবে এবং অতিরিক্ত ধুলা ঝেড়ে ফেলতে হবে।
৩. মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করা: প্রথমে দুই হাতের তালু দিয়ে পুরো মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করতে হবে। এরপর বাম হাতের তালু দিয়ে ডান হাত এবং ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের কবজি পর্যন্ত অংশ সুন্দরভাবে একবার মাসেহ করে নিতে হবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৫৬৯)
প্রতিকূলতার মুখেও যেন কোনো বান্দা আল্লাহর ইবাদত ও আত্মিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে, সে জন্যই তায়াম্মুমের মতো চমৎকার সহজ বিধান রাখা হয়েছে।