আমেরিকার রমজান যেন বৈচিত্র্যময় কোলাজ। এখানে ইফতারের টেবিলে মিসরের ‘ফুল মেদামেস’-এর পাশে থাকে আমেরিকান ‘চিজ বার্গার’, আর ফিলিস্তিনি ‘মাকলুবা’র পাশে ইতালিয়ান ‘নুটেলা’।
প্রায় ৪০ লক্ষ মুসলিমের এই দেশে রমজান এখন আর ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি মার্কিন সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে।
এ–বছর (২০২৬) রমজানে নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইম স্কয়ার এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। হাজার হাজার মুসলিম ডিজিটাল বিলবোর্ডের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে জামাতে তারাবি পড়েছেন।
এই আয়োজনটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ তুললেও, আয়োজকরা একে ‘বিশ্বের বৃহত্তম দাওয়াহ ইভেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রায় ১৫০০ ইফতার বক্স এবং ১২০০টি অনুবাদকৃত কুরআন সেখানে বিতরণ করা হয়, যা পর্যটকদের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করে।
ভার্জিনিয়ার ফলস চার্চে অবস্থিত দার আল-হিজরা ইসলামিক সেন্টার আমেরিকার মুসলিমদের এক প্রধান কেন্দ্র।
এখানে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭৫০ জন মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন। মজার বিষয় হলো, এই ইফতারে কেবল মুসলিমরাই নন, স্থানীয় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী এবং অমুসলিম প্রতিবেশীরাও অংশ নেন।
ছোটদের জন্য তারাবির পর বিশেষ কুইজ এবং গেমসের আয়োজন করা হয়। বড়রা যখন নামাজে মগ্ন, ছোটরা তখন মসজিদের আলাদা ঘরে ইসলামের ইতিহাস শিখছে বা খেলাধুলা করছে।
ম্যারিল্যান্ডে অবস্থিত দিয়ানেত সেন্টার (ডিসিএ) আমেরিকার অন্যতম সুন্দর মসজিদ। তুর্কি স্থাপত্যে নির্মিত এই মসজিদে রমজান মানেই যেন তুরস্কের কোনো এক মফস্বলে ফিরে যাওয়া।
২০২৬ সালের রমজানে এই কেন্দ্রটি তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কয়েক লক্ষ ডলার অনুদান সংগ্রহ করেছে।
এখানে ইফতার করতে আসা পাকিস্তানি ইঞ্জিনিয়ার ফারজাদ বলেন, “আমি সচ্ছল, কিন্তু একা ইফতার করার চেয়ে শত শত মানুষের সঙ্গে বসে ইফতার করা আমাকে আমার দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
এ–বছরের মজার তথ্য হলো, বিশ্বের অন্যতম ধনী ইতালিয়ান পরিবার ‘ফেরেরো গ্রুপ’ (যাদের পণ্য নুটেলা ও কিন্ডার) এখন আমেরিকার ইফতার টেবিল দখলের লড়াইয়ে নেমেছে।
তারা কেলোগস-এর মতো আমেরিকান সিরিয়াল ব্র্যান্ড কিনে নিয়েছে এবং ‘নুটেলা পিনাট’ এর মতো পণ্য বাজারে এনেছে, যা আমেরিকান মুসলিমদের সেহরি ও ইফতারের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে।
আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনেও রমজানের প্রভাব স্পষ্ট। প্রতিনিধি পরিষদের মুসলিম সদস্য ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব এবং আন্দ্রে কারসন এখন ক্যাপিটল হিলে নিয়মিত ইফতারের আয়োজন করেন।
আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম টমাস জেফারসন ১৮০৫ সালে প্রথম হোয়াইট হাউসে ইফতারের আয়োজন করেছিলেন।
সেই ঐতিহ্য বারাক ওবামা এবং জো বাইডেনও বজায় রেখেছেন, যেখানে তারা আমেরিকান সমাজ বিনির্মাণে মুসলিমদের অবদানের স্বীকৃতি দেন।