বিশ্লেষণ

রোজার শেষে ওজন ও ক্ষুধা দুই–ই বাড়ছে: ধর্মীয় সমাধান কী

রমজান মাসে দীর্ঘ সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা হয়। তাতে এই সময় ওজন কমার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। অনেক রোজাদার লক্ষ্য করেন, মাস শেষে তাদের ওজন কমেনি, বরং কিছুটা বেড়েছে।

আপাতদৃষ্টিতে একে একটি বৈপরীত্য মনে হলেও আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান, হরমোনতত্ত্ব এবং আচরণগত গবেষণা এই ‘রমজান প্যারাডক্স’-এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছে।

কেন আমরা রমজানে বেশি খাই এবং কেন ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে।

সারাদিনে যে পরিমাণ ক্যালরি সাশ্রয় হয়েছিল, ইফতার ও রাতের খাবারে তার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা হয়। এতে ওজনের কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটে না।

ওজন হ্রাসের সাময়িকতা

‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় ৪০টিরও বেশি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, রমজানের প্রথম এক বা দুই সপ্তাহে ওজনে যে সামান্য ঘাটতি তৈরি হয়, তা অত্যন্ত অস্থায়ী।

মাসের শেষ দিকে বা ঈদের পরপরই ওজন পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

এর প্রধান কারণ ‘ক্যালরি কম্পেনসেশন’ বা ক্যালরি প্রতিস্থাপন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে আমাদের মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই ইফতারের পর উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ফলে সারাদিনে যে পরিমাণ ক্যালরি সাশ্রয় হয়েছিল, ইফতার ও রাতের খাবারে তার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করা হয়। এতে ওজনের কোনো গুণগত পরিবর্তন ঘটে না।

দেহ ঘড়ির পরিবর্তন

রমজানে আমাদের ঘুমের সময় ও খাবারের তালিকায় আমূল পরিবর্তন আসে, যা শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা ‘সার্কাডিয়ান রিদম’কে প্রভাবিত করে। কাতার ও যুক্তরাজ্যের একদল গবেষকের মতে, সাহ্‌রির জন্য রাত জাগা এবং অনিয়মিত ঘুমের কারণে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

‘নিউট্রিয়েন্টস’ জার্নালে প্রকাশিত একটি ক্লিনিক্যাল স্টাডিতে দেখা গেছে, রমজানে রাতে ‘লেপটিন’ (যা তৃপ্তির সংকেত দেয়) হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং ইফতারের আগে ‘ঘেরলিন’ (যা ক্ষুধার সংকেত দেয়) হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়।

এই হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে ইফতারের সময় মানুষ তার প্রকৃত চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি খেয়ে ফেলে। এছাড়া ঘুমের স্বল্পতা এই হরমোনের বিশৃঙ্খলাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে ইফতারের সময় মানুষ তার প্রকৃত চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি খেয়ে ফেলে। এছাড়া ঘুমের স্বল্পতা এই হরমোনের বিশৃঙ্খলাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’

দীর্ঘক্ষণ না–খেয়ে থাকার পর খাবারের প্রতি আমাদের মস্তিষ্কের সংবেদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

‘অ্যাপিটাইট’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইফতারের আগে মানুষের মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’ বা পুরস্কার সংশ্লিষ্ট স্নায়বিক সার্কিটগুলো অত্যন্ত সক্রিয় থাকে।

বিশেষ করে চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি মস্তিষ্কের আকর্ষণ তখন থাকে তুঙ্গে।

এ ছাড়া ইফতারে যদি প্রচুর পরিমাণে ভাজাপোড়া এবং কৃত্রিম চিনিযুক্ত শরবত বা মিষ্টি খাওয়া হয়, তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে শর্করাকে সামাল দিতে শরীর প্রচুর ইনসুলিন নিঃসরণ করে, যার ফলে দ্রুত আবার রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়।

এই দ্রুত উত্থান-পতনের ফলে ইফতারের কিছুক্ষণ পরেই আবার তীব্র ক্ষুধা অনুভূত হয়, যা মানুষকে রাতে বারবার খাবার খেতে প্ররোচিত করে।

ধর্মীয়  দৃষ্টিকোণ: মিতব্যয়িতা ও সংযম

বিজ্ঞান শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা বলছে এবং এর সমাধানে ইসলাম বলছে মানসিক ও আত্মিক প্রশিক্ষণের কথা। রমজান কেবল না খেয়ে থাকার মাস নয়, বরং লালসা ও অতিরিক্ত ভোগ বিসর্জনের মাস। অতিরিক্ত আহার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটায় এবং স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

আল্লাহ–তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, “তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)

আল্লাহর রাসুল (সা.) খাবারের পরিমিতিবোধ সম্পর্কে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত একটি সূত্র প্রদান করেছেন, যা মেনে চললে রমজানে ওজন বৃদ্ধি রোধ করা সম্ভব।

তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।
সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১

হাদিসে এসেছে, “আদম সন্তান তার পেটের চেয়ে খারাপ আর কোনো পাত্র পূর্ণ করে না। আদম সন্তানের পিঠ সোজা রাখার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি একান্তই বেশি খেতে হয়, তবে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের (বাতাসের) জন্য রাখা উচিত।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৮০)

শেষ কথা

রমজানে ওজন বাড়া বা বেশি খাওয়ার বিষয়টি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের হরমোন, ঘুম এবং মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের একটি সমন্বিত জৈবিক প্রতিক্রিয়া। তবে এই প্রতিক্রিয়াকে জয় করাই হলো রোজার মূল পরীক্ষা।

ইফতারে অতিভোজন পরিহার করে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিনযুক্ত সুষম খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করলে রমজানের প্রকৃত শারীরিক ও আধ্যাত্মিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

দিনশেষে, আমরা ইফতারে কী খাচ্ছি এবং কতটা সচেতনভাবে খাচ্ছি, সেটাই নির্ধারণ করে আমাদের সুস্থতা।

সূত্র: আল–জাজিরা ডট নেট