আত্মশুদ্ধি

শয়তান যেভাবে মুমিনকে আক্রমণ করে

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই বনি আদমের চিরন্তন শত্রু হলো ইবলিস বা শয়তান। সে সাধারণ কোনো শত্রু নয়; বরং এমন এক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ প্রতিপক্ষ, যে বনি আদমকে জান্নাতের সরল পথ থেকে বিচ্যুত করে জাহান্নামের আগুনে জ্বালানোর জন্য দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মানুষের দুর্বলতায় আঘাত করে ধীরে ধীরে তাকে পাপের পথে নিয়ে যায় এবং পাপকে সুশোভিত করে তাদের সামনে হাজির করে।

আজন্ম শত্রুর প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ

প্রথম মানব আদমকে সেজদা করা ছিল আল্লাহ–তাআলার নির্দেশ। তা অমান্য করার পর থেকেই সে অহংকারে অন্ধ হয়ে বনি আদমের বিরুদ্ধে চিরন্তন যুদ্ধের ঘোষণা দেয়। মানুষদের সতর্ক করার জন্য তাঁর সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কথা আল্লাহ–তাআলা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করে দিয়েছেন।

বলা হয়েছে, ‘সে (ইবলিস) বলল, “হে আমার প্রতিপালক, আপনি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তাই আমি পৃথিবীতে মানুষের সামনে পাপ কাজকে সুশোভিত করে উপস্থাপন করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করে ছাড়ব। তবে আপনার মনোনীত বান্দারা ব্যতীত।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৩৯-৪০)

আমি (চারও দিক থেকে) তাদের ওপর হামলা করব, তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাঁ দিক থেকেও। আর তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।
সুরা আ‘রাফ, আয়াত: ১৭

শয়তানের আক্রমণকৌশল

শয়তান মানুষের সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান ও বাঁ—সব দিক থেকে মানসিক ও আত্মিক আক্রমণ করে।

কোরআনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘তারপর আমি (চারও দিক থেকে) তাদের ওপর হামলা করব, তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাঁ দিক থেকেও। আর তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবে না।’ (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ১৭)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, শয়তান মানুষের সামনে থেকে আক্রমণ করার অর্থ হলো তাকে পরকাল সম্পর্কে সংশয়ে ফেলে দেওয়া; পেছন থেকে আক্রমণ হলো দুনিয়ার প্রতি লোভাতুর করা; ডান দিক থেকে আক্রমণ হলো দ্বীনের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা এবং বাঁ দিক থেকে আসার অর্থ হলো পাপ কাজকে আকর্ষণীয় করে তোলা। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৩/৩৫৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৮৯)

রাসুল (সা.) বলেন, ‘শয়তান আদম সন্তানের রাস্তাগুলোয় বসে থাকে। সে ইসলামের পথে বসে বাধা সৃষ্টি করতে গিয়ে বলে, তুমি ইসলাম গ্রহণ করবে, আর তোমার ধর্ম ও তোমার বাপ–দাদার ধর্ম এবং তোমার পিতার পূর্বপুরুষদের ধর্ম পরিত্যাগ করবে? কিন্তু আদম সন্তান তার কথা অমান্য করে ইসলাম গ্রহণ করে।

তারপর শয়তান তার হিজরতের রাস্তায় বসে বলে, তুমি হিজরত করবে, তোমার ভূমি ও আকাশ পরিত্যাগ করবে? মুহাজির তো একটি রশিতে আবদ্ধ ঘোড়ার ন্যায় (নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে বাধ্য)। কিন্তু সে ব্যক্তি তার কথা অমান্য করে হিজরত করে।

এরপর শয়তান তার জিহাদের রাস্তায় বসে এবং বলে, তুমি কি জিহাদ করবে? এতে নিজেকে এবং নিজের ধন সম্পদকে ধ্বংস করা। তুমি যুদ্ধ করে নিহত হবে, তোমার স্ত্রী অন্যের বিবাহে যাবে, তোমার সম্পদ ভাগাভাগি হবে। সে ব্যক্তি তাকে অমান্য করে জিহাদে গমন করে।

রাসুল (সা.) বলেন, যে এরূপ করবে, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর জন্য অবধারিত। আর যে ব্যক্তি শহীদ হয়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত।

যদি সে ডুবে যায়, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত। আর যদি তার সওয়ারি তাকে ফেলে দিয়ে তার গর্দান ভেঙে দেয় বা মেরে ফেলে, তখনো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর অবধারিত।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩১৩৪)

সে কখনোই মানুষকে সরাসরি গিয়ে বলে না যে ‘তুমি পাপ করো’। বরং সে পাপের কাজকে কল্যাণকর ও সাময়িক প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষকে ধোঁকা দেয়।

রগ-রেশায় শয়তানের বিস্তার

শয়তানের ধোঁকা দেওয়ার ক্ষমতা অপরিসীম। সে মানুষের মনে কুচিন্তা বা ‘ওয়াসওয়াসা’ ঢেলে দেয় এবং অলক্ষ্যে মানুষের চিন্তাভাবনাকে কলুষিত করে। 

সে কখনোই মানুষকে সরাসরি গিয়ে বলে না যে ‘তুমি পাপ করো’। বরং সে পাপের কাজকে কল্যাণকর ও সাময়িক প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষকে ধোঁকা দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) শয়তানের এই সূক্ষ্ম প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের শরীরে রক্তের প্রবাহের মতো প্রবাহিত হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৩৮)

মুমিনের জন্য সুরক্ষা

শয়তানের চক্রান্ত যতই গভীর হোক না কেন, আল্লাহর ওপর ভরসাকারী খাঁটি মুমিনদের ওপর তার কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার খাঁটি বান্দা তাদের ওপর তোমার কোনো ক্ষমতা চলবে না। তাদের রক্ষক হিসেবে আপনার প্রতিপালকই যথেষ্ট।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৬৫)

শয়তানের সঙ্গে বনি আদমের এই যুদ্ধ শারীরিক নয়, এটি ইমান ও আমল রক্ষার আত্মিক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে শত্রুর কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং প্রতিমুহূর্তে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। কারণ, আল্লাহর সাহায্য ও আশ্রয় ছাড়া এই চতুর শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করা অসম্ভব।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর