মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই অপরাধের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণ পরিভাষায় সজ্ঞানে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনো বড় পাপে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ বলা হয়। তবে এই অপরাধ শুধু মানুষের অধিকার হরণ বা সামাজিক আইনের লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মহান স্রষ্টার সঙ্গে কৃত অপরাধ।
ইসলামি নীতিশাস্ত্রে স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি কৃত অপরাধের ভয়াবহ পরিণাম এবং জালেমদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অবকাশের নীতি বা ‘ইস্তিদরাজ’ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে মহান আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো ‘শিরক’ বা তাঁর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করা। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৬/৫৪৪, দারুত তাইয়্যিবাহ, মদিনা, ১৯৯৯)
এর পাশাপাশি অলসতা বা অহংকারবশত নামাজা বা জাকাতের মতো ইসলামের মৌলিক ফরজ ইবাদতসমূহ ইচ্ছাকৃত ত্যাগ করাও আল্লাহর বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ বা অবাধ্যতা।
আল্লাহ যখন কোনো জালেমকে নেয়ামত বাড়িয়ে দেন, তখন তা তার সংশোধনের সুযোগ নয়, বরং তার অহংকারকে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর এক ধরনের অবকাশ।
অন্যদিকে, মানুষের পারস্পরিক অধিকারের (হুকুগুল ইবাদ) ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণহানি ঘটানো। পবিত্র কোরআনে আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের ঘটনার মাধ্যমে মানব ইতিহাসে প্রথম হত্যাকাণ্ডের অপরাধচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩০)
এই ঐতিহাসিক ধারা বজায় রেখে যুগে যুগে মানুষ হত্যা, লুণ্ঠন, মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ এবং পৃথিবীতে নানাভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছে, যা শরীয়তের পরিভাষায় ‘ফাসাদ ফিল আরদ’ বা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত।
অপরাধে নিমজ্জিত কোনো ব্যক্তি যখন দেখে যে তার অন্যায় সত্ত্বেও দুনিয়াতে তার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং মান-সম্মান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন সে এক ধরনের বিভ্রান্তিতে ভোগে। সে মনে করে, “আমি যদি ভুল পথেই থাকতাম, তবে আল্লাহ আমাকে এত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কেন দেবেন?” (ওয়াহবাহ আল-জুহাইলি, আত-তাফসিরুল মুনির, ২১/২৪৪, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ১৯৯১)
ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় ইসতিদরাজ বা খোদায়ী ফাঁদ। আল্লাহ যখন কোনো জালেমকে নেয়ামত বাড়িয়ে দেন, তখন তা তার সংশোধনের সুযোগ নয়, বরং তার অহংকারকে চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর এক ধরনের অবকাশ।
রাসুল (সা.) এই মনস্তত্ত্বের ব্যাপারে উম্মাহকে সতর্ক করে বলেছেন, “তুমি যখন দেখবে যে আল্লাহ কোনো বান্দাকে তার পাপাচার সত্ত্বেও দুনিয়ার কাঙ্ক্ষিত নেয়ামত দান করছেন, তবে বুঝে নেবে যে এটি মূলত ‘ইস্তিদরাজ’।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৭৩১১)
যে ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় ও জাগতিক কল্যাণের নির্দেশ সংবলিত আল্লাহর আয়াতসমূহ পাওয়ার পরও তা অহংকারবশত বর্জন করে, সে অপরাধীদের শীর্ষ স্তরে অবস্থান করে এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তি যোগ্য হয়ে ওঠে।আব্দুর রহমান আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান
জালেমদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো উপদেশদাতাদের উপহাস করে এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়।
তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অবলীলায় পিঠের পেছনে ফেলে রাখে। এই অবাধ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, “তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে, যাকে তার প্রতিপালকের আয়াতসমূহ দ্বারা উপদেশ দেওয়া হয়েছে, অতঃপর সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয়ই আমি অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণকারী।” (সুরা সাজদাহ, আয়াত: ২২)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে এসেছে, যে ব্যক্তি নিজের ধর্মীয় ও জাগতিক কল্যাণের নির্দেশ সংবলিত আল্লাহর আয়াতসমূহ পাওয়ার পরও তা অহংকারবশত বর্জন করে, সে অপরাধীদের শীর্ষ স্তরে অবস্থান করে এবং আল্লাহর কঠিন শাস্তি যোগ্য হয়ে ওঠে। (আব্দুর রহমান আস-সাদি, তাইসিরুল কারিমির রহমান, ১/৬৬৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০২)
আল্লাহ–তাআলা জালেমকে দীর্ঘ সময় অবকাশ দিলেও যখন পাকড়াও করেন, তখন তার আর পালানোর পথ থাকে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৮৬)
দুনিয়ার সাময়িক সুখ-সমৃদ্ধি আল্লাহর সন্তুষ্টির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। মুমিনের উচিত সর্বদা নিজের আমলকে আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই করা। খোদায়ী অবকাশের গোলকধাঁধায় পড়ে যারা অহংকার করে, পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।