প্রতিদান

বেহেশতে ঘর নির্মাণ হবে যাদের জন্য

পার্থিব জীবনে একটি এক চিলতে জমি বা একটি ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার জন্য মানুষ তার জীবনের সোনালী সময়ের সবটুকু শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে দেয়। কিন্তু এই নশ্বর পৃথিবীর সুরম্য অট্টালিকা কি মানুষের শেষ গন্তব্য?

দুনিয়ার বাড়ির জন্য আমরা যতটা ব্যাকুল, জান্নাতের অনন্ত নীড়ের জন্য কি আমরা ততটাই সচেতন?

অবারিত সুখের হাতছানি

আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা কোনো চোখ কোনোদিন দেখেনি, কোনো কান কোনোদিন শোনেনি এবং কোনো মানুষের কল্পনাতেও তা কোনোদিন আসেনি।

সেখানে এক ঘোষক ঘোষণা করতে থাকবেন, “তোমাদের জন্য সুসংবাদ এই যে, তোমরা এখন থেকে চিরকাল সুস্থ থাকবে, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা চিরকাল নেয়ামতের মধ্যে থাকবে, কখনো দুঃখ-কষ্ট তোমাদের স্পর্শ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৩৭)

জান্নাতের এই ঘরগুলো কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং সেগুলো মুমিনের আমল ও তাকওয়ার এক একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

পবিত্র কোরআনে সেই চিরস্থায়ী আবাসনের দৃশ্যপট অঙ্কন করে বলা হয়েছে, “সেদিন অনেক মুখমণ্ডল হবে সজীব ও প্রফুল্ল। তারা তাদের কর্মের সাফল্যে সন্তুষ্ট। তারা থাকবে সুউচ্চ জান্নাতে, যেখানে শুনবে না কোনো অসার কথা। সেখানে থাকবে প্রবাহমান ঝরনাধারা, সুউচ্চ আসনসমূহ, সুবিন্যস্ত পানপাত্র, সারি সারি বালিশ এবং বিছানো গালিচাসমূহ।” (সুরা গাশিয়া, আয়াত: ৮-১৬)

জান্নাতের এই ঘরগুলো কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং সেগুলো মুমিনের আমল ও তাকওয়ার এক একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

জান্নাতের বাড়ির মূল্য

দুনিয়ার যেমন প্রতিটি ইটের জন্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়, জান্নাতের একেকটি প্রাসাদের জন্যও রয়েছে নির্দিষ্ট মূল্য। তবে সেই মূল্য টাকা-পয়সায় নয়, বরং তা পরিশোধ করতে হয় চারিত্রিক মাধুর্য ও আমলের মাধ্যমে।

এর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ‘ধৈর্য’। বিশেষ করে সন্তান হারানোর মতো কঠিন মুসিবতে যারা ধৈর্য ধারণ করে, তাদের জন্য জান্নাতে একটি বিশেষ বাড়ি বরাদ্দ করা হয়।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “যখন কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি আমার বান্দার সন্তানের রূহ কবজ করেছ?’ তারা বলে, ‘হ্যাঁ’। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি তার কলিজার টুকরাকে ছিনিয়ে নিয়েছ?’ তারা বলে, ‘হ্যাঁ’।

তখন আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দা তখন কী বলেছে?’ তারা বলে, ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে’। তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন, ‘জান্নাতে আমার এই বান্দার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করো এবং এর নাম রাখো—আল-হামদ বা প্রশংসার ঘর।’” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০২১)

সন্তান হারানো মানুষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শোক। এই শোকে মুহ্যমান না হয়ে যারা আল্লাহর ফয়সালাকে হাসিমুখে মেনে নেয়, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতে বিশেষ আবাসনের ব্যবস্থা করেন। এটিই হলো ধৈর্য ও শোকর বা কৃতজ্ঞতার মহিমা।

আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমি খাদিজাকে জান্নাতে একটি মুক্তার তৈরি প্রাসাদের সুসংবাদ দিই, যেখানে কোনো শোরগোল নেই এবং কোনো ক্লান্তি নেই।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮২১

জান্নাতে মহীয়সী নারীদের আবাস

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে পুণ্যবতী নারীদের জান্নাতের ঘরের বিশেষ বর্ণনা এসেছে। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুজাহিম (রা.) ছিলেন রাজপ্রাসাদের অধিপতি। কিন্তু ইমান আনার পর তিনি দুনিয়ার রাজকীয় সুখ বিসর্জন দেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, “হে আমার পালনকর্তা, আমার জন্য আপনার সান্নিধ্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন।” (সুরা তাহরিম, আয়াত: ১১)

এশিয়ার এই প্রার্থনাটি ছিল অসাধারণ। তিনি ঘরের আগে ‘ঘরওয়ালা’ বা প্রতিবেশীকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ আল্লাহর সান্নিধ্যই ছিল তাঁর প্রধান কাম্য।

খাদিজা (রা.)-এর জন্য জান্নাতে বিশেষ সুসংবাদ এসেছিল। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন আমি খাদিজাকে জান্নাতে একটি মুক্তার তৈরি প্রাসাদের সুসংবাদ দিই, যেখানে কোনো শোরগোল নেই এবং কোনো ক্লান্তি নেই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮২১)

খাদিজা (রা.) দুনিয়াতে আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে পরম শান্তিতে রেখেছিলেন, বিরূপ পরিস্থিতিতে তাঁকে মানসিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে ঘরটিকে প্রশান্তিময় করে তুলেছিলেন। এর প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে এমন এক বাড়ি দান করবেন যা হবে পরম নীরব ও ক্লান্তিহীন।

উত্তম চরিত্র: জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদের চাবিকাঠি

জান্নাতের প্রাসাদের অবস্থান এবং উচ্চতা নির্ভর করে মুমিনের আখলাক বা চরিত্রের ওপর। আল্লাহর রাসুল (সা.) তিনটি বিশেষ গুণের ভিত্তিতে জান্নাতে তিনটি ঘরের জিম্মাদারী বা নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

১. “আমি জান্নাতের পাদদেশে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যে সত্য হওয়া সত্ত্বেও বিতর্ক বর্জন করে।”

২. “আমি জান্নাতের মধ্যভাগে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যে উপহাসের ছলে হলেও মিথ্যা বলে না।”

৩. “আমি জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখরে একটি ঘরের নিশ্চয়তা দিচ্ছি সেই ব্যক্তির জন্য, যার চরিত্র অত্যন্ত সুন্দর।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০০)

তর্কে জয়ী হওয়া বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাময়িক লাভ করা সহজ, কিন্তু জান্নাতের ঘরের জন্য এই প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিতে হয়।

তাই বলা হয়, “দুনিয়ার জন্য এমনভাবে কাজ করো যেন তুমি চিরকাল বাঁচবে, আর আখেরাতের জন্য এমনভাবে কাজ করো যেন তুমি আগামীকালই মারা যাবে।”

জান্নাতের স্বচ্ছ কক্ষ

জান্নাতে এমন কিছু বিশেষ কক্ষ বা কামরা থাকবে যেগুলোর ভেতর থেকে বাইরের এবং বাহির থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যাবে। এই স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল কক্ষগুলো কাদের জন্য?

এক মরুচারী আরবের প্রশ্নের জবাবে নবীজি (সা.) বলেন, “এই ঘরগুলো তাদের জন্য যারা—কথা বলে মাধুর্যপূর্ণ ও নম্রভাবে, ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করে, নিয়মিত রোজা রাখে এবং যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন রাতে নামাজ (তাহাজ্জুদ) পড়ে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৮৪)

বর্তমান যুগের শব্দদূষণ ও মানুষের প্রতি মানুষের কর্কশ আচরণের ভিড়ে যারা নিজেদের জবানকে পবিত্র রাখে এবং মানুষকে সুন্দর শব্দ দিয়ে আপ্যায়ন করে, জান্নাতের স্বচ্ছ কক্ষগুলো তাদের জন্যই প্রতীক্ষমাণ।

জান্নাতবাসীর আকাঙ্ক্ষা: সুউচ্চ মঞ্জিল

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “জান্নাতবাসীরা তাদের ওপরের কক্ষবাসীদের এমনভাবে দেখবে, যেমন তোমরা দিগন্তের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোকে দেখে থাকো। তাদের মধ্যকার মর্যাদার ব্যবধানের কারণে এমনটি হবে।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, ওগুলো কি কেবল নবীদের স্থান?”

তিনি বললেন, “অবশ্যই না। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, ওগুলো সেই সব মানুষের ঘর যারা আল্লাহর ওপর ইমান এনেছে এবং রাসুলদের সত্য বলে বিশ্বাস করেছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৫৬)

অর্থাৎ নবীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যারা নিজেদের জীবন ও আমলকে সাজাবে, তারাও জান্নাতের সেই আকাশচুম্বী প্রাসাদের মালিক হতে পারবে। আবু বকর (রা.)-এর মতো দৃঢ় বিশ্বাস ও আনুগত্যই একজন মানুষকে সাধারণ স্তর থেকে সেই উচ্চ স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।

তাই বলা হয়, “দুনিয়ার জন্য এমনভাবে কাজ করো যেন তুমি চিরকাল বাঁচবে, আর আখেরাতের জন্য এমনভাবে কাজ করো যেন তুমি আগামীকালই মারা যাবে।”