পাথেয়

অলসতা থেকে মুক্তি পেতে নবীজির জীবন থেকে ৫ শিক্ষা

অলসতা শুধু শরীরের স্থূলতা নয়; এটি হৃদয়েরও এক আত্মিক ব্যাধি, যা মানুষের ভেতরের অসীম সম্ভাবনা ও যোগ্যতাকে পঙ্গু করে দেয়। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে পরে করব বলে ফেলে রাখা এবং কোনো কাজে মন না বসা আধুনিক মানুষের এক নিত্যদিনের সমস্যা।

ইসলামে অলসতাকে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি মানসিক অবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছে। এটি মানুষকে দুনিয়ার কর্মক্ষেত্রে যেমন পিছিয়ে দেয়, তেমনি পরকালের পরম যাত্রার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও উদাসীন করে তোলে। অলস ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতি করে না, বরং পরিবার ও সমাজের জন্যও এক বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ায়

প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজে কখনো অলস ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ, দূরদর্শী ও উদ্যমী ব্যক্তিত্ব। অলসতার অভিশাপ থেকে বেঁচে থাকতে তিনি নিয়মিত মহান আল্লাহর কাছে বিশেষ দোয়া করতেন এবং তাঁর সাহাবিদেরও একটি সচল ও প্রাণবন্ত জীবনযাপনের কৌশল শিখিয়েছেন। 

নবীজির সুন্নাহ ও দিকনির্দেশনার আলোকে অলসতা দূর করার ৫টি কার্যকর উপায় আলোচনা করা হলো।

অলসতা দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের ভেতরের এই মানসিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা এবং তা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।

১. অলসতা থেকে আশ্রয়ের বিশেষ দোয়া

অলসতা দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিজের ভেতরের এই মানসিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা এবং তা থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। মহানবী (সা.) নিজে পাপমুক্ত ও উদ্যমী হওয়া সত্ত্বেও উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিদিন অলসতা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রার্থনা করতেন। 

বলতেন, “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল জুবনি ওয়াল হারামি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজু বিকা মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আউজু বিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাতি।”

অর্থ: হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও বার্ধক্য থেকে, কৃপণতা থেকে। আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই কবরের আজাব থেকে এবং জীবিত ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২২)

২. ভোরে কাজের সূচনা ও বরকত লাভ

অলসতা দূর করার সবচেয়ে বড় কৌশল হলো দিনটি ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করা। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা এবং সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার সংস্কৃতি মানুষের শারীরিক শক্তি ও মানসিক প্রফুল্লতা কেড়ে নেয়।

সকালে দেরি করে উঠলে সারাদিনের কাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং মানুষের মনে বিরক্তি ও আলসেমি ভর করে।

মহানবী (সা.) ভোরের সময়ের বরকতের জন্য আল্লাহর দরবারে বিশেষ দোয়া করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমার উম্মতকে ভোরের প্রহরে বিশেষ বরকত দান করুন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)

সকালে সূর্য ওঠার আগেই জেগে উঠলে শরীর সতেজ থাকে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং দিনের প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খলভাবে শেষ করা সহজ হয়।

মানুষ যখন ঘুম থেকে জেগে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন একটি গিট খুলে যায়। এরপর যখন সে অজু করে, তখন দ্বিতীয় গিটটি খুলে যায়। আর যখন সে নামাজ আদায় করে, তখন তৃতীয় গিটটিও খুলে যায়। ফলে সে সকালে প্রফুল্ল মন ও কর্মচঞ্চল শরীর নিয়ে জেগে ওঠে; তা না হলে সে কলুষিত মন ও অলস শরীর নিয়ে সকালে ওঠে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪২

৩. অলসতা দূর করতে অজু

ঘুম থেকে ওঠার পর যে শারীরিক ও মানসিক অলসতা আমাদের ঘিরে ধরে, তা কাটানোর এক অলৌকিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপায় শিখিয়েছেন প্রিয় নবী (সা.)। তিনি বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ ঘুমিয়ে পড়ে, তখন শয়তান তার মাথার পেছনের অংশে তিনটি গিট দেয় এবং প্রতি গিট দেওয়ার সময় বলতে থাকে—‘তোমার সামনে দীর্ঘ রাত, তুমি ঘুমিয়ে থাকো।’

কিন্তু মানুষ যখন ঘুম থেকে জেগে আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন একটি গিট খুলে যায়। এরপর যখন সে অজু করে, তখন দ্বিতীয় গিটটি খুলে যায়। আর যখন সে নামাজ আদায় করে, তখন তৃতীয় গিটটিও খুলে যায়। ফলে সে সকালে প্রফুল্ল মন ও কর্মচঞ্চল শরীর নিয়ে জেগে ওঠে; তা না হলে সে কলুষিত মন ও অলস শরীর নিয়ে সকালে ওঠে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪২)

নিয়মিত ফজরের নামাজ যথাসময়ে আদায় করা এবং শারীরিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অলসতার শিকল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকরী পথ।

৪. ছোট পদক্ষেপ ও কাজের ধারাবাহিকতা

অনেকে একসঙ্গে অনেক বড় কাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলে। পরে কাজের বিশাল ভার দেখে অলসতায় গড়িমসি করে। প্রিয় নবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন ছোট ছোট পদক্ষেপে কাজের গতি বজায় রাখতে। ইসলামে সাময়িক জোয়ারের কাজের চেয়ে নিয়মিত ছোট ছোট সৎকাজ করাকে বেশি ভালোবাসেন মহান আল্লাহ।

তিনি বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়; যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)

যেকোনো বড় প্রজেক্ট বা কঠিন লক্ষ্যকে ছোট ছোট সহজ অংশে ভাগ করে প্রতিদিন অল্প অল্প করে শেষ করার অভ্যাস গড়ে তুললে অলসতা আর কাজের পথে বাধা হতে পারে না।

অলসতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি আনন্দময়, সতেজ ও কর্মচঞ্চল জীবন গড়ে তোলা কোনো কঠিন বিষয় নয়; এটি মূলত প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাসের সমন্বয়।

৫. কর্মঠ হওয়া এবং হাল না ছাড়া

ইসলাম কোনো অবস্থাতেই নিষ্ক্রিয় বা অলস জীবনযাপনকে সমর্থন করে না। কর্মঠ মুমিন হওয়াই ইসলামি সংস্কৃতির আসল ভিত্তি।

মহানবী (সা.) বলেছেন, “শক্তিশালী ও কর্মক্ষম মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক উত্তম ও প্রিয়... তুমি তোমার জন্য যা কল্যাণকর তা পাওয়ার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং কোনো অবস্থাতেই অলস হয়ে বসে থেকো না বা হাল ছেড়ো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

এছাড়া একটি কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী ভালো কাজের দিকে মনোনিবেশ করার জন্য আল-কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “সুতরাং যখনই কোনো কাজ থেকে অবসর পাও, তখন পরবর্তী ইবাদত ও কর্মপ্রচেষ্টায় কঠোর পরিশ্রম করো, এবং তোমার রবের দিকেই আকুলভাবে মনোনিবেশ করো।” (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)

অলসতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি আনন্দময়, সতেজ ও কর্মচঞ্চল জীবন গড়ে তোলা কোনো কঠিন বিষয় নয়; এটি মূলত প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাসের সমন্বয়।