মধ্যযুগের মুসলিম সভ্যতায় বলবিদ্যা ও পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মুসলিম বিজ্ঞানীরা যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন, তা পরবর্তী ইউরোপীয় নবজাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। কিন্তু বিজ্ঞান ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায় হলো, এই পথপ্রদর্শকদের অনেকেই আজ প্রায় বিস্মৃত।
এমনই এক অবহেলিত বিজ্ঞানী আবদুর রহমান আল-খাজিনি, যিনি পদার্থবিজ্ঞানে গ্যালিলিও, টরিসেলি কিংবা পাসকালের বহু শতক আগেই গতিবিদ্যা, মহাকর্ষ এবং হাইড্রোস্ট্যাটিকসের বুনিয়াদি সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন।
আল-খাজিনির বহু আবিষ্কার ইবনে আল-হাইসামের নামে কিংবা পরবর্তী ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবদুর রহমান আল-খাজিনি (মৃ. ৫৫০ হি. / ১১৫৫ খ্রি.) ছিলেন মধ্য এশিয়ার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র খোরসানের মার্ভ শহরের অধিবাসী। তিনি বাল্যকালে তিনি আল-মারওয়াজির অধীনে লালিত-পালিত হন এবং তৎকালীন খোরসানের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের অধীনে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, মেকানিক্স ও পদার্থবিদ্যায় অগাধ বুৎপত্তি অর্জন করেন।
ল্যাটিন অনুবাদে আল-খাজিনির নাম ‘আলখাজেন’ (Alkhazen) এবং আলোকবিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইসামের ল্যাটিন রূপ ‘আলহাজেন’ (Alhazen)। বানানে মাত্র একটি অক্ষরের (K) পার্থক্য থাকায় ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ প্রায়শই এই দুই বিজ্ঞানীকে গুলিয়ে ফেলেন।
ফলে আল-খাজিনির বহু আবিষ্কার ইবনে আল-হাইসামের নামে কিংবা পরবর্তী ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। (কাদরি তুকান, তুরাসুল আরবিল ইলমি ফির রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল ফালাক, পৃষ্ঠা: ৩১৬, জামিআত আদ–দুওয়াল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৫৪)
আল-খাজিনির শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ৫১৬ হিজরিতে (১১২২ খ্রি.) রচিত তাঁর কালজয়ী আকরগ্রন্থ ‘মিজানুল হিকমাহ’ (প্রজ্ঞার দাঁড়িপাল্লা)। বলবিদ্যা ও হাইড্রোস্ট্যাটিকসের ওপর মধ্যযুগে রচিত এই গ্রন্থটিকে বিজ্ঞান ইতিহাসের অন্যতম সেরা রচনা হিসেবে গণ্য করা হয়। পাঁচ পাল্লাবিশিষ্ট একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম দাঁড়িপাল্লা বা হাইড্রোস্ট্যাটিক ব্যালেন্স উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি বাতাসে ও পানিতে বস্তুর ওজনের তারতম্য পরিমাপ করেছিলেন।
ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী ইভানজেলিস্তা টরিসেলি, ব্লেজ পাসকেল কিংবা রবার্ট বয়েল বায়ুমণ্ডলের চাপ ও বায়ুর প্লবতা নিয়ে কাজ করে যে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তার বহু শতক আগেই আল-খাজিনি তাঁর গ্রন্থে প্রমাণ করেছিলেন যে বায়ুর নির্দিষ্ট ওজন রয়েছে এবং তরল পদার্থের মতো বায়ুর মধ্যেও ডুবন্ত বস্তুর ওপর ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা বল বা উত্তোলক শক্তি কাজ করে। (আম্মার মুহাম্মদ আল-নাহার, দূরু উলামায়ি হাদারাতির আরাবিয়্যাতি ওয়াল ইসলামিয়্যাতি ফি তাসিসি উলুমিল হাদিসাহ, পৃষ্ঠা: ১২৭, দারুল বারাকাহ, দামেস্ক, ২০১১)
তিনি স্পষ্ট করে দেখান যে আর্কিমিডিসের প্লবতা সূত্র শুধু তরল পদার্থের জন্য নয়, বরং গ্যাসীয় পদার্থের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
শুধু কঠিন পদার্থই নয়, বিভিন্ন তাপমাত্রার বিশুদ্ধ পানি, সমুদ্রের পানি, গরুর দুধ, অলিভ অয়েল এবং মানুষের রক্তের আপেক্ষিক গুরুত্বও তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করেছিলেন।
পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে পরন্ত বস্তুর সূত্র ও গতির আবিষ্কারের একক কৃতিত্ব প্রায়শই সপ্তদশ শতকের ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলিকে দেওয়া হয়। তবে আল-খাজিনির মিজানুল হিকমাহ গ্রন্থে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তিনি গ্যালিলিওর বহু আগেই বস্তুর পতনকাল, অতিক্রান্ত দূরত্ব এবং গতির মধ্যকার সঠিক সম্পর্ক গাণিতিকভাবে উন্মোচন করেছিলেন। (ওয়ালি আল-দিফা ও জালাল শাওকি, আলামুল ফিজিয়া ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা: ২৪৯, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
আল-খাজিনি তাঁর বইতে গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখান, বস্তু যখন পৃথিবীর দিকে পতিত হয়, তখন তার গতি, অতিক্রান্ত দূরত্ব এবং সময়ের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সম্পর্ক কাজ করে। তিনি মহাকর্ষের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেখেন—ওজন হলো এমন একটি আকর্ষণ বল, যা বস্তুকে সর্বদাই পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টানে।
এমনকি কোনো বস্তু যখন ভিন্ন ঘনত্বের তরল বা বায়ুর মধ্য দিয়ে নেমে যায়, তখন তার গতির পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, তার নির্ভুল নীতিও তিনি প্রণয়ন করেছিলেন। এছাড়া পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি পৌঁছালে পানির ঘনত্ব যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তা-ও তিনি গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন; যা তাঁর গবেষণার দুই শতক পর রজার বেকন পুনরায় আলোচনা করেন।
আপেক্ষিক গুরুত্ব (স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি) এবং বিভিন্ন ধাতু ও রত্নপাথরের ঘনত্ব নির্ণয়ে আল-খাজিনির সূক্ষ্মতা আধুনিক বিজ্ঞানের পরিমাপকে টেক্কা দেয়।
আল-বিরুনির ব্যবহৃত শঙ্কু আকৃতির পাত্রের নকশাকে আরও উন্নত করে আল-খাজিনি একটি বিশেষ পরিমাপক যন্ত্র তৈরি করেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে তিনি সোনা, পারদ, তামা, লোহা, সিসা এবং বিভিন্ন মূল্যবান রত্নপাথরের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করেন।
আল-খাজিনির হিসাবে সোনার আপেক্ষিক গুরুত্ব ছিল ১৯.০৫ (আধুনিক নিখুঁত মান: ১৯.২৬), পারদের ১৩.৫৯ (আধুনিক মান: ১৩.৫৯), তামার ৮.৮৩ (আধুনিক মান: ৮.৮৫) এবং লোহার ৭.৭৪ (আধুনিক মান: ৭.৭৯)। (আলদো মিয়েলি, আল-ইলমু ইন্দাল আরব, পৃষ্ঠা: ১৯৪, দারুল কলাম, কায়রো, ১৯৬২)
শুধু কঠিন পদার্থই নয়, বিভিন্ন তাপমাত্রার বিশুদ্ধ পানি, সমুদ্রের পানি, গরুর দুধ, অলিভ অয়েল এবং মানুষের রক্তের আপেক্ষিক গুরুত্বও তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিমাপ করেছিলেন। তাঁর এই পরিমাপের ভুলের মাত্রা প্রতি দুই হাজার দুইশো গ্রামের বিপরীতে মাত্র দশমিক ছয় গ্রামের চেয়ে কম ছিল।
আল-খাজিনির মতো এত অসামান্য অবদান রাখা বিজ্ঞানী বিজ্ঞান ইতিহাসে যেমন অবহেলার শিকার হয়েছেন, তেমনটা খুব কম মনীষীর ভাগ্যেই ঘটেছে।কাদরি তুকান, ইতিহাসবিদ
বিজ্ঞান ইতিহাসের এই বিস্ময়কর আকরগ্রন্থ মিজানুল হিকমাহ দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের তাব্রিজ শহরে রুশ কূটনীতিক খানিকভ (মৃ. ১৮৭৮ খ্রি) কর্তৃক পুনরায় আবিষ্কৃত হয়। পরে জার্মান বিজ্ঞানী ওডিমানসহ বহু ইউরোপীয় গবেষক এই বইয়ের বিভিন্ন অংশ অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ করলেও রহস্যজনকভাবে পুরো বইটি একত্রে ব্যাপক প্রচারের আলো দেখেনি।
ইতিহাসবিদ কাদরি তুকান আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আল-খাজিনির মতো এত অসামান্য অবদান রাখা বিজ্ঞানী বিজ্ঞান ইতিহাসে যেমন অবহেলার শিকার হয়েছেন, তেমনটা খুব কম মনীষীর ভাগ্যেই ঘটেছে।” (কাদরি তুকান, তুরাসুল আরবিল ইলমি ফির রিয়াদিয়্যাতি ওয়াল ফালাক, পৃষ্ঠা: ৩১৬, জামিআত আদ–দুওয়াল আরাবিয়্যা, কায়রো, ১৯৫৪)
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিটি ধাপে—কাইনেমেটিক্স, হাইড্রোস্ট্যাটিক্স কিংবা গ্র্যাভিটেশনাল মেকানিক্সে—যে বৈজ্ঞানিক নীতির ওপর আধুনিক প্রযুক্তি দাঁড়িয়ে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর নির্মাণ করেছিলেন আল-খাজিনির মতো দূরদর্শী মুসলিম বিজ্ঞানীরা।
আল-খাজিনির মতো হারিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানীদের অবদানকে পুনর্মূল্যায়ন করা এবং শিক্ষা ও গবেষণার অঙ্গনে তাঁদের সঠিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।