সিরাত

মহানবী (সা.) কেমন জুতা পরতেন

সাহাবিরা নবীজির স্মৃতিবিজড়িত কোনো বিষয়কেই সাধারণ মনে করতেন না; বরং তাঁর ব্যবহার করা সামান্যতম বস্তুকেও তাঁরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্মারক হিসেবে সংরক্ষণ করতেন।

নবীজির পবিত্র পাদুকা বা জুতাও তেমনি এক বরকতময় নিদর্শন।

হাদিস ও শামায়েল শাস্ত্রের গ্রন্থগুলোতে তাঁর জুতার উপাদান, চামড়ার বৈশিষ্ট্য, আকৃতি, ফিতা বাঁধার ধরন এবং সাহাবিদের তা সংরক্ষণের হৃদয়স্পর্শী বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে।

জুতা পরা নবীদের সুন্নত

পায়ে জুতা পরিধান করা শুধু নবীজির সুন্নত নয়; বরং এটি পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদেরও ঐতিহ্য ছিল। আল্লাহ–তাআলা তুর পাহাড়ে নবী মুসাকে সম্বোধন করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘অতএব, তোমার জুতা খুলে ফেলো; নিশ্চয়ই তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২)

ইমাম আবু বকর ইবনুল আরাবি উল্লেখ করেছেন, পায়ে পাদুকা রাখা নবীদের এক বিশেষ শিষ্টাচার ও সুন্নত। (আল-ইত্তিহাফ বিহুব্বিল আশরাফ, পৃষ্ঠা: ১২১)

ব্যবহারিক দিক থেকেও জুতা মানুষের চলাচলের স্বাচ্ছন্দ্য আনে এবং আঘাত ও ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ থেকে পা সুরক্ষিত রাখে। রাসুল (সা.) নিয়মিত জুতা ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা অধিক পরিমাণে জুতা ব্যবহার করো; কেননা মানুষ যতক্ষণ জুতা পরে থাকে, সে যেন একপ্রকার আরোহী অবস্থায় থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৯৬)

তিনি মূলত পাকা চামড়ার তৈরি একধরনের চটি বা স্যান্ডেলসদৃশ জুতা পরতেন, যা লোমহীন ছিল এবং যার মধ্যে দুটি করে চামড়ার ফিতা (ক্বিবাল) সংযুক্ত থাকত।

নবীজির জুতার গঠন

শামায়েল শাস্ত্রের গ্রন্থগুলোয় নবীজির জুতার বিশদ বিবরণ রয়েছে। তিনি মূলত পাকা চামড়ার তৈরি একধরনের চটি বা স্যান্ডেলসদৃশ জুতা পরতেন, যা লোমহীন ছিল এবং যার মধ্যে দুটি করে চামড়ার ফিতা (ক্বিবাল) সংযুক্ত থাকত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৫৭)

তাঁর জুতা এমনভাবে তৈরি ছিল, যা হাঁটাচলার সময় সহজে খুলে পড়ত না। জুতার সামনের অংশ, মাঝখানের খিলান এবং গোড়ালির দিকটি পায়ের স্বাভাবিক অঙ্গসংস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ মানানসই ছিল। 

সামনের দিকটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা প্রশস্ত ও ছড়ানো ছিল, যাতে পায়ের আঙুলগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে। জুতার গঠন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘ পথচলার উপযোগী।

জুতার তিন বিশেষ নির্মাণশৈলী

ঐতিহাসিক ইবনে সাদ তাঁর আত-তাবাকাত আল-কুবরা এবং আল্লামা কাস্তাল্লানি (রহ.) তাঁর আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ গ্রন্থে নবীজির জুতার তিনটি প্রধান নির্মাণবৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন:

১. মুখাসসারাহ: জুতার মাঝখানের অংশটি মানুষের পায়ের স্বাভাবিক খিলানের (আর্চ) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিছুটা সংকুচিত বা বাঁকানো ছিল, যা চলাচলে পা–কে আরাম দিত।

২. মুআক্কাবাহ: জুতার পেছনের অংশ বা গোড়ালির দিকটি চামড়ার বিশেষ পটি বা বন্ধনী দিয়ে এমনভাবে সুরক্ষিত ছিল, যা পায়ের গোড়ালিকে স্থির রাখত এবং জুতা ফসকে যাওয়া প্রতিরোধ করত।

নবীজি (সা.) মজলিস থেকে ওঠার সময় ইবনে মাসউদ পরম যত্নে তাঁর পায়ে জুতা পরিয়ে দিতেন; আর নবীজি যখন কোথাও বসতেন, তখন তিনি তা খুলে নিয়ে নিজের দুই বাহু বা বগলের নিচে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে রাখতেন।

৩. মুলাসসানাহ: জুতার সামনের অংশটি সামান্য সূক্ষ্মভাবে জিহ্বার মতো কিছুটা প্রলম্বিত ছিল, যা পাতার অগ্রভাগ ও আঙুলগুলোকে আঘাত থেকে সুরক্ষা দিত এবং চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখত। (আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ, ১/৮০)

সাহাবিদের গভীর অনুরাগ

নবীজির ব্যবহার্য সামগ্রীর প্রতি সাহাবিদের ভক্তি ও ভালোবাসার অনুপম দৃষ্টান্ত ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। তিনি নবীজির বিশেষ সেবক ছিলেন এবং তাঁর জুতা, বালিশ, মিসওয়াক ও অজু করানোর পানি বহন করতেন।

নবীজি (সা.) মজলিস থেকে ওঠার সময় ইবনে মাসউদ পরম যত্নে তাঁর পায়ে জুতা পরিয়ে দিতেন; আর নবীজি যখন কোথাও বসতেন, তখন তিনি তা খুলে নিয়ে নিজের দুই বাহু বা বগলের নিচে পরম শ্রদ্ধায় জড়িয়ে রাখতেন।

এই গভীর সেবার কারণেই সাহাবিদের মধ্যে তিনি ‘সাহিবুন নালাইন’ (নবীজির দুই জুতার খাদেম) হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৬৩)

  • আল আমীন আজহার: শিক্ষক, জামিয়া কুরআনিয়া দারুল উলুম চরকমলাপুর মাদ্রাসা, ফরিদপুর