পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত জীবনের গভীর এক দর্শনের দিকে ইঙ্গিত করে। আল্লাহ বলেছেন, “আমি তোমার ওপর আমার পক্ষ থেকে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে গড়ে ওঠো।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৩৯)
পৃথিবীতে মানুষের আগমনই ঘটে সফলতার সন্ধানে। মানুষ সহজাতভাবেই সুখ চায়, আর সেই সুখের আকাঙ্ক্ষা তাকে নিরন্তর ছোটাছুটি বা চেষ্টার দিকে ঠেলে দেয়।
কোরআনের দৃষ্টিতে এই সফলতা কেবল বৈষয়িক প্রাপ্তি নয়, বরং এটি একটি সুসংহত ও দ্বিমুখী প্রক্রিয়া।
ইসলাম আমাদের শেখায় যে জীবন চলে কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে। এই নিয়মগুলো মহান আল্লাহ এমনভাবে নির্ধারণ করেছেন যা মুসলিম-অমুসলিম, ছোট-বড় সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর। এটি হলো কারণভিত্তিক সফলতা।
অনেকটা গাণিতিক সূত্রের মতো—এক যোগ এক সমান দুই। যে পরিশ্রম করবে, সে ফল পাবে; যে বীজ বপন করবে, সে ফসল কাটবে।
আমি তোমার ওপর আমার পক্ষ থেকে ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে গড়ে ওঠো।কোরআন, সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৩৯
আজকের আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তি, স্থাপত্য বা চিকিৎসাশাস্ত্রে যে অভাবনীয় উন্নতি করেছে, তা মূলত এই জাগতিক কারণগুলো (কসমিক ল) ব্যবহারেরই ফল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা যে বিজ্ঞান, প্রকৌশল বা অর্থনীতি পড়ি, তা মূলত মহাজাগতিক এই নিয়মগুলোর রহস্য উদ্ঘাটনেরই নামান্তর।
ইসলাম একজন মুমিনকে এই পথে সফল হতে উৎসাহিত করে। তবে পার্থক্য হলো, একজন মুমিন এই সফলতার কৃতিত্ব নিজের মেধা বা শ্রমকে না দিয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে এটি চরম ঔদ্ধত্য যে কেউ বলবে, “এসব তো আমি আমার জ্ঞানবলে পেয়েছি।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ৭৮)
বরং মুমিনের ভাষা হবে, “আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি আমাদের এই পথ দেখিয়েছেন।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৪৩)।
কোরআন আমাদের সফলতার আরেকটি অদৃশ্য জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যাকে বলা যায় খোদায়ি অভিভাবকত্ব। এটি কোনো ভৌত বা বস্তুগত নিয়মের তোয়াক্কা করে না। একে আমরা খোদায়ি সফলতা বলতে পারি। এটি অর্জিত হয় ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংযোগের মাধ্যমে।
এই খোদায়ী সফলতা দুইভাবে আসতে পারে:
১. সরাসরি হস্তক্ষেপ: যখন জাগতিক সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন আল্লাহর বিশেষ সুরক্ষা মুমিনকে উদ্ধার করে। যেমনটি ঘটেছিল হিজরতের সময় সওর গুহায়। যখন আবু বকর (রা.) শঙ্কিত হয়ে বলেছিলেন, শত্রুরা পায়ের নিচে তাকালেই আমাদের দেখে ফেলবে, তখন মহানবী (সা.) বলেছিলেন, “সেই দুই ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, যাদের তৃতীয়জন স্বয়ং আল্লাহ?” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)
অনেক সময় আল্লাহ সরাসরি উদ্ধার না করে মানুষকে এমন বুদ্ধি বা পথ বাতলে দেন, যা তাকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়।
হজরত মুসা (আ.)-কেও আল্লাহ অভয় দিয়ে বলেছিলেন, “ভয় পেয়ো না, আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমি সব শুনি ও দেখি।” (সুরা তোয়াহা, আয়াত: ৪৬)
২. সঠিক পথের দিশা: অনেক সময় আল্লাহ সরাসরি উদ্ধার না করে মানুষকে এমন বুদ্ধি বা পথ বাতলে দেন, যা তাকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়। যেমন উত্তাল সমুদ্রের সামনে যখন মুসা (আ.)-এর সঙ্গীরা নিশ্চিত পরাজয় দেখছিলেন, তখন ওহি এল—লাঠি দিয়ে সাগরে আঘাত করার। (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ৬৩)
একইভাবে মারয়াম (আ.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নাড়া দিতে। (সুরা মারিয়াম, আয়াত: ২৫)
আল্লাহর এই বিশেষ নজর পাওয়ার জন্য কিছু চাবিকাঠি রয়েছে যা একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে:
প্রকৃত সফলতা হলো জাগতিক চেষ্টার সঙ্গে খোদায়ি সাহায্যের অপূর্ব সমন্বয়। আমরা যেন কেবল উপকরণের ওপর নির্ভর না করি, আবার উপকরণ ত্যাগ করে হাত গুটিয়েও বসে না থাকি।
দোয়া ও জিকির: দোয়া হলো ইবাদতের মগজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, “দোয়া ছাড়া আর কিছুই ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৯)
তওবা ও দরুদ: ব্যবসায়িক চেষ্টা যেমন মুনাফা আনে, তেমনি তওবা ও দরুদ পাঠ খোদায়ি সফলতা ত্বরান্বিত করে।
তাকওয়া ও সদাচার: নিজের উত্তরসূরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা চিন্তিত, তাদের জন্য কোরআনের দাওয়াত হলো—তারা যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং সঠিক কথা বলে। (সুরা নিসা, আয়াত: ৯)
মানুষের সেবা: অন্যের বিপদে এগিয়ে এলে আল্লাহ সেই ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এটি আল্লাহর এক অমোঘ প্রতিশ্রুতি। এমনকি কেউ যদি উপকারের বদলে অপকারও করে, তবুও মুমিনের উচিত নিজের গুণ ত্যাগ না করা।
পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃত সফলতা হলো জাগতিক চেষ্টার সঙ্গে খোদায়ি সাহায্যের অপূর্ব সমন্বয়। আমরা যেন কেবল উপকরণের ওপর নির্ভর না করি, আবার উপকরণ ত্যাগ করে হাত গুটিয়েও বসে না থাকি।