বর্তমান বিশ্ব এক দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে পারস্পরিক মতপভেদ দূর করতে এবং সমঝোতার সেতুবন্ধন তৈরিতে ‘সংলাপ’ (Dialogue) একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে—ইসলামে সংলাপ কি কেবলই একটি উচ্চতর চারিত্রিক গুণ, নাকি এটি একটি সভ্য জাতি গঠনের অপরিহার্য শর্ত?
পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ এবং নবীজির জীবনচরিত (সিরাত) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইসলামে সংলাপ কেবল কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি দ্বীন প্রচারের মূল ভিত্তি, যুক্তি প্রমাণের মাধ্যম এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সাথে সহাবস্থানের প্রধান কৌশল। (আব্দুল কারিম যায়দান, উসুলুদ দাওয়াহ, পৃষ্ঠা ৩৭৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০২)
পবিত্র কোরআনের পরতে পরতে আমরা সংলাপের অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাই। আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের কওমের মধ্যে সংলাপ, মুমিন ও কাফেরদের মধ্যে সংলাপ, এমনকি মহান আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যেও সংলাপের এক অভাবনীয় চিত্র কোরআনে ফুটে উঠেছে।
আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “তুমি তোমার রবের পথের দিকে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করো অত্যন্ত সুন্দর পন্থায়।” (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)
এখানে লক্ষণীয় যে, ইসলাম বিতর্ক বা সংলাপকে নীতিগতভাবে প্রত্যাখ্যান করে না; বরং তাকে ‘আহসান’ বা সর্বোত্তম পন্থার শিকলে আবদ্ধ করে একটি মার্জিত রূপ দান করে। অর্থাৎ ইসলামে ভিন্নমত পোষণ করা অপরাধ নয়, বরং সেই ভিন্নমতের ব্যবস্থাপনা (Management) কেমন হবে, তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই বিখ্যাত সংলাপের কথা আমরা জানি, যেখানে তিনি নিজেকে রব দাবি করা নমরুদের সামনে অকাট্য যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ইবরাহিম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৮)
ইবরাহিম (আ.)-এর এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক, শান্ত এবং ভদ্রোচিত। সংলাপের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সত্যকে প্রকাশ করা এবং প্রমাণের মাধ্যমে ভ্রান্তিকে দূর করা, কোনো প্রকার ব্যক্তিগত শত্রুতা বা গালমন্দ নয়। (ইমাম ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ২/৩৮৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল উদ্দেশ্যমুখী সংলাপের একটি বাস্তব উদাহরণ। মক্কার কোরাইশ নেতা উতবা বিন রবিআ যখন নবীজির কাছে এসে ইসলাম প্রচার বন্ধের বিনিময়ে অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভন দেখাল, তখন নবীজি তাকে মাঝপথে থামিয়ে দেননি। বরং তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনেছিলেন।
উতবার কথা শেষ হলে তিনি বললেন, “হে আবুল ওয়ালিদ, আপনার কি সব বলা শেষ হয়েছে?” সে বলল, “হ্যাঁ”। এরপর নবীজি পবিত্র কোরআনের সুরা ফুসসিলাতের প্রাথমিক আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনালেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ১/২৯৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৯)
এই ঘটনা থেকে আমরা শ্রবণশৈলী বা শোনার আদব শিখতে পারি। উচ্চবাচ্য না করে কেবল যুক্তির মাধ্যমে যে বিপক্ষকে কুপোকাত করা যায়, এটি তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। নবীজি (সা.) কেবল মক্কার মুশরিকদের সাথেই নয়, বরং ইহুদি, খ্রিষ্টান এমনকি মোনাফেকদের সঙ্গেও নিয়মিত সংলাপ করতেন।
যদি সংলাপে সত্য প্রকাশের সামান্যতম সুযোগ থাকত, তবে তিনি কাউকে বাদ দিতেন না। এমনকি ‘দ্বিতীয় বায়আতে আকাবা’ ছিল আনসার ও নবীজির মধ্যে একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও ফলপ্রসূ সংলাপের ফসল, যেখানে জোরজবরদস্তি নয় বরং প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাঁদেরকে সন্তুষ্ট করা হয়েছিল। (সাফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ১৫৮, আল-কোরআন পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ২০০৭)
ইসলামি দৃষ্টিতে সংলাপ কেবল ধর্মীয় দাওয়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পারিবারিক জীবন, কর্মস্থল, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এক অপরিহার্য বিষয়। সমস্যা সমাধান এবং উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তবে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৯)
এই মীমাংসার প্রথম ধাপই হলো সংলাপ।
পারস্পরিক বিবাদ মিটিয়ে ফেলার জন্য ইসলাম সংলাপকে একটি সামাজিক ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি আমলের কথা বলব না, যার মর্যাদা রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও বেশি? সাহাবিগণ বললেন, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল!’ তিনি বললেন, ‘তা হলো বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দেওয়া; কেননা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতিই হলো মুণ্ডনকারী (সব ধ্বংসকারী)’।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫০৯)
এখানে ‘সমঝোতা’ বলতে সংলাপের মাধ্যমে সৃষ্ট শান্তিকেই বোঝানো হয়েছে। (ইমাম গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/১৮৬, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৯৮)
অনেকে মনে করেন ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে সংলাপ করা মানে হলো নিজের আকিদা বা আদর্শের ব্যাপারে আপস করা। অথচ বাস্তবতা হলো, সংলাপ হলো দাওয়াতের প্রথম সিঁড়ি এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
নবীজি (সা.) নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে সংলাপ করেছিলেন, তাঁদেরকে মসজিদে নববীতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন এবং অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে তওহিদের দলিল পেশ করেছিলেন। তিনি তাঁদের ওপর কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেননি, বরং হেকমতের মাধ্যমে সত্য তুলে ধরেছিলেন। (ইউসুফ আল-কারজাভি, আল-খাসাইসুল আম্মাহ লিল ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৬৫, মাকতাবাহ ওয়াহবা, কায়রো, ১৯৯৭)
সংলাপ কখনো পরাজয় নয়, বরং এটি আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যার কাছে সত্য আছে, সে কখনো আলোচনা করতে ভয় পায় না। ইসলাম সংলাপকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে এক উদার ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে।
আজকের দুনিয়ায় আমরা এক চরম ‘সংলাপ সংকটের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। অসহিষ্ণুতা, গোঁড়ামি, দ্রুত কাউকে ‘ভুল’ বলে লেবেল লাগিয়ে দেওয়া এবং অন্যের মতামতকে তুচ্ছজ্ঞান করা আমাদের মজ্জাগত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তাকালে দেখা যায়, সামান্য মতভেদের কারণে মানুষ কতটা কদর্য ভাষায় লিপ্ত হয়। অন্যের প্রতি কুধারণা এবং ন্যায়বিচারের অভাব আজকের সমাজকে কলুষিত করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের ‘সংলাপ সংস্কৃতি’ (Culture of Dialogue) গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই সংস্কৃতির কিছু মৌলিক স্তম্ভ হলো:
অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা: ভিন্নমত থাকলেও মানুষ হিসেবে তাকে সম্মান করা।
নিবিষ্টভাবে শোনা: কেবল উত্তর দেওয়ার জন্য নয়, বরং বোঝার জন্য অন্যের কথা শোনা।
সাধারণ বিষয়গুলো খুঁজে বের করা: বিভেদের আগে আমাদের মধ্যে কী কী মিল আছে, তা শনাক্ত করা।
বিনয়: নিজের মতকেই একমাত্র ধ্রুব সত্য মনে না করা; কারণ সত্য যে কারও মাধ্যমেই প্রকাশ পেতে পারে। (মুহাম্মদ আল-গাজালি, খুুলুকুল মুসলিম, পৃষ্ঠা ১৪২, দারুল কলম, দামেস্ক, ২০০১)
সংলাপ শক্তির পরিচায়ক
একটি সভ্যতা তখনই টিকে থাকে, যখন তার সদস্যরা একে অপরের সাথে কথা বলার ক্ষমতা রাখে। ইসলাম যখন সংলাপের পথ দেখিয়েছে, তখন তা দুর্বলতার কোনো স্থান থেকে দেখায়নি; বরং তা ছিল আত্মবিশ্বাস, প্রজ্ঞা এবং উদারতার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “যদি তুমি রূঢ় ও কঠোর চিত্ত হতে, তবে তারা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
আমাদের ঘর, বিদ্যালয়, অফিস এবং সামাজিক প্রতিটি স্তরে যদি আমরা সংলাপের এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে পারি, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব। সংলাপ যত উন্নত ও রুচিশীল হবে, আদর্শের গ্রহণযোগ্যতা তত বাড়বে। বর্তমান অস্থির বিশ্বে সংলাপ কেবল একটি উন্নত চরিত্রই নয়, বরং মানব সভ্যতার টিকে থাকার এক অপরিহার্য দাবি।