ধর্ম-দর্শন

কোরআনের আলোকে বিবাহিত জীবনের অপূর্ব ৭ সৌন্দর্য

নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ উপায়ে চিরন্তন ভালোবাসা, সহানুভূতি ও আস্থার ভিত্তি তৈরি করতেই বিবাহের মতো বরকতময় সামাজিক কাঠামোর সূচনা। মানুষের অন্তরে একে অপরের জন্য গভীর অনুরাগ ও সহমর্মিতা বুনে দেওয়া পরম করুণাময়ের এক বিশেষ নেয়ামত।

কোরআনে বৈবাহিক সম্পর্ককে পবিত্র ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কোরআনের ৭ আয়াতের আলোকে বিবাহিত জীবনের অনন্য সৌন্দর্যের কথা আলোচনা করা হলো:

১. বিবাহ একটি প্রশংসনীয় আমল

উপযুক্ত বয়সে বিয়ে করাকে একটি প্রশংসনীয় ও বরকতময় কাজ হিসেবে উৎসাহিত করা হয়েছে কোরআনে  অনেকেই দারিদ্র্যের ভয়ে বিবাহ করা থেকে পিছিয়ে যান।

কিন্তু মহান আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব বা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল বানিয়ে দেবেন; আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সুরা আন-নূর, আয়াত: ৩২)

২. জীবনসঙ্গীর মাঝে আত্মিক প্রশান্তি

দাম্পত্য সম্পর্কের প্রধানতম উদ্দেশ্য হলো আত্মিক প্রশান্তি অর্জিত হওয়া। জীবনসঙ্গীর সাহচর্যে মানুষ যেন মানসিক নিরাপত্তা ও শান্তি খুঁজে পায়—সেভাবেই মানব মনস্তত্ত্ব তৈরি করা হয়েছে।

কোরআনে বলা হয়েছে, “এবং তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো এই যে তিনি তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের জন্য তোমাদের সঙ্গীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো; এবং তিনি তোমাদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।” (সুরা রূম, আয়াত: ২১)

আয়াতে উল্লিখিত ‘সাকিনাহ’ (প্রশান্তি), ‘মাওয়াদ্দাহ’ (গভীর অনুরাগ) এবং ‘রহমাহ’ (মমতা)—এই তিন উপাদানই হলো একটি সফল দাম্পত্যের ভিত্তি।

৩. একে অপরের পোশাকস্বরূপ

স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ককে কোরআনে পোশাকের চমৎকার রূপকের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। পোশাক যেমন মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা করে, রূপ সৌন্দর্য বাড়ায় এবং শীত-তাপ থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়, ঠিক তেমনি স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষত্রুটি ঢেকে রেখে সম্মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখে।

কোরআনে বলা হয়েছে, “তারা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)

এই আয়াত থেকে এচাও স্পষ্ট হয় যে দাম্পত্য সম্পর্ক কোনো আধিপত্যের জায়গা নয়; বরং এটি একে অপরকে আগলে রাখার এক রক্ষাকবচ।

৪. দুজনে এক আত্মা থেকে সৃষ্টি

মানুষের সৃষ্টির মূল উপাদানের ভেতরেই সহমর্মিতার বীজ নিহিত রয়েছে। পুরুষ ও নারীর আত্মিক উৎস এক ও অভিন্ন, যার ফলে তাদের মধ্যকার মিলন কোনো কৃত্রিম বিষয় নয়; বরং তা প্রাকৃতিক ও সহজজাত।

কোরআনে এসেছে, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এক আত্মা (আদম) থেকে এবং তা থেকে তৈরি করেছেন তার সঙ্গিনীকে (হাওয়া), যাতে সে তার কাছে পরম শান্তিতে বসবাস করতে পারে।” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ১৮৯)

৫. অপছন্দ হলেও কল্যাণ

পারিবারিক জীবনে মতের অমিল দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এমন অবস্থাতেও স্ত্রীর সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

কোরআনে স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো। অতঃপর তোমরা যদি তাদের অপছন্দও করো, তবে হতে পারে যে বিষয়টি তোমরা অপছন্দ করছ, তার ভেতরেই আল্লাহ অসীম কল্যাণ রেখে দিয়েছেন।” (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১৯)

৬. পরবর্তী বংশধারা নির্মাণ

বিবাহের মতো পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির ধারা বজায় রাখছেন। এই বোধ একটি অনন্য সুন্দর অনুভূতির জন্ম দেয়। এভাবেই রক্তের সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন ও বংশধারা গড়ে ওঠে, যা নিজেদের পরিচয়কে সুসংহত করে।

কোরআনে বলা হয়েছে, “তিনি তোমাদের এক আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তাঁর সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁদের দুজন থেকে বহু নারী ও পুরুষ ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে অধিকার দাবি করো এবং রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক থাকো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখছেন।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১)

৭. চোখের শীতলতা দান

সন্তানের মাধ্যমে মা-বাবার চোখ জুড়িয়ে যায় এবং অনন্য সুখের সূচনা হয়। কোরআন মাজিদে একটি আদর্শ ও সুখী পরিবারের ছবি আঁকা হয়েছে সুন্দর এক প্রার্থনার বর্ণনার মধ্য দিয়ে।

বলা হয়েছে, “আর তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের খোদাভীরু ও পরহেজগারদের অনুকরণীয় নেতা বানিয়ে দিন।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪-৭৫)