পার্থিব কোনো ব্যবসায় পুঁজি হারানো কিংবা কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া নিঃসন্দেহে কষ্টের। কিন্তু এর চেয়েও মন্দ এক ক্ষতির কথা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে।
তা হলো—সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি ও সাধনা করার পর শেষ বিচারের দিনে এসে দেখা গেল, সেই সকল আমলের কানাকড়িও মূল্য নেই।
আল্লাহ–তাআলা এই দলটির পরিচয় দিয়েছেন ‘আখসারিনা আমালা’ বা ‘সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারী’ হিসেবে। তিনি বলেছেন, “আমি কি তোমাদের জানাব, ‘কারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত’?” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১০৩)
পরের আয়াতে বলা হয়েছে, “পার্থিব জীবনে যাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও শ্রম পণ্ড হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে মনে ভাবত যে তারা ভালো কাজই করছে।” (সুরা কাহাফ, আয়াত: ১০৪)
সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি ও সাধনা করার পর শেষ বিচারের দিনে এসে দেখা গেল, সেই সকল আমলের কানাকড়িও মূল্য নেই।
আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আল-মাওয়ার্দি পাঁচটি প্রধান মতের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, সেই সব ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসী যারা দুনিয়া ত্যাগ করে কঠিন সাধনা করে কিন্তু সঠিক পথের দিশা পায় না।
দ্বিতীয়ত, আহলে কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের পথভ্রষ্ট অংশ।
তৃতীয়ত, ‘হারুরা’ অঞ্চলের খারিজি সম্প্রদায়, যারা চরমপন্থার কারণে পথভ্রষ্ট হয়েছিল।
চতুর্থত, সেই সব মানুষ যারা প্রবৃত্তি পূজারি।
পঞ্চমত, সেই সব লোক যারা ভালো কাজ করার পর মানুষের কাছে খোঁটা দেয় এবং নিজের মহত্ত্ব প্রচার করে। (আন-নুকাত ওয়াল উয়ুন, ৩/৩৩৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
ইমাম তাবারির মতে, এই আয়াতের আওতাভুক্ত তারাই যারা মনে করে যে তারা আল্লাহর ইবাদত করছে এবং সঠিক পথে আছে, অথচ বাস্তবে তারা পথভ্রষ্ট। তারা নিজেদের কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির বদলে অসন্তুষ্টি কুড়ায়। (জামিউল বায়ান, ১৮/১১৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০১)
একজন মুমিনের আমল কবুল হওয়ার জন্য দুটি স্তম্ভের প্রয়োজন। একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন। প্রথমটি হলো—ইখলাস বা আন্তরিকতা এবং দ্বিতীয়টি হলো—সঠিক পদ্ধতি বা সুন্নাহর অনুসরণ।
১. লোকদেখানো মানসিকতা বর্জন
ইখলাস হলো যেকোনো কাজের পেছনে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা। যদি কোনো আমলে সামান্যতম লোকদেখানো ভাব (রিয়া) প্রবেশ করে, তবে তা আর আল্লাহর জন্য থাকে না।
শয়তান মানুষকে খুব সূক্ষ্মভাবে আক্রমণ করে। সে মানুষের প্রশংসার সহজাত আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে। মানুষের যখন প্রশংসা পেতে ভালো লাগে, তখন সে গোপনের আমলকে ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। একসময় তার আমলটি আর ইবাদত থাকে না, বরং তা স্রেফ একটি প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
মহানবী (সা.) গোপন আমলের গুরুত্ব দিতে গিয়ে বলেছেন, ”তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সম্ভব সে যেন নিজের জন্য কিছু নেক আমলের গোপন ভাণ্ডার সঞ্চয় করে রাখে।” (সহিহুল জামি, হাদিস: ৪৫৫৩)
তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সম্ভব সে যেন নিজের জন্য কিছু নেক আমলের গোপন ভাণ্ডার সঞ্চয় করে রাখে।সহিহুল জামি, হাদিস: ৪৫৫৩
২. সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ
কেবল নিয়ত ভালো হলেই আমল কবুল হয় না; আমলটি সঠিক পদ্ধতিতে তথা নবীজির শেখানো পদ্ধতিতে হতে হবে। ইবাদতের ধরন যদি মনগড়া হয়, তবে কষ্টের ইবাদত হলেও তা প্রত্যাখ্যাত হবে।
মহানবী (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ”যে এমন কোনো কাজ করল যাতে আমাদের (শরিয়তের) নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭১৮)
এজন্যই আমল করার আগে ইলম বা সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। ভুল ব্যাখ্যা বা মন্দ বুঝের কারণে মানুষ ইবাদত করতে গিয়েও অজান্তেই ‘সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত’ আমলকারীদের কাতারে শামিল হয়ে যেতে পারে।
আমাদের প্রতিটি আমলের আগে ভাবা উচিত: ১. আমি কি এই কাজটি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি? ২. আমি কি এই কাজটি নবীজির (সা.) দেখানো পদ্ধতিতে করছি?
বিশিষ্ট সাহাবি যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.) বলতেন, ”তোমাদের প্রত্যেকের যেমন গোপন পাপ থাকে, তেমনি প্রত্যেকের উচিত কিছু গোপন নেক আমলও রাখা।” (ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ, ৭/২১২, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ: ২০০৪)।
আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন—উভয় আমল যেন কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত হয়। (সুরা আন-আম, আয়াত: ১৬২)।