হজ ও ওমরাহ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। আল্লাহর ঘরে হাজির হওয়ার এই পবিত্র সফর প্রতিটি মুসলিমের জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন। তবে এই পবিত্র ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়ার জন্য একটি অনিবার্য পূর্বশর্ত রয়েছে—আর তা হলো হালাল উপার্জন।
হারাম টাকা দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব নয়। অনেকেই জানতে চান, প্রাইজবন্ড জেতা টাকা দিয়ে হজ বা ওমরাহ পালন করা যাবে কি না। আলোচনা করা হলো।
ইসলামি অর্থনীতি ও ফিকহের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাইজবন্ডের পুরস্কারের টাকা লটারি (কিমার) এবং সুদের সংমিশ্রণ। কারণ, লাখো মানুষের মূলধনের ওপর অর্জিত সুদ লটারির মাধ্যমে গুটিকয়েক মানুষের মাঝে বণ্টন করা হয়।
ইসলামের মূলনীতি হলো, যে আর্থিক চুক্তিতে লাভ-ক্ষতির নিশ্চয়তা লটারির ওপর নির্ভরশীল, তা জুয়া হিসেবে গণ্য হয়। এ কারণে সমকালীন প্রায় সব ফতোয়া বোর্ড প্রাইজবন্ডের পুরস্কারকে ‘হারাম’ সাব্যস্ত করেছে।
নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র (হালাল বস্তু) ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না’সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫
আল্লাহর দরবারে যেকোনো ইবাদত, বিশেষ করে আর্থিক ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তা শতভাগ হালাল সম্পদ দিয়ে করা। রাসুল (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র (হালাল বস্তু) ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এই হাদিসের শেষাংশে তিনি এমন এক ব্যক্তির করুণ অবস্থার উদাহরণ দিয়েছেন, যে দীর্ঘ সফর করে ধুলায় মলিন হয়ে কাবা প্রাঙ্গণে এসে আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে কাঁদে, কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম এবং পোশাক হারাম। নবীজি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘কীভাবে তার দোয়া কবুল হতে পারে!’
যদি কেউ সম্পূর্ণ জেনেশুনে প্রাইজবন্ডের হারাম টাকা দিয়ে হজ বা ওমরাহ পালন করেন, তবে ফিকহের দৃষ্টিতে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে হলে নিজের কষ্টার্জিত পবিত্র ও হালাল উপার্জন দিয়েই তা করতে হবে; টাকার পরিমাণ অল্প হলেও হালাল টাকার ইবাদতেই আল্লাহ অশেষ বরকত ও রহমত দান করেন।
কেউ যদি হারাম বা অবৈধ সম্পদ দিয়ে হজে যায়, তবে বাহ্যিকভাবে তার হজের আইনি ফরজ বা বাধ্যবাধকতা হয়তো আদায় হয়ে যাবে, অর্থাৎ দুনিয়ার হিসেবে তাকে আর দ্বিতীয়বার হজ করতে বাধ্য করা হবে না, কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই হজ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং সে কোনো সওয়াব পাবে না, উল্টো হারাম সম্পদ ইবাদতে ব্যবহারের কারণে সে আরও পাপ হবে। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ২/৪৫৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
কারও কাছে যদি প্রাইজবন্ডের পুরস্কারের টাকা চলে আসে, তবে ইসলামের নির্দেশ হলো, এই টাকা নিজের কোনো ব্যক্তিগত কাজে, ইবাদতে, মসজিদে বা হজ-ওমরাহর মতো পবিত্র সফরে এক পয়সাও ব্যয় করা যাবে না।
এই টাকা সওয়াবের নিয়ত ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে কোনো গরিব-অসহায় মানুষকে দান করে দিতে হবে।
হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদের মূল মালিক জানা না থাকলে তা সওয়াবের আশা ছাড়া গরিবদের মাঝে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব (আবশ্যক), যেন নিজেকে এই হারাম সম্পদের দায় থেকে দ্রুত মুক্ত করা যায়। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ৫/৩৪৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)
পরিশেষে, হজ বা ওমরাহর মতো পবিত্র ইবাদতে প্রাইজবন্ডের টাকা ব্যবহার করা যাবে না।
আল্লাহর ঘর জিয়ারত করতে হলে নিজের কষ্টার্জিত পবিত্র ও হালাল উপার্জন দিয়েই তা করতে হবে; টাকার পরিমাণ অল্প হলেও হালাল টাকার ইবাদতেই আল্লাহ অশেষ বরকত ও রহমত দান করেন।