ধর্ম-দর্শন

বিয়ে নাকি আর্থিক প্রস্তুতি: মুমিন কোনটা এগিয়ে রাখবে

বর্তমান যুগে বিয়ের বয়স বয়ে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের সামনে যদি প্রশ্ন রাখা হয়, তবে এক দীর্ঘ দুশ্চিন্তার তালিকা সামনে চলে আসে।

“আমার যা বেতন, তা দিয়ে কি সংসার চলবে?”, “মাস শেষে ঘরভাড়া বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম কীভাবে সামাল দেব?”, “বিয়ের আয়োজনের বিশাল বাজেট কোথা থেকে আসবে?” কিংবা “মুদ্রাস্ফীতির এই কঠিন সময়ে একটি যৌথ পরিবারের দায়ভার বহন করার মতো সামর্থ্য কি আমার তৈরি হয়েছে?”—এমন হাজারো প্রশ্ন আধুনিক যুবসমাজকে তাড়া করে ফেরে।

নিজের ভবিষ্যৎ এবং একটি পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া নিঃসন্দেহে পরিণত মানসিকতার লক্ষণ। কিন্তু এই সচেনতা যখন স্থায়ী মানসিক ভীতিতে রূপ নেয় এবং আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্তকে অনিশ্চিতকালের জন্য ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তখনই তৈরি হয় বিপত্তি।

আর তোমরা তোমাদের বিবাহহীনদের বিবাহ দাও এবং তোমাদের সৎকর্মশীল দাস ও দাসীদেরও; তারা যদি নিঃস্ব হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে দেবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।
সুরা নুর, আয়াত: ৩২

বিয়ে কি অলৌকিক অর্থনৈতিক যন্ত্র

মহান আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা তোমাদের বিবাহহীনদের বিবাহ দাও এবং তোমাদের সৎকর্মশীল দাস ও দাসীদেরও; তারা যদি নিঃস্ব হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে দেবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩২)

এর অর্থ এই নয় যে বিবাহ একটি অলৌকিক অর্থনৈতিক যন্ত্র—যার মাধ্যমে আকদ সম্পন্ন হওয়ামাত্রই রাতারাতি ব্যক্তি বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে যাবে। কিংবা এটি অপ্রস্তুত অবস্থায় হুট করে বিয়ে করার আহ্বানও নয়।

বরং এর মূল শিক্ষা হলো, শুধু বর্তমানের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে ভিত্তি করে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। আজকের সীমিত আয়ই যে আগামীকাল প্রসারিত হবে না, এমন সংকীর্ণ ভাবনায় আটকে থাকা উচিত নয়। (আব্দুল আজিজ আব্দুল হাদি আল-আহবাবি, আজ-জাওয়াজু ওয়ার-রিজক: বাইনা ওয়াদিল্লাহি ওয়া হাওয়াজিসিল হায়াত, ১/৮–২০, দারুল ফিকর, দোহা, ২০২৪)

প্রকৃত প্রয়োজন নাকি লোকদেখানো সামাজিকতা

বিবাহ আজ এক বিশালাকার ব্যয়বহুল সামাজিক প্রকল্প। বিপুল মোহরানা, বিলাসবহুল কমিউনিটি সেন্টার, রাজকীয় আলোকসজ্জা, বহুমূল্য পোশাক, প্রাক-বিবাহ ও বিবাহ-পরবর্তী ছবি তোলার জাঁকজমক এবং উপহারসামগ্রীর প্রতিযোগিতা। এক রাতের উৎসবের খরচ জোগাতে একজন তরুণকে বছরের পর বছর ঘাম ঝরাতে হয়।

তাই সমাজে বিয়ের গড় বয়স আশঙ্কাজনক বেড়ে যাচ্ছে। এটি সমাজের চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম চাহিদা। একটি বাড়ি, পরিবারের ভরণপোষণ—এগুলো জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু লোকদেখানো সামাজিকতার প্রতিযোগিতায় এটা এক সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।

যেসব পরিবার সামান্য সম্বল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে, সঠিক প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে তা প্রভূত সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠার বহু নজির রয়েছে।

হে তরুণ দল, তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে। আর যার সেই সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬

রিজিকের পরিধি অনেক বড়

ইসলামে রিজিকের পরিধি অনেক বড়। রিজিক মানে শুধু নগদ টাকা বা ব্যাংক ব্যালান্স নয়। একজন সৎ ও গুণবতী স্ত্রী বা স্বামী লাভ করা জীবনের শ্রেষ্ঠ রিজিক। আত্মিক শান্তি, সুস্থতা, চরিত্র গঠন, ধার্মিক সন্তান, অল্পে সন্তুষ্টির মানসিকতা এবং উপার্জনে বরকত পাওয়া—এসব রিজিকের বিভিন্ন রূপ।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়াসমূহকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া।” (সুরা রূম, আয়াত: ২১)

কোরআনের ভাষাটি লক্ষণীয়—‘যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো’। ইসলামমে গৃহ শুধু ইট-কাঠের দেয়াল নয়, বরং এটি মানসিক প্রশান্তি ও সহমর্মিতার আশ্রয়স্থল। বিপুল বিত্ত থাকা সত্ত্বেও অনেকে এই মানসিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত থাকেন; আবার সীমিত উপার্জনেও বহু পরিবারে বিরাজ করে পরম তৃপ্তি।

আল্লাহ-ভরসা ও বাস্তবতার ভারসাম্য

‘বিয়ে করলে রিজিকে বরকত হয়’—এর মানে বাস্তবতা অস্বীকার করে অলস বসে থাকা নয়। ইসলাম বিয়েতে বরকতের সুসংবাদ দিয়েছে যেমন, তেমনি পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও স্বাবলম্বিতার ওপর জোর দিয়েছে। 

মহানবী (সা.) যুবসমাজকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “হে তরুণ দল, তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে রক্ষা করে। আর যার সেই সামর্থ্য নেই, সে যেন রোজা রাখে; কেননা রোজা তার জন্য ঢালস্বরূপ।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)

মহানবী (সা.) এখানে আত্মসংযমের তাগিদ দিয়েছেন, আবার সামর্থ্যের কথাও তুলে ধরেছেন। এটাই ভারসাম্য। আল্লাহ-ভরসার নামে অবিবেচক হওয়া যাবে না, আবার পরিকল্পনার নামে অতি ভয়ে স্থবির হওয়া চলবে না।

বৈবাহিক জীবন শুরুর পূর্বে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা, অযাচিত ঋণ বর্জন করা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব বজায় রাখা দায়িত্বশীলতার অংশ। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর ভাণ্ডার মানুষের হিসাব-নিকাশের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।

কোরআনে বলা হয়েছে, “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ বানিয়ে দেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক দান করেন।” (সুরা তালাক, আয়াত: ২–৩)

নতুন মানসিকতা প্রয়োজন—যাতে হালাল পথকে সহজ করা হয় এবং অহেতুক ভয় বা সামাজিক চাপ দূর করে যদি মহান আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে সঠিক প্রস্তুতির সঙ্গে অগ্রসর হওয়া যায়।

অভিভাবকদের করণীয়

যুবসমাজকে শুধু উপদেশ দিলেই চলবে না, সমাজকেও সেই উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পিতা-মাতাকে সচেতন হতে হবে যাতে তাঁদের সন্তানের শুভকাজ শুধু প্রদর্শনীতে পরিণত না হয়। বিয়ের সাফল্য কয়েক দিনের সামাজিক প্রশংসায় নয়; বরং একটি ঋণমুক্ত ও দুশ্চিন্তাহীন দাম্পত্য জীবন শুরুর মধ্যে নিহিত।

সহজ কাবিন বা পরিমিত আয়োজন সন্তানের মর্যাদা কমায় না; বরং যুবকদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। নতুন মানসিকতা প্রয়োজন—যাতে হালাল পথকে সহজ করা হয় এবং অহেতুক ভয় বা সামাজিক চাপ দূর করে যদি মহান আল্লাহর ওপর আস্থা রেখে সঠিক প্রস্তুতির সঙ্গে অগ্রসর হওয়া যায়।