ইসলামি বর্ষপঞ্জির বারোটি মাসের মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় ‘আশহুরুল হুরুম’ বা হারাম মাসসমূহ। ‘হারাম’ শব্দটি অনেকটা দ্ব্যর্থবোধক, অর্থাৎ সম্মানিত আবার নিষিদ্ধও।
মহান আল্লাহ এই মাসগুলোকে এমন এক মর্যাদা দান করেছেন যেখানে নেক আমলের সওয়াব যেমন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, তেমনি গুনাহের ভয়াবহতাও বৃদ্ধি পায়।
‘আশহুরুল হুরুম’ বা সম্মানিত মাসগুলোর বিস্তারিত পরিচয় ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো।
পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী সম্মানিত মাস হলো ৪টি। এই চারটি মাস হলো:
জিলকদ: এটি হিজরি বর্ষের ১১তম মাস।
জিলহজ: ১২তম মাস, যাতে পবিত্র হজ পালন করা হয়।
মহররম: হিজরি বর্ষের ১ম মাস।
রজব: ৭ম মাস, যা শাবান ও রমজানের প্রস্তুতির মাস।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে স্পষ্টভাবে এই মাসগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, বছরের ১২টি মাসের মধ্যে চারটি পবিত্র; তিনটি মাস পরপর (জিলকদ, জিলহজ ও মহররম) এবং একটি হলো ‘রজবে মুদার’, যা জমাদিউস সানি ও শাবান মাসের মাঝে অবস্থিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৫৮)
‘হারাম’ শব্দের অর্থ এখানে ‘নিষিদ্ধ’ এবং ‘সম্মানিত’। এই মাসগুলোকে ‘হারাম’ বলার প্রধান দুটি কারণ হলো:
১. যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ: জাহেলি যুগ থেকেই এই মাসগুলোতে যুদ্ধ, রক্তপাত ও আক্রমণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল। মানুষ যেন নির্বিঘ্নে হজের সফর ও ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, সেজন্য এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। ইসলাম এই প্রথাকে বহাল রেখেছে এবং শান্তির বার্তা প্রচার করেছে।
২. ইবাদত ও গুনাহের গুরুত্ব: এই মাসগুলোতে ইবাদতের সওয়াব যেমন অনেক বেশি, তেমনি এ সময়ে কোনো অন্যায় বা পাপাচার করা অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জঘন্য অপরাধ। অর্থাৎ এর মর্যাদা বা ‘হুরমত’ অনেক বেশি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও কিতাবে মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি... তার মধ্যে চারটি মাস হচ্ছে সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত দীন; সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না।” (সুরা তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)
মুফাসসিরগণের মতে, ‘নিজেদের ওপর জুলুম করো না’ একথার অর্থ হলো—এই মাসগুলোতে গুনাহ করে নিজের আত্মাকে কলুষিত করো না। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, আল্লাহ সকল মাসেই পাপাচার নিষিদ্ধ করেছেন, তবে এই চার মাসে তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন (তফসিরে তাবারি, সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির)।
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবরা তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা যুদ্ধের প্রয়োজনে পবিত্র মাসগুলোকে পিছিয়ে দিত। একে বলা হতো ‘নাসি’। যেমন, যদি মহররম মাসে তাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন হতো, তবে তারা ঘোষণা করত যে এ বছর মহররম মাস পবিত্র নয়, বরং সফর মাস পবিত্র।
এভাবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত সময়কে পরিবর্তন করত।
ইসলাম এসে এই প্রথাকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। আল্লাহ তাআলা একে ‘কুফরির আধিক্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন (সুরা তাওবাহ, আয়াত: ৩৭)। নবীজি (সা.) ঘোষণা করেন যে, কালচক্র বা সময় এখন ঠিক সেই অবস্থানে ফিরে এসেছে, যে অবস্থানে আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন ছিল। অর্থাৎ এখন থেকে আল্লাহর নির্ধারিত সময় অনুযায়ীই মাস গণনা চলবে।
সম্মানিত মাসগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে আলেমগণ কিছু বিশেষ আমলের পরামর্শ দিয়েছেন:
গুনাহ থেকে দূরে থাকা: যেহেতু এই সময়ে গুনাহের বোঝা ভারী হয়, তাই ছোট-বড় সব ধরনের পাপ ও অন্যের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত থাকা।
নফল রোজা পালন: বিশেষ করে মহররম ও শাবান মাসে নফল রোজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
অধিক হারে সদকা: সওয়াব বৃদ্ধির এই সময়ে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা।
তওবা ও ইস্তিগফার: বিগত জীবনের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুনভাবে জীবন শুরুর সংকল্প করা।
বিবাদ মেটানো: আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীর সঙ্গে কোনো ঝামেলা থাকলে তা মিটিয়ে শান্তির পরিবেশ তৈরি করা।
আশহুরুল হুরুম বা সম্মানিত মাসগুলো মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার। এটি এমন এক সময় যখন পৃথিবীজুড়ে শান্তির চর্চা করা হয় এবং আধ্যাত্মিকতার বসন্তকাল বিরাজ করে। এই মাসগুলোর মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ হলো আল্লাহর দেওয়া বিধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
আসুন, আমরা এই বরকতময় সময়গুলোকে হেলায় না হারিয়ে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি।