রাত যত গভীর হয়, এই প্রশ্নটা তত কাছে এসে দাঁড়ায়। মনে হয়, কাউকে নিয়ে ভাবলে কি সত্যিই চোখ ভিজে যায়? নাকি আমরা শুধু গল্প শুনি, অনুভব করি না?
ভাবুন তো একটা শিশুর কথা। জীবনের শুরুটাই যার শূন্য দিয়ে লেখা। জন্মের আগেই বাবা নেই। ছয় বছরে মা হঠাৎ চলে গেলেন। আট বছরে দাদার ছায়াটাও সরে গেল। কোনো ভাই নেই, কোনো বোন নেই। নেই কোনো শিক্ষা। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু ভেতরে এক গভীর নিঃসঙ্গতা।
এই নিঃসঙ্গ জীবনে মৃত্যু এসেছিল বারবার। নিজের তিনটি পুত্রসন্তানকে ছোট ছোট কবরে নিজ হাতে শুইয়ে দিয়েছেন। আরও তিনটি মেয়ের মৃত্যু দেখেছেন নিজের চোখের সামনে। প্রিয়তমা স্ত্রী নিঃশব্দে চলে গেলেন। বন্ধুরা একে একে শহীদের তালিকায়। প্রতিবার মনে হয়েছে, এবার হয়তো তিনি থামবেন। কিন্তু তিনি থামেননি।
তাঁর গা থেকে রক্ত ঝরছিল। পায়ের নিচের ধুলা লাল হয়ে যাচ্ছিল। তিনি থামলেন। মাথা তুললেন। মনে হলো, আকাশটা থেমে গেছে।
একদিন রাস্তায়, সূর্যের তাপে পাথরগুলো গরম হয়ে উঠেছে। তিনি সেজদায়। ঠিক তখনই শত্রুরা তার ওপর ফেলে দিল উটের পচা নাড়িভুঁড়ি। পৃথিবীটা যেন একটু থেমে গেল। মানুষ ভিড় করে দাঁড়াল। দেখবে, তিনি কী করেন। তিনি কিছুই করলেন না। আবর্জনা সরানো হলে আবার মাথা নত করলেন। নীরবতাকে নিজের ঢাল বানালেন।
তারপর শহরটা হঠাৎ সংকুচিত হয়ে গেল। বয়কটের দিনগুলোয়। খাবারের গন্ধও যেন হারিয়ে গেল বাতাস থেকে। শিশুর কান্না ভাসত চারদিকে, রাতগুলো এত লম্বা হতো, যেন শেষই হতে চায় না।
তার নিজের দুই কন্যার ঘর ভেঙে গেল শুধু তার বিশ্বাসের কারণে। তবু তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যেন সেখানে কোনো অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি লেখা আছে।
তারপর আরেক শহর। প্রথমে মনে হলো, এই শহর তাঁকে আশ্রয় দেবে। তারপর হঠাৎ সব বদলে গেল। গলির ভেতর থেকে মানুষ বেরিয়ে এল। হাতে পাথর। পাথরগুলো শুধু তাঁর শরীরে পড়ছিল না, মনে হচ্ছিল সময়ের গায়েও আঘাত করছে। তাঁর গা থেকে রক্ত ঝরছিল। পায়ের নিচের ধুলা লাল হয়ে যাচ্ছিল। তিনি থামলেন। মাথা তুললেন। মনে হলো, আকাশটা থেমে গেছে।
তিনি বললেন, ‘হে প্রতিপালক, আমার দুর্বলতা আর অসহায়ত্বের অভিযোগ আমি শুধু তোমার কাছেই করি। তুমি না দুর্বলদের প্রভু। তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না হও, তাহলে আমার কোনো পরোয়া নেই। শুধু তোমার সাহায্যই আমার জন্য যথেষ্ট।’
এই কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই একটা অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল। মনে হলো, আকাশ একটু নেমে এসে তার কপালে হাত রাখল। তিনি আবার বললেন, ‘আমি তোমার নূরের আশ্রয় চাই, যার আলোতে সব অন্ধকার দূর হয়ে যায়। তুমি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমার কাছেই ক্ষমা চাই।’
এই দোয়াগুলো শুধু শব্দ ছিল না। এগুলো ছিল এক মহামানবের ভেঙে না পড়ার গল্প।
আরেক যুদ্ধের ময়দানে লোহা, ধুলা আর রক্ত মিশে গেছে।
তিনি কেঁদেছেন। তিনি প্রিয়জনদের দাফন করেছেন। তিনি আহত হয়েছেন, অপবাদ শুনেছেন এবং ক্লান্ত হয়েছেন। তবু তিনি অবিচল থেকেছেন।
তাঁর দাঁত ভেঙে গেছে। মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তবু তাঁর চোখে রাগ নেই। তিনি তাকিয়ে আছেন অপলক। যখন সহযোদ্ধারা বললেন, ‘আপনি আল্লাহকে বলুন অত্যাচারীদের মাটিতে মিশিয়ে দিতে।’ তিনি বললেন, ‘তারা জানে না।’ এই বাক্যটা বাতাসে রয়ে গেল, যা আজও শোনা যায়।
এই মহামানবের জীবনে পরীক্ষা আরও গভীরতর হয়। যখন তিনি ঐশ্বরিক বার্তা পাওয়া শুরু করেন, তখনই তিনি কিন্তু তাৎক্ষণিক সম্মান লাভ করেননি। তাঁকে এমন একটি বার্তা বহন করতে হয়েছিল, যা তাঁর সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও নৈতিক অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।
এর ফলে তিনি উপহাস, অপমান ও নির্যাতনের শিকার হন। তাঁকে কবি, উন্মাদ, মিথ্যাবাদী ও কল্পনাকারী বলা হয়। লোকেরা প্রকাশ্যে তাঁকে বিদ্রূপ করত। তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। কেউ মারধরের শিকার হয়েছেন, কেউ অনাহারে থেকেছেন, কেউ সামাজিকভাবে বয়কট হয়েছেন, আবার কেউ নিহত হয়েছেন।
একজন মানুষের জীবনে এত সংকট চরিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে। তাঁর জীবন দেখায় নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া ধৈর্য, ভেঙে না পড়ে শোক সহ্য করা, কঠোরতা ছাড়া দৃঢ়তা এবং ব্যথাকে অস্বীকার না করেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। তিনি কেঁদেছেন। তিনি প্রিয়জনদের দাফন করেছেন। তিনি আহত হয়েছেন, অপবাদ শুনেছেন এবং ক্লান্ত হয়েছেন। তবু তিনি অবিচল থেকেছেন।
তাঁর ভেতরে যে আলো ছিল, কোনো অন্ধকার তা নেভাতে পারেনি। তাঁর ঘরে চুলায় অনেক দিন আগুন জ্বলেনি, কিন্তু তাঁর ভেতরের আগুন কখনো নেভেনি।
তাঁর দায়িত্ব সম্পূর্ণ হলে তিনি তাঁর শেষ ভাষণে বলে গেলেন আরব-অনারব, সাদা-কালো কারও ওপর কারও শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শুধু তাকওয়া বা স্রষ্টার সচেতনতা ও সঠিক কাজ করাই মর্যাদার মানদণ্ড। তিনি নারী-পুরুষের পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলেন।
দাস ও অধীনস্থদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে বলেন, যা নিজে খাও, তাদেরও তা খাওয়াও, যা পরো, তাদেরও তা পরাও। সার্বিকভাবে তাঁর দিকনির্দেশনা ছিল ন্যায়, সমতা ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তোলা।
শেষ পর্যন্ত তিনি চলে গেলেন। না ধন, না প্রাসাদ—কিছুই রেখে গেলেন না। শুধু রেখে গেলেন একটা সুস্পষ্ট পথ। যার কিছুই ছিল না, তবু তিনি পৃথিবীকে পূর্ণ করে দিলেন। তাঁর বাণী ছিল তাঁর সময়ের চেয়ে অগ্রসর ও চিরন্তন। স্রষ্টার খোঁজে রাতের অন্ধকারে পর্বতের চূড়ায় এক যুবকের আকুল নিঃসঙ্গ অন্বেষণ, আজ দুই বিলিয়ন মানুষের প্রতিদিনের পথচলার পাথেয়!
যাঁর কথা এতক্ষণ বলা হলো, তিনি আর কেউ নন; তিনি আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। রাব্বুল আলামিনের সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি। তাঁর জীবনের প্রতিটি দুঃখ, প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আমাদের শেখায় যে বিপদ কোনো অভিশাপ নয়, বরং তা স্রষ্টার আরও কাছে পৌঁছানোর এক গোপন দরজা।
তাঁর ভেতরে যে আলো ছিল, কোনো অন্ধকার তা নেভাতে পারেনি। তাঁর ঘরে চুলায় অনেক দিন আগুন জ্বলেনি, কিন্তু তাঁর ভেতরের আগুন কখনো নেভেনি।
মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, সেই ক্ষতের ভেতর দিয়েই তো প্রবেশ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আলোর সূক্ষ্ম রেখা।
পুরোনো সেই গানের মতো প্রশ্ন ভেসে আসে, কফোটা চোখের জল ফেলেছ তুমি, ভালোবাসবে? যদি কষ্টই না পাও, তবে মহত্ত্ব কোথা থেকে আসবে? মহানবীর জীবন যেন সেই প্রশ্নের জীবন্ত উত্তর, যেখানে কষ্ট ভেঙে দেয় না, বরং গড়ে তোলে।
আসুন, আমরা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। জীবনের কষ্টকে এড়িয়ে না গিয়ে তাঁকে গ্রহণ করি। কারণ, হয়তো সেই কষ্টের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের নিজের মহত্ত্বের পথ, আর স্রষ্টার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
ব্যারিস্টার ওমর সাদাত: নগর অধিকারকর্মী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং সভাপতি, গুলশান সোসাইটি