হাদিস

মহানরী (সা.)-এর উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি : ৪

কোনো নির্দিষ্ট গুণের ওপর ভিত্তি করে যখন দুটি বিষয়ের মাঝে তুলনা করা হয়, তখন মানুষের মানসপটে অবোধগম্য বিষয়টিও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

নবীজি (সা.) তার দাওয়াতি কাজে প্রতিনিয়ত এমন সব প্রাত্যহিক ও জীবনঘনিষ্ঠ উপমা ব্যবহার করতেন, যা সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় বিধিবিধান ও নৈতিকতার গভীর তত্ত্ব বুঝতে সাহায্য করত।

একই সঙ্গে তাঁর এই উপমাগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, চারপাশের প্রাণ আর প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক কতটা নিবিড় ছিল। তার চমৎকার দাওয়াতি জীবনের এমনই কিছু উপমা নিয়ে আজকের চতুর্থ পর্ব :

 পাখির হৃদয়

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘এমন কিছু লোক জান্নাতে যাবে, যাদের হৃদয় পাখির হৃদয়ের মতো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮৪০)

এখানে পাখির হৃদয় বলে দুটো বিষয়ের দিকে ইশারা করা হয়েছে :

১. প্রাণীকূলের মধ্যে পাখি সবচেয়ে বেশি ভয় ও আতঙ্কে থাকে। একটু শব্দ হলেই ভয়ে উড়াল দেয়। কোনো মুমিনের হৃদয়ে যদি সবসময় আল্লাহর ভয় বিরাজ করে, তাহলে সে যেকোনো বিষয়েই সর্বোচ্চ সতর্কতা রক্ষা করবে। সে পাপকাজ হওয়ার আশঙ্কা দেখলে দ্রুতই সটকে পড়বে।

২. পাখি যেমন আল্লাহর ওপর ভরসা করে সকাল বেলা রিজিকের তালাশে বের হয়ে যায়, ঠিক তেমনই কোনো মুমিন যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তাকে রিজিক দেবেন। আর অবশ্যই কর্মপ্রচেষ্টা আল্লাহর ওপর ভরসা করারই অংশ।

 মধু ও সিরকা

জনৈক সাহাবি জিজ্ঞসা করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.), আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?’ তিনি বলেন, ‘যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে, সেই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোনো মুমিনের অন্তরে আনন্দ পৌঁছে দেওয়া—তার কোনো দুঃখ-কষ্ট দূর করা, তার ঋণ পরিশোধে সাহায্য করা কিংবা তার ক্ষুধা নিবারণ করা।

তিনি আরও বলেন আমি আমার কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণের জন্য তার সঙ্গে চলাফেরা করাকে এই মসজিদে দুই মাস এতেকাফ করার চেয়েও বেশি পছন্দ করি। যে ব্যক্তি নিজের রাগ সংবরণ করে, আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন। আর যে ব্যক্তি ক্রোধ দমন করে, অথচ সে চাইলে তা বাস্তবায়ন করতে পারত—আল্লাহ (কেয়ামতের দিন) তার অন্তরকে সন্তুষ্টি দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের কোনো প্রয়োজন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকে, আল্লাহ সেদিন তার পা দুটিকে অবিচল রাখবেন—যেদিন সবার পা পিছলে যাবে (অর্থাৎ কেয়ামতের দিন)।

নিশ্চয় খারাপ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে দেয়, ঠিক যেভাবে সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।’ (কাযাউল হাওয়াইজ লি-ইবনে আবিদ্দুনিয়া, হাদিস : ৩৬; সহিহুল জামে, হাদিস : ১৭৬)

এখানে নবীজি (সা.) ভালো আখলাকের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। সবশেষে জানান, কারও আখলাক-চরিত্র যদি খারাপ হয়, তবে যতই নামাজ-রোজা করুক না কেন, সে আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারবে না। কেননা মধুর মধ্যে যদি সিরকা ঢালা হয়, সেটা তার টক ও দুর্গন্ধের কারণে আর খাওয়ার উপযুক্ত থাকবে না।

 বানর

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘আমার পর এমন কিছু শাসকের আগমন ঘটবে, যারা তাদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে (বক্তব্য ও নির্দেশ) প্রদান করবে, অথচ তাদের কথার কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। তারা জাহান্নামের আগুনে ঠিক সেভাবেই একের পর এক হুড়মুড় করে লাফিয়ে পড়বে, যেভাবে বানরের দল লাফিয়ে পড়ে।’ (আল মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানি, হাদিস : ৫৩১১)

এখানে নবীজি (সা.) স্বৈরাচার ও একনায়ক শাসকের কথা বলেছেন, যারা রাষ্ট্রপরিচালনাকে কোনো প্রকার ‘সামাজিক চুক্তি’ মনে করে না। কোরআন-হাদিস থেকে বোঝা যায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে পরামর্শ ও জনসম্মতির ভিত্তিতে। যদি সেটা না হয়, শাসক ও শাসিত—উভয়েই গোনাহগার হবে।

 বৃষ্টি

নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের উদাহরণ সেই বৃষ্টির মতো—যার প্রথম ভাগ ভালো না শেষ ভাগ ভালো, তা জানা যায় না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৬৯)

বৃষ্টির যেকোনো ভাগই ভালো হতে পারে। এই উপমা থেকে বোঝা যায়—উম্মতের মধ্যে সবসময় ভালোত্বের সম্ভাবনা আছে।

 শিশির

নবীজি বলেন, ‘নিশ্চয় অসুস্থ ব্যক্তি যখন রোগমুক্ত ও সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন তার উপমা হলো—আকাশ থেকে পড়া শিশিরের মতো, যা নিজ স্বচ্ছতা ও নির্মল রঙে নেমে আসে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২০৮৬)

 নক্ষত্ররাজি

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় পৃথিবীর বুকে আলেমদের দৃষ্টান্ত হলো আকাশের নক্ষত্ররাজির মতো—যার মাধ্যমে স্থলপথে ও সমুদ্রপথে ঘুটঘুটে অন্ধকারে পথ চেনা যায়। এরপর যখন সেই নক্ষত্রগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন পথপ্রদর্শকদেরও পথ হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১২৬০০)

আগেকার দিনে রাতের বেলা নক্ষত্র দেখে পথ চলতে হতো। তাই সেই সময় এমন ব্যক্তিরাই পথপ্রদর্শক হতো, যারা নক্ষত্র সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখত।

লবণ

নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমার সাহাবিদের উপমা হলো খাবারের মধ্যে লবণের মতো; (আর) লবণ ছাড়া খাবার ঠিকঠাক হয় না।’ (মুসনাদে আবু ইয়া’লা, হাদিস : ২৭৬২)

 সবুশ-শ্যামল

নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় এই ধনসম্পদ সবুজ-শ্যামল ও মিষ্টি। যে ব্যক্তি আত্মিক উদারতা (অর্থাৎ লোভ ছাড়া) সহকারে তা গ্রহণ করবে, তার জন্য সেই সম্পদে বরকত দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি লোভী মন নিয়ে তা আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য তাতে কোনো বরকত দেওয়া হবে না; তার অবস্থা হবে ঠিক সেই ব্যক্তির মতো—যে খেয়েই চলে, কিন্তু কখনোই তার ক্ষুধা মেটে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৪৭২)

অন্য একটি হাদিসে আছে—‘নিশ্চয় এই পৃথিবী সবুজ-শ্যামল ও মিষ্টি। আল্লাহ তাআলা সেখানে তোমাদেরকে খলিফা (প্রতিনিধি) নিযুক্ত করেছেন, যাতে তিনি দেখতে পারেন তোমরা কেমন আমল করো। তাই তোমরা দুনিয়া সম্পর্কে সতর্ক থেকো এবং নারী সম্পর্কে সতর্ক থেকো; কেননা বনি ইসরাইলের প্রথম পরীক্ষা হয়েছিল নারীঘটিত বিষয়ে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৪৭২)

এই দুটো হাদিসে যে তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে—ধনসম্পদ, দুনিয়া ও নারী—কোনোটাকেই মন্দ বলা হয়নি। বরং এসবের শ্যামলতা যেন নষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

 সাদা ডানা বিশিষ্ট কাক

নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নারী হলো তারা—যারা (স্বামীর প্রতি) অত্যন্ত প্রেমময়ী, অধিক সন্তানপ্রসবকারী, (স্বামীর) অনুকূল এবং সহমর্মী (কষ্টের অংশীদার); যদি তারা আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে)।

আর তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম নারী হলো তারা—যারা (পরপুরুষের সামনে) নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়ায় এবং দেমাগি; তারাই মূলত মোনাফেক নারী। তাদের মধ্য থেকে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না, তবে দুষ্প্রাপ্য সাদা ডানা বিশিষ্ট কাকের মতো দুয়েকজন বাদে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৩৪৭৮)

 দলছুট বকরি

নবীজি (সা.) বলেন, ‘মোনাফেকের উপমা ওই বকরির মতো—যে দুই পালের মধ্যে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরপাক খায়। একবার এই পালের দিকে যায়, আরেকবার অন্য পালে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭৮৪)

mawlawiashraf@gmail.com

  • মওলবি আশরাফ : লেখক ও অনুবাদক