একবার কবির পায়ে দেওয়ার মতো কোনো জুতা ছিল না। এই সামান্য অভাবে তাঁর মন খুব খারাপ ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি এমন একজন মানুষকে দেখলেন যাঁর দুটো পা-ই নেই। সেই মানুষটি বিষণ্ন মুখে কোনোমতে চলাফেরা করছেন।
কবির মনের সব ক্ষোভ ও দুঃখ একনিমেষে দূর হয়ে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, জুতা না থাকা মানুষের চেয়ে পা না থাকা মানুষের কষ্ট অনেক গুণ বেশি। পরের অভাব ও কষ্টের তীব্রতা দেখলে নিজের না-পাওয়ার বেদনা আর স্থায়ী হয় না।
হাদিস থেকে আমরা ঠিক এই মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষাই লাভ করি। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা ওই ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করো, যে তোমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন অবস্থায় আছে। তার প্রতি তাকিয়ো না যে তোমাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় আছে। তা না হলে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহগুলো তোমরা তুচ্ছ ভেবে বসবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২১৪)
নিজেকে সব সময় জাগতিকভাবে সুখী মানুষের সঙ্গে তুলনা না করে, বরং সামাজিকভাবে যারা বেশি বিপদগ্রস্ত, তাদের সঙ্গে তুলনা করা দরকার। মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য এবং হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচতে এই আত্মিক তুলনা অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কোরআনেও মহান আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৭)
অর্থাৎ আমরা যত বেশি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, আমাদের মনের শান্তি আর জীবনের বরকত তত বেশি বাড়তে থাকবে।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সৌজন্যে অন্যের হাসিখুশি মুখ আর কৃত্রিম সুখের ছবিটাই বেশি দেখি। অথচ একটু আগেই হয়তো সেই মানুষটি কারও সঙ্গে রাগারাগি করেছে বা একা বসে কান্না করেছে।
হয়তো সে মারাত্মক অসুস্থ বা ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগছে। কিন্তু পর্দার ওপারের সেই ধূসর বাস্তবতার গল্প আমরা দেখি না, আমরা শুধু দেখি তার প্রোফাইলের রঙিন উচ্ছলতা।
অফলাইন বা অনলাইনে অন্যের জীবনের এই ‘সেরা মুহূর্তগুলো’ দেখে আমরা নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনের কষ্ট ও সংগ্রামের সঙ্গে এক ক্ষতিকর তুলনা করে বসি। অথচ পর্দার ওপারের মানুষটার গল্পটাও হয়তো হাজারো যুদ্ধ আর চোখের পানিতে ভরা।
তাই নিজেকে সব সময় জাগতিকভাবে সুখী মানুষের সঙ্গে তুলনা না করে, বরং সামাজিকভাবে যারা বেশি বিপদগ্রস্ত, তাদের সঙ্গে তুলনা করা দরকার। মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য এবং হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচতে এই আত্মিক তুলনা অত্যন্ত জরুরি।
তোমরা ওই ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করো, যে তোমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্ন অবস্থায় আছে। তার প্রতি তাকিয়ো না যে তোমাদের চেয়ে উন্নত অবস্থায় আছে। তা না হলে তোমাদের প্রতি আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহগুলো তোমরা তুচ্ছ ভেবে বসবে।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭২১৪
আগের যুগের নেককার মানুষেরাও এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব সুন্দরভাবে মেনে চলতেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলতেন, ‘আমার ওপর কোনো বিপদ এলে আমি তাতে আল্লাহর তিনটি নেয়ামত দেখি: প্রথমত, বিপদটি আমার ধর্ম বা ইমানের ওপর আসেনি, দ্বিতীয়ত, বিপদটি এর চেয়েও বড় হতে পারত কিন্তু আল্লাহ দয়া করে তা করেননি এবং তৃতীয়ত, আল্লাহ এর বিনিময়ে আমাকে আখেরাতে পুরস্কৃত করবেন।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৯৬৫১)
যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাদের মানসিক চাপ ও হতাশা অনেক কমে যায়। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) কৃতজ্ঞতার স্তর নিয়ে বলেছেন, ‘বান্দা যদি জানত আল্লাহ তার অজান্তে তার জীবনের কত বড় বড় ক্ষতি ও বিপদ প্রতিদিন দূর করে দিচ্ছেন, তবে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় ও কৃতজ্ঞতায় বান্দার হৃদয় গলে যেত।’ (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, মাদারিজুস সালিকিন বাইনা মানাজিলি ইয়্যাকা নাবুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন, ২/২১৫, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬)
তাই জাগতিকভাবে সুখী কারও সঙ্গে তুলনা না করে ভালো-মন্দ যেকোনো পরিস্থিতিতেই মনের ভেতর অনাবিল প্রশান্তি এনে দিতে পারে শুকরিয়ার ওই একটিমাত্র শব্দ—‘আলহামদুলিল্লাহ’। আমরা পরম শান্তিতে বলতে পারি, হ্যাঁ, আল্লাহ অন্য অনেকের চেয়ে আমাকে অনেক ভালো রেখেছেন।
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক
writerismat@gmail.com