সিরাতের সময়রেখা ২

নবীজির মা মারা যান কখন ও কোথায়

নবীজির শৈশব শুরু হয়েছিল গভীর নিঃসঙ্গতা দিয়ে। জন্মের আগেই পিতৃহারা হওয়া শিশুটি মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকেও হারান। সিরাত সাহিত্যের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় মা আমেনার এই মৃত্যু।

প্রাচীন ভূগোলবিদদের বিবরণ আর আধুনিক দূরত্ব-পরিমাপ মিলিয়ে দেখলে ঘটনাটির ভূগোল ও কালপঞ্জি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মদিনা যাত্রার প্রেক্ষাপট

দুধমাতা হালিমা সাদিয়ার কাছে শৈশবের প্রথম পর্ব কাটিয়ে মক্কায় ফেরার পর মা আমেনা তাঁর ছয় বছর বয়সী পুত্রকে নিয়ে ইয়াসরিবে (মদিনায়) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এর পেছনে পারিবারিক কারণ ছিল দুটি: এক. প্রয়াত স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করা, দুই. প্রপিতামহ হাশিমের সূত্রে মদিনার বনু আদি ইবনে নাজ্জার গোত্রের আত্মীয়দের সঙ্গে শিশু মুহাম্মদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১১৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

মা আমেনা, শিশু মুহাম্মদ আর তাঁদের বিশ্বস্ত পরিচারিকা উম্মে আইমান—এই ছোট্ট কাফেলাটি তৎকালীন প্রধান বাণিজ্যপথ ধরে মদিনায় পৌঁছে বনু নাজ্জারের পারিবারিক আবাসে প্রায় এক মাস অবস্থান করে। (ইবনে হিশাম, আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৬৮, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)

পারিবারিক কারণ ছিল দুটি: এক. প্রয়াত স্বামী আবদুল্লাহর কবর জিয়ারত করা, দুই. প্রপিতামহ হাশিমের সূত্রে মদিনার বনু আদি ইবনে নাজ্জার গোত্রের আত্মীয়দের সঙ্গে শিশু মুহাম্মদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

আবওয়ার অবস্থান ও দূরত্ব

মদিনায় এক মাস অবস্থানের পর মক্কার উদ্দেশে ফেরার পথেই ঘটে বিপর্যয়। মক্কা-মদিনার মধ্যবর্তী প্রধান কাফেলা-পথের একটি পরিচিত বিরতিস্থল ছিল ‘আবওয়া’, যা আজকের রাবিগ শহরের কাছাকাছি ও মাসতুরাহ অঞ্চলের পূর্বে অবস্থিত বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

প্রাচীন মুসলিম ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাবি আবওয়াকে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী এবং প্রাচীন আরবের হিসাবে মদিনা থেকে ৫ ‘মারহালাহ’ দূরবর্তী একটি ঐতিহাসিক জনপদ বলে বর্ণনা করেছেন। (ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ১/৭৯, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫)

আধুনিক দূরত্ব-পরিমাপে রাবিগ থেকে মদিনার দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ১৯৪ থেকে ২৭৫ কিলোমিটারের মধ্যে পড়ে। এই হিসাবে মদিনা থেকে আবওয়া পর্যন্ত দূরত্ব মোটামুটি ২০০ থেকে ২২০ কিলোমিটার। জিপিএস স্থানাঙ্কে এর অবস্থান প্রায় ২৩.০২° উত্তর অক্ষাংশ ও ৩৯.১০° পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী এলাকায়। 

তৎকালীন কাফেলার সাধারণ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৪.৫ থেকে ৫ কিলোমিটার এবং দৈনিক এক ‘মারহালাহ’ অর্থাৎ প্রায় ৪৪.৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রমের স্বাভাবিক নিয়মে মদিনা থেকে আবওয়া পৌঁছতে কাফেলার চার থেকে পাঁচ দিনের মতো সময় লাগার কথা। (আলি জুমা, আল-মাকায়িল ওয়াল মাওয়াজিন আশ-শারইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৬৪, দারুল কুদস, কায়রো, ২০০১)

পিতার পর সম্পূর্ণ মাতৃহীন হওয়া ছয় বছরের নিঃসঙ্গ শিশুকে নিয়ে উম্মে আইমান একাই বাকি প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় ফেরেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি শিশুটি তাঁর দাদা, কোরাইশ প্রধান আবদুল মুত্তালিবের হাতে তুলে দেন।

আবওয়া উপত্যকায় বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে। যেমন—মসজিদ আল-কুরাইন, মসজিদ আল-জুমা, সুক কাবায়েল, বিরে কুরাশিয়া (কুরাইশি কূপ)। ‘সুক কাবায়েল’, যা নাজলাত কাবাকাবের কাছে অবস্থিত। রাস্তার দুই পাশে মুখোমুখি সারিবদ্ধ পাথুরে দোকানের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, এই বাজারটি দশম হিজরি শতকের (আনুমানিক ৯৪০ হিজরি)।

এ ছাড়া এলাকাটিতে আব্বাসীয় হজের পথে ব্যবহৃত পাথরের মাইলফলকের অবশিষ্টাংশ ছড়িয়ে রয়েছে। আছে লিহিয়ানীয় শিলালিপি ও প্রাচীন ইসলামি লিপি, যা উপত্যকায় সুপ্রাচীন মানববসতি এবং আরব উপদ্বীপের বাণিজ্যিক পথের সঙ্গে এর প্রাথমিক যোগাযোগের প্রমাণ দেয়। (আল–আরাবিয়া ডট নেট, আল–আবওয়া আত–তারিখিয়্যা: মুহাত্তাতুন মিন তুফুলাতিন নাবিয়্যি, প্রকাশিত: ০৮ মার্চ, ২০২৬, রিয়াদ)

বয়স নির্ণয়ের হিসাব

সিরাতের ধারাবাহিক সময়রেখায় নবীজির জন্মসাল সাধারণত ৫৩ হিজরি পূর্ব (৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ) ধরা হয়। ঐতিহাসিকদের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য আছে যে মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় পূর্ণ চন্দ্রবছর। (ইবনে সাইয়্যিদ আন-নাস, উয়ুনুল আসার ফি ফুনুনিল মাগাজি ওয়াশ শামায়িল ওয়াস সিয়ার, ১/৪৫, দারুল কলম, বৈরুত, ১৯৯৩)

সুতরাং চন্দ্রকলার গতিবিধি ও দিনপঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, ৫৩ থেকে ৬ বাদ দিলে হিজরি-পূর্ব কালরেখায় এই ঘটনার সময় দাঁড়ায় ৪৭ হিজরি পূর্ব। রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর জন্ম হওয়ায় বলা যায় ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার মাসটিও ছিল রবিউল আউয়াল।

আবার ছয় চান্দ্রবছর সৌর হিসাবে প্রায় ৫ বছর ১০ মাসের সমান, তাই জন্মতারিখ (২০ এপ্রিল, ৫৭১) থেকে হিসাব করলে এই ঘটনা ৫৭৭ খ্রিষ্টাব্দের প্রথমার্ধে, মোটামুটি ফেব্রুয়ারির কাছাকাছি সময়ে পড়ে বলে অনুমান করা যায়। 

মরুর বুকে অন্তিম শয়ান

দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি ও কঠোর মরু-আবহাওয়ায় আবওয়ায় পৌঁছানোর পরপরই মা আমেনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্জন উপত্যকায় তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিচারিকা উম্মে আইমান ও স্থানীয়দের সহায়তায় আবওয়ার পাহাড়ের ঢালে তাঁকে সমাহিত করা হয়। 

শৈশবের মর্মান্তিক স্মৃতি নবীজির হৃদয়ে চিরকাল অমলিন ছিল। পরবর্তীকালে হোদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের অভিযানে যখনই তিনি আবওয়ার পাশ দিয়ে গেছেন, তখনই মায়ের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।

পিতার পর সম্পূর্ণ মাতৃহীন হওয়া ছয় বছরের নিঃসঙ্গ শিশুকে নিয়ে উম্মে আইমান একাই বাকি প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় ফেরেন। মক্কায় পৌঁছে তিনি শিশুটি তাঁর দাদা, কোরাইশ প্রধান আবদুল মুত্তালিবের হাতে তুলে দেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১১৬, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

নবীর স্মৃতিতে আবওয়ার প্রান্তর

শৈশবের এই মর্মান্তিক স্মৃতি নবীজির হৃদয়ে চিরকাল অমলিন ছিল। পরবর্তীকালে হোদাইবিয়ার সন্ধি ও মক্কা বিজয়ের অভিযানে যখনই তিনি আবওয়ার পাশ দিয়ে গেছেন, তখনই মায়ের কবরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।

একবার তিনি মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তাঁর কান্না দেখে আশপাশের সাহাবিরাও কেঁদে ওঠেন। মহানবী (সা.) জানান, তিনি আল্লাহর কাছে  মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চেয়েছিলেন, তা মঞ্জুর হয়নি; পরে তিনি মায়ের কবর জিয়ারতের অনুমতি চান, তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৭৬)