সিরাত

ইসলামের সূচনায় খাদিজা (রা.)–এর ভূমিকা

ইসলামের সূচনালগ্নের ইতিহাসে খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ (রা.) এমন এক মহীয়সী নারী, যাঁর অবদান শুধু একজন স্ত্রীর সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং তিনি ছিলেন নবুয়তের প্রথম আশ্রয়, প্রথম বিশ্বাসী, প্রথম সহযোদ্ধা এবং ইসলামের প্রথম অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক।

মুহাম্মদ (সা.)–এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা, আস্থা ও আনুগত্য ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

নবুয়ত-পূর্ব সময়েই মুহাম্মদ (সা.) গভীর আত্মিক অন্বেষণে নিমগ্ন হয়ে পড়েন। সমাজের অন্যায়, কুসংস্কার ও নৈতিক অধঃপতন তাঁকে বিচলিত করত। এ সময় তিনি প্রায়ই শহরের অদূরে জাবালে নুরের হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যান ও সাধনায় সময় কাটাতেন। সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেখানে অবস্থান করতেন তিনি।

সংসার ও পারিবারিক জীবন থেকে এই সাময়িক দূরত্বে কোনো অভিযোগ তো দূরের কথা, বরং খাদিজা (রা.) পূর্ণ সমর্থন ও ভালোবাসা দিয়ে স্বামীর পাশে দাঁড়ান। বয়সে পঞ্চাশোর্ধ্ব হয়েও তিনি নিজ হাতে খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বহন করে সেই দুর্গম পাহাড়ে পৌঁছে দিতেন—যেখানে উঠতে আজকের শক্ত যুবকেরাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

খাদিজার আচরণ আমাদের জানিয়ে দেয়, তিনি কেবল একজন স্ত্রী নন; তিনি ছিলেন স্বামীর আদর্শ সহচর, আস্থার আশ্রয় এবং আত্মিক যাত্রার নীরব সহযাত্রী।

খাদিজার এই আচরণ আমাদের জানিয়ে দেয়, তিনি কেবল একজন স্ত্রী নন; তিনি ছিলেন স্বামীর আদর্শ সহচর, আস্থার আশ্রয় এবং আত্মিক যাত্রার নীরব সহযাত্রী। তিনি কখনো সংসারের দায়দায়িত্বের কথা তুলে অভিযোগ করেননি কিংবা স্বামীর সাধনাকে অবহেলা করেননি। বরং তাঁর প্রতিটি কাজে নির্ভেজাল সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছেন অকুণ্ঠভাবে।

৬১০ খ্রিষ্টাব্দে, রমজান মাসে, যখন তাঁর বয়স ৪০ বছর এবং খাদিজার বয়স ৫৫, তখন হেরা গুহায় নাজিল হয় প্রথম ওহি। কিন্তু এই মহান ঘটনার পর তিনি প্রবল ভীতি ও বিস্ময়ে আক্রান্ত হন। কী ঘটেছে—তা তিনি তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি। শরীর কাঁপতে থাকে, হৃদয় ভরে ওঠে শঙ্কায়।

এই সংকটময় মুহূর্তে তিনি আশ্রয় নেননি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বকর (রা.) কিংবা অভিজ্ঞ চাচা আবু তালিবের কাছে। বরং ছুটে যান তাঁর জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—স্ত্রী খাদিজার কাছে। ঘরে ঢুকেই কাঁপতে কাঁপতে বলেন, ‘আমাকে আবৃত করো।’

খাদিজা (রা.) তাঁকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরেন, কম্বল মুড়ে দেন, সাহস ও সান্ত্বনা দেন। নবীজি (সা.) যখন আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সম্ভবত শয়তানের কোনো প্রভাব পড়েছে তাঁর ওপর, তখন খাদিজা দৃঢ়কণ্ঠে তা নাকচ করে দেন।

তিনি নবীজির চরিত্র, সততা, মানবিকতা ও সমাজসেবার কথা তুলে ধরে বলেন, আল্লাহ কখনো এমন একজন মানুষকে অপমানিত করবেন না, যিনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, সত্য বলেন, অসহায়দের বোঝা বহন করেন এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৯৮২)

খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ও ধর্মগ্রন্থে পারদর্শী ওয়ারাকা পুরো ঘটনা শুনে নিশ্চিত করেন, এ সেই ফেরেশতা, যিনি মুসা (আ.)–এর কাছে ওহি নিয়ে এসেছিলেন।

এ মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নবুয়তের প্রথম আশ্বাস ও প্রথম স্বীকৃতি এসেছে এক নারীর হৃদয় থেকে। খাদিজাই ছিলেন নবীজির প্রথম বিশ্বাসী, প্রথম অনুসারী। সংকটকালে স্বামীর ওপর তাঁর এই অটল আস্থা ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য শিক্ষা হয়ে আছে—যেখানে স্ত্রী কেবল সংসারের অংশ নন, বরং বিশ্বাস ও নেতৃত্বের সহযাত্রী।

নবীজির ভীতি দূর করার জন্য খাদিজা (রা.) তাঁকে নিয়ে যান তাঁর জ্ঞানী চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ও ধর্মগ্রন্থে পারদর্শী ওয়ারাকা পুরো ঘটনা শুনে নিশ্চিত করেন, এ সেই ফেরেশতা, যিনি মুসা (আ.)–এর কাছে ওহি নিয়ে এসেছিলেন।

তিনি তাঁকে শেষ নবী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন, নিজ জাতির বিরোধিতা ও নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে তাঁকে। এই কথাগুলো খাদিজার সামনে ইসলামের ভবিষ্যৎ সংগ্রামের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৯৮২)

নবুয়তের পর থেকেই খাদিজা (রা.) সরাসরি দাওয়াতি কাজে যুক্ত হয়ে পড়েন। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিতে থাকেন। স্বামীর নিরাপত্তার জন্য নিজ অর্থে দাস ক্রয় করেন। তাঁর সম্পদ ইসলামের প্রথম অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নবীজির দুই কন্যা রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুম (রা.)–এর ওপর নেমে আসা সামাজিক নির্যাতন ও তালাকের যন্ত্রণাও তাঁকে নীরবে সহ্য করতে হয়।

নামাজ ফরজ হওয়ার আগেই হজরত খাদিজা নবীজির সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে তিনিই প্রথম নারী, যিনি আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে নামাজ পড়ার গৌরব অর্জন করেন। আলী (রা.) ও আফিফ কিন্দির বর্ণনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামের প্রথম জামাত গড়ে উঠেছিল নবীজি, খাদিজা ও আলী (রা.)–কে কেন্দ্র করে। (সিরাতে ইবনে ইসহাক: ৩/১৩৭)

ইসলামের ইতিহাসে তিনি কেবল প্রথম মুসলিম নারী নন; তিনি ছিলেন নবুয়তের প্রথম আশ্রয়, ইসলামের প্রথম শক্তি এবং ভালোবাসা, ত্যাগ ও আনুগত্যের এক চিরন্তন আদর্শ।

ইসলাম প্রচারে নিজের সব সম্পদ ব্যয় হওয়ায় নবীজি একসময় অনুতপ্ত বোধ করলে খাদিজা (রা.) কোরাইশ নেতাদের সাক্ষী রেখে ঘোষণা দেন—তাঁর সব সম্পদ নবীজির জন্য হাদিয়া। এই সম্পদ নবীজি ব্যক্তিগত ভোগে নয়, বরং এতিম, মিসকিন ও নিঃস্বদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। দাম্পত্য জীবনে দারিদ্র্য এলেও তাঁদের ভালোবাসা ও ঐক্য আরও দৃঢ় হয়।

শেষতক আসে সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়—শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ। অনাহার, দুঃখ ও কষ্টের সেই সময়ে খাদিজা (রা.) সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও অবরুদ্ধ মুসলমানদের সঙ্গে কষ্ট ভাগ করে নেন। নিজের জন্য পাঠানো গোপন খাদ্যও তিনি বিলিয়ে দেন অন্যদের মধ্যে। এই কষ্টে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। (সিরাতে নববি, রাগিব সারজানি, পৃ. ৬)

জীবনের শেষনিশ্বাস পর্যন্ত হজরত খাদিজা (রা.) ইসলাম, রাসুল ও মুসলমানদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেন। ইসলামের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর অবদান এতটাই গভীর যে তাঁর ত্যাগ ছাড়া ইসলামের প্রাথমিক অগ্রযাত্রা কল্পনাই করা যায় না।

সার্বিকভাবে, হজরত খাদিজা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে কেবল প্রথম মুসলিম নারী নন; তিনি ছিলেন নবুয়তের প্রথম আশ্রয়, ইসলামের প্রথম শক্তি এবং ভালোবাসা, ত্যাগ ও আনুগত্যের এক চিরন্তন আদর্শ।

আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক