মানবজাতির ইতিহাসে কোরবানির দুটি ঘটনা বিশেষভাবে স্মরণীয়। একটি হাবিল ও কাবিলের কোরবানি, অন্যটি নবী ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্র নবী ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের ঘটনা।
এই দুই ইতিহাসের মধ্যে নিহিত রয়েছে ইমান, আন্তরিকতা ও আত্মোৎসর্গের গভীর শিক্ষা।
হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল তাঁর আন্তরিকতার কারণে। পক্ষান্তরে কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল তার অন্তরের অসততা ও কৃপণতার জন্য।
কোরবানির প্রথম ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলকে কেন্দ্র করে। তারা উভয়েই আল্লাহর জন্য কোরবানি পেশ করেছিলেন। হাবিল তাঁর উৎকৃষ্ট পশু কোরবানি করেন, আর কাবিল উৎসর্গ করেন নিম্নমানের শস্য।
আল্লাহ–তাআলা হাবিলের কোরবানি কবুল করেন, কিন্তু কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যান করেন। এতে কাবিল ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজ ভাই হাবিলকে হত্যা করে বসে।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যখন তারা উভয়েই একটি করে কোরবানি পেশ করেছিল, তাদের একজনের কোরবানি কবুল করা হলো আর অন্যজনেরটি কবুল করা হলো না। তখন সে বলল, ‘আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।’ জবাবে অপরজন বলল, ‘আল্লাহ তো শুধু পরহেজগারদের (কোরবানিই) কবুল করেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৭)
এই ঘটনার মাধ্যমে কোরআন আমাদের একটি মৌলিক সত্য শিক্ষা দেয়, তা হলো— আল্লাহর কাছে বাহ্যিক আড়ম্বর নয়, অন্তরের তাকওয়া ও নিষ্ঠাই গ্রহণযোগ্য।
হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল তাঁর আন্তরিকতার কারণে। পক্ষান্তরে কাবিলের কোরবানি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল তার অন্তরের অসততা ও কৃপণতার জন্য।
কোরবানির এই শিক্ষা এখনও সমানভাবে প্রযোজ্য। পশুর আকার বা মূল্য নয়, নিয়তের বিশুদ্ধতাই আল্লাহর কাছে মুখ্য।
পুত্রকে নিজের স্বপ্নের কথা জানালে ইসমাইল (আ.) অবিচল আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন।’
হজরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর খলিল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে আল্লাহর আদেশে কোরবানি করার নির্দেশ পেয়ে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
পুত্রকে নিজের স্বপ্নের কথা জানালে ইসমাইল (আ.) অবিচল আনুগত্যের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফ্ফাত, আয়াত: ১০২)
কোরবানির ইতিহাস আমাদের শেখায় যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি নিজের প্রবৃত্তি, স্বার্থ, লোভ ও পার্থিব আসক্তিকে আল্লাহর নির্দেশের সামনে উৎসর্গ করতে পারেন। কোরবানির মূল চেতনা এখানেই নিহিত।
কোরবানি বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনের ইবাদত হলেও এর শিক্ষা সারাজীবনের জন্য। কোরবানির প্রকৃত চেতনা তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন আমরা ঈদের পরও আল্লাহর আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মত্যাগের এই আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করব।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও কোরবানির চেতনা জীবন্ত রাখা সম্ভব।
নিজের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহর বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, হারাম ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা, মানুষের হক আদায় করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা কোরবানির শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।
একই সঙ্গে আমাদের হৃদয় থেকে অহংকার, হিংসা, লোভ ও স্বার্থপরতা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। হাবিলের মতো আন্তরিকতা এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর মতো নিঃশর্ত আনুগত্যকে জীবনের আদর্শে পরিণত করতে পারলেই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হবে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও কোরবানির চেতনা জীবন্ত রাখা সম্ভব।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ