একজন মুসলিম নারীর হাত ধরে সূচনা হয়েছিল মামলুক শাসনের। আইয়ুবি বংশের পতনের পর শাজারাতুদ দুর (১২২০–১২৫৭ খ্রি.) মামলুক সালতানাতের ভিত্তি গড়েন। তৎকালীন মুসলিম সমাজ একজন নারীর শাসন মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও তিনি নিজেকে অত্যন্ত দক্ষ ও দয়ালু শাসক হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে সুলতান জহির বাইবার্সের (১২২৩–১২৭৭ খ্রি.) হাত ধরে এই শাসনব্যবস্থা পূর্ণতা পায়। বাইবার্স নিজেই ছিলেন একজন ‘আলেম মুজাহিদ’, যাঁর শাসনামলে সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছিল।
ইসলামের ইতিহাসে মামলুকরা ছিল অন্যতম ‘বুদ্ধিবৃত্তিক যুগের’ কারিগর।
মামলুকরা কেবল রাজনীতি বা যুদ্ধের মাধ্যমে ইতিহাসে স্থান পেতে চায়নি, তারা চেয়েছিল ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে অমর হতে। যেহেতু জন্মগতভাবে তাঁরা ওই অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন না (তাঁদের দাস হিসেবে বাইরে থেকে কিনে আনা হতো), তাই তাঁদের মধ্যে একধরনের ‘শিকড়হীনতার ভয়’ কাজ করত।
কায়রোর পাহাড়ি দুর্গে মামলুক বালকদের কঠোর সামরিক ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হতো। অনেকটা আজকের আধুনিক ক্যাডেট কলেজের মতো।
নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে তাঁরা ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্বকে ঢাল হিসেবে বেছে নেন। তাঁরা ইবনে খালদুন, আল-মাকরিজি ও ইবনে তাগরিবার্দির মতো কালজয়ী ঐতিহাসিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
কায়রোর পাহাড়ি দুর্গে মামলুক বালকদের কঠোর সামরিক ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হতো। অনেকটা আজকের আধুনিক ক্যাডেট কলেজ বা সামরিক একাডেমির মতো।
কোনো মামলুক শিশুকে কেনার পর সুলতান তাঁকে সরাসরি তলোয়ার হাতে দিতেন না। শুরুতে তাঁকে একজন ধর্মীয় শিক্ষকের (ফকিহ) কাছে পাঠানো হতো। সেখানে কোরআন পাঠ, লেখালেখি এবং শরিয়তের মৌলিক আদব শেখানো হতো।
এরপর কৈশোরে আসত ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের প্রাথমিক পাঠ। মেধাবীরা সাহিত্য ও দর্শনে ব্যুৎপত্তি অর্জন করত। কেবল সাবালক হওয়ার পরই শুরু হতো ঘোড়সওয়ারি, তিরন্দাজি ও বর্শা চালানোর তালিম।
এই সমন্বিত শিক্ষার ফলেই মামলুকরা একই সঙ্গে ‘ফকিহ’ ও ‘আমির’ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেন।
মামলুকরা কায়রো ও দামেস্কের রাজপথে মাদ্রাসা ও একাডেমির এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। যখন হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী পুরো মুসলিম বিশ্বকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছিল, তখন ১২৬০ সালের আইন জালুত যুদ্ধে সুলতান কুতুজ ও বাইবার্স তাদের পরাজিত করে নীল নদের অববাহিকাকে রক্ষা করেন।
সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি যে অসম্পূর্ণ কাজ রেখে গিয়েছিলেন, মামলুক সুলতান আশরাফ খলিল ১২৯১ সালে আক্রা জয়ের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করেন এবং ক্রুসেডারদের চিরতরে বিতাড়িত করেন।
একই সময়ে তাঁরা কায়রোকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষানগরীতে পরিণত করেন। ইবনে খালদুনের মতে, মামলুকদের করা ওয়াকফ বা দানকৃত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল অগণিত।
প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর জন্য তাঁরা কৃষিজমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওয়াকফ করে দিতেন, যা থেকে প্রতিবছর লাখো স্বর্ণমুদ্রা আয় হতো। এর ফলে আলেমরা সুলতানের মুখাপেক্ষী না হয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারতেন।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া জামিয়া আল-আজহারকে সুলতান বাইবার্স ১২৬৭ সালে পুনরায় চালু করেন, যা আজও বিশ্বের প্রধান শিক্ষা কেন্দ্র।
হাদিস বিশারদ ইমাম জাহাবির শিক্ষক ছিলেন একজন মামলুক আমির—সানজার আল-তুর্কি। জাহাবি তাঁকে ‘আল-আমির আল-কাবির আল-আলেম’ বলে সম্বোধন করেছেন।
অনেক মামলুক ‘আমির’ একই সঙ্গে উচ্চপদস্থ জেনারেল এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। যেমন—সুলতানের ‘নায়েব’ আমির আরগুন শাহ আল-নাসিরি ইমাম আবু হানিফার মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দেওয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন।
তিনি রাতের বেলা প্রদীপের আলোয় নিজ হাতে পুরো সহিহ বুখারি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সুলতানি বডিগার্ড বা ‘খাস মামলুক’ বদরুদ্দিন হাসান ইবনে খাস বক ছিলেন একাধারে ফিকহ ও আরবি ব্যাকরণের পণ্ডিত।
হাদিস বিশারদ ইমাম জাহাবির শিক্ষক ছিলেন একজন মামলুক আমির—সানজার আল-তুর্কি। জাহাবি তাঁকে ‘আল-আমির আল-কাবির আল-আলেম’ বলে সম্বোধন করেছেন। ইমাম মিজ্জি ও ইমাম বিরজালি তাঁর কাছ থেকে হাদিস শোনার জন্য আসতেন এবং তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংকলন (মু’জাম) তৈরি করেছিলেন।
আবার ইমাম ইবনে হাজার আসকালানির কাছে নিয়মিত হাদিস পড়তেন কায়রো দুর্গের নিরাপত্তা প্রধান তাগরি বারমিশ। পরে তিনি বুখারি ও আবু দাউদ হাদিসগ্রন্থের ওপর অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।
জ্ঞানের ক্ষেত্রে মামলুকরা কোনো সংকীর্ণতা রাখেনি। তাঁরা তৎকালীন শ্রেষ্ঠ নারী মুহাদ্দিসদের কাছেও শিষ্যত্ব গ্রহণ করতেন।
১৩ শতকের বিশিষ্ট সামরিক জেনারেল সাইফ উদ্দিন খলিল বিন তুরুন্তাই তৎকালীন শ্রেষ্ঠ নারী হাদিস বিশারদ ‘সিত্তুল উজারা’র কাছ থেকে সহিহ বুখারি শুনেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে মিশরে নিজেই বুখারির একজন বড় বর্ণনাকারী (রাবী) হিসেবে পরিচিতি পান।
কায়রো দুর্গের ভেতরে খোদ সুলতানের উপস্থিতিতে নারী মুহাদ্দিসরা হাদিসের পাঠ দিতেন, যেখানে বড় বড় জেনারেলরা ছাত্র হিসেবে উপস্থিত থাকতেন।
সালাহউদ্দিন ইবনে কাইকালদি আল-আলাই ছিলেন একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং ব্যাকরণবিদ। শুরুতে তিনি পুরোদস্তুর সামরিক পোশাকে থাকতেন, পরে সেই পোশাক ছেড়ে পুরোপুরি ইলমের জগতে আত্মনিয়োগ করেন।
এ ছাড়া আলাউদ্দিন ইবনে বালাবান ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ জেনারেল, কিন্তু একই সঙ্গে তিনি সহিহ ইবনে হিব্বান ও তাবারানির মতো বিশাল হাদিস গ্রন্থগুলোকে ফিকহি বিন্যাসে সাজিয়েছিলেন।
তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে সমকালীন আলেমরা বলেছিলেন, “তিনি অনায়াসেই প্রধান বিচারপতির (কাজি) দায়িত্ব পালন করতে পারতেন।”
তাঁরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন, যাঁরা সকালে ঘোড়ার পিঠে মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে লড়তেন, আর রাতে কায়রোর কোনো মাদ্রাসায় বসে সহিহ বুখারির সনদ বিশ্লেষণ করতেন।
সাধারণত মনে করা হয় সৈন্যরা রুক্ষ স্বভাবের হয়। কিন্তু মামলুক আমিরদের মধ্যে ছিল অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা ও সংগীতের সমঝদারি। সুলতান আল-জহির তাতার তুর্কি ভাষায় চমৎকার কবিতা লিখতেন।
মামলুকরা প্রমাণ করেছিলেন যে একই সঙ্গে কলম এবং কদম (পদযাত্রা) সামলানো সম্ভব। তাঁরা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন, যাঁরা সকালে ঘোড়ার পিঠে মঙ্গোলদের বিরুদ্ধে লড়তেন, আর রাতে কায়রোর কোনো মাদ্রাসায় বসে সহিহ বুখারির সনদ বিশ্লেষণ করতেন।
এটিই ছিল মধ্যযুগীয় ইসলামি সভ্যতার সেই ভারসাম্য, যা তাঁদের কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্ব নেতৃত্বে টিকিয়ে রেখেছিল।
(আলজাজিরা ডটনেট অবলম্বনে)