ধর্ম–দর্শন

ফেরেশতাদের সৃষ্টি কেন ও কীভাবে

দৃশ্যমান এই বিশ্বজগতের বাইরে এক পরম পবিত্র, নিষ্কলুষ ও পরাক্রমশালী জগৎ রয়েছে, যার বাসিন্দারা হলেন মহান আল্লাহর অনন্য সৃষ্টি ‘মালাইকা’ বা ফেরেশতাকুল। ইসলামি জীবনবিধানে ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস ইমানের ছয়টি মূল রুকনের অন্যতম।

ফেরেশতাদের কী দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে, তাঁদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য কেমন এবং মহাবিশ্ব পরিচালনায় তাঁদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী—তা নিয়েই আজকের আলাপ। মহাগ্রন্থ কোরআন ও প্রিয় নবীজির হাদিসে ফেরেশতাদের সৃষ্টিরহস্য, শারীরিক অবয়ব ও তাঁদের কর্মবন্টনের এক অপূর্ব চিত্র ফুটে উঠেছে।

মানুষ ও জিনের মতো ফেরেশতাদের কোনো জৈবিক চাহিদা বা প্রবৃত্তি দেওয়া হয়নি। তাঁদের ক্ষুধা-পিপাসা নেই, নিদ্রা বা বিশ্রাম নেই এবং তাঁদের মধ্যে কোনো প্রকার নর-নারী বা লিঙ্গভেদ নেই।

কী উপাদান দিয়ে ফেরেশতাদের সৃষ্টি

মানুষের সৃষ্টি উপাদান মাটি এবং জিন জাতির সৃষ্টি উপাদান উত্তপ্ত অগ্নিশিখা হলেও, ফেরেশতাকুলকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপাদানে সৃষ্টি করা হয়েছে—তা হলো ‘নুর’ বা স্বর্গীয় আলোকবর্তিকা। বিশুদ্ধ আলোর শুভ্রতা দিয়ে তাঁদের গঠন করার কারণেই তাঁদের স্বভাব সম্পূর্ণ পবিত্র ও নিষ্কলুষ।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নুর থেকে, জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে খাঁটি নির্ধূম অগ্নিশিখা থেকে এবং নবী আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই উপাদান (মাটি) দিয়ে, যার বর্ণনা ইতিপূর্বেই তোমাদের কাছে দেওয়া হয়েছে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৬)

আলোর মতো দ্রুতগামী, স্বচ্ছ ও অপার্থিব ক্ষমতাসম্পন্ন এই সৃষ্টি আল্লাহর সার্বক্ষণিক আদেশের অপেক্ষায় রত থাকেন।

ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য

মানুষ ও জিনের মতো ফেরেশতাদের কোনো জৈবিক চাহিদা বা প্রবৃত্তি দেওয়া হয়নি। তাঁদের ক্ষুধা-পিপাসা নেই, নিদ্রা বা বিশ্রাম নেই এবং তাঁদের মধ্যে কোনো প্রকার নর-নারী বা লিঙ্গভেদ নেই।

কোরআনে আল্লাহ তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, “তারা আল্লাহ যা নির্দেশ দেন তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ দেওয়া হয় তা-ই তারা পালন করে।” (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৬)

তাঁদের সার্বক্ষণিক কাজই হলো পরম স্রষ্টার মহিমা ঘোষণা করা। কোরআনে এসেছে, “তারা দিনরাত তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং কখনো ক্লান্তিবোধ করে না।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২০)

এছাড়া মহান আল্লাহ তাঁদের এমন অলৌকিক রূপ ও আকৃতি দিয়েছেন, যা সাধারণ মানবচোখে দেখা অসম্ভব। পবিত্র কোরআনে তাঁদের ডানার সৌন্দর্য ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যিনি ফেরেশতাদের বার্তাবাহকরূপে নিয়োগ করেছেন, যারা দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চার ডানাবিশিষ্ট; তিনি তাঁর সৃষ্টিতে যা ইচ্ছা বৃদ্ধি করেন।” (সুরা ফাতির, আয়াত: ১)

বলো, তোমাদের দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতাই তোমাদের প্রাণ হরণ করবে, অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের দিকেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
সুরা সাজদাহ, আয়াত: ১১

মহাবিশ্ব পরিচালনায় ফেরেশতাদের কর্মবন্টন

মহান আল্লাহ কোনো সৃষ্টির মুখাপেক্ষী নন; তিনি সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী ও সার্বভৌম। তথাপি মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল পরিচালনা ও বান্দার পরীক্ষার প্রেক্ষাপট নির্মাণে তিনি ফেরেশতাদের বিশেষ বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে নিয়োজিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান চারজন ফেরেশতার কাজ মানবজাতি ও সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. জিবরাইল (আ.): তিনি সকল ফেরেশতাদের নেতা এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রাসুলদের কাছে ওহি বা ঐশ্বরিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত দূত।

২. মিকাইল (আ.): প্রকৃতি জগতের আবহাওয়া, বৃষ্টিবর্ষণ এবং সৃষ্টির রিজিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে তিনি নিয়োজিত।

৩. ইসরাফিল (আ.): তিনি শিঙা হাতে মহাপ্রলয়ের নির্দেশ পালনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর ফুৎকারেই ঘটবে কিয়ামত এবং শুরু হবে পরকাল।

৪. মালাকুল মাউত: নির্দিষ্ট আয়ু শেষ হলে প্রাণীকুল ও মানবদেহের আত্মা বা রুহ কবজ করার দায়িত্বে তিনি সার্বক্ষণিক নিয়োজিত। কোরআনে বলা হয়েছে, “বলো, তোমাদের দায়িত্বে নিয়োজিত মৃত্যুর ফেরেশতাই তোমাদের প্রাণ হরণ করবে, অতঃপর তোমাদের প্রতিপালকের দিকেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে।” (সুরা সাজদাহ, আয়াত: ১১)

মানবজীবনের সঙ্গী ‘কিরামান কাতিবিন’

মহাজাগতিক দায়িত্ব ছাড়াও প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি ফেরেশতাদের সংযোগ রয়েছে। মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের নিখুঁত আমলনামা তৈরি করার জন্য সবসময় উপস্থিত থাকেন সম্মানিত ফেরেশতাদ্বয়, যাঁদের ‘কিরামান কাতিবিন’ বলা হয়।

কোরআনে বলা হয়েছে, “যখন ডানে ও বামে বসা দুই গ্রহণকারী (আমল) লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করুক না কেন, তা সংরক্ষণের জন্য তার কাছে সজাগ প্রহরী প্রস্তুত রয়েছে।” (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৭-১৮)

যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রতিটি ভালো-মন্দ কর্ম ও উচ্চারিত বাক্য নিষ্পাপ ফেরেশতারা লিখে রাখছেন, তখন তার অন্তরে অসৎ পথ পরিহার করার জোরালো আত্মসংযম তৈরি হয়।

ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস

ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানের বিষয় নয়; মুমিনের প্রাত্যহিক জীবনে এর গভীর নৈতিক প্রভাব রয়েছে। যখন একজন মানুষ উপলব্ধি করে যে তার প্রতিটি ভালো-মন্দ কর্ম ও উচ্চারিত বাক্য নিষ্পাপ ফেরেশতারা লিখে রাখছেন, তখন তার অন্তরে অসৎ পথ পরিহার করার জোরালো আত্মসংযম তৈরি হয়।

তখন নিভৃতে বা একাকী থাকলেও মানুষ অপরাধে লিপ্ত হতে দ্বিধাবোধ করে। একই সঙ্গে মুমিনের হৃদয় আল্লাহর অসীম কুদরত ও মহিমান্বিত ক্ষমতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় অবনত হয়।

নুরের জ্যোতিতে তৈরি ফেরেশতাকুল আল্লাহর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তাঁরা আনুগত্য ও সেজদার এক অনুপম প্রতীক। তাঁদের অস্তিত্ব ও নিখুঁত দায়িত্ব পালন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই বিশ্বজগতের কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়। বিশ্বজাহানের সব কিছুই এক সুমহান নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে।