হাদিস

এ যুগে ‘মুহাজির’ হওয়ার উপায় কী

ইসলামের ইতিহাসে হিজরত শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান পরিবর্তন ছিল না; বরং তা ছিল ইমান ও সত্যের সুরক্ষায় চরম ত্যাগের এক অমর মহাকাব্য। সেই ত্যাগের ফলেই ইসলামের দাওয়াত এক নতুন রূপ পায়—উৎপীড়িত জনগোষ্ঠীর স্থান থেকে মুসলিম উম্মাহ রূপান্তরিত হয় এক সার্বভৌম রাষ্ট্র ও কালজয়ী সভ্যতায়।

তবে ভৌগোলিক বা শারীরিকভাবে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের নির্দিষ্ট সময় ও ফজিলত অতীত ইতিহাসে পূর্ণতা পেলেও, হিজরতের আত্মিক দরজা কিন্তু কেয়ামত পর্যন্ত খোলা রয়েছে।

একজন মুমিনের জন্য হিজরত হলো প্রতিনিয়ত নিজের আত্মাকে পাপ থেকে পুণ্যের দিকে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে পরম করুণাময় রহমানের আনুগত্যের দিকে ধাবিত করার এক অনবদ্য আত্মিক সফর।

হিজরতের দুই রূপ

ইসলামে ‘হিজরত’ শব্দটি প্রধানত দুটি মূল ধারায় ভাগ করা হয়েছে:

১. শারীরিক হিজরত

শারীরিকভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যমে যে হিজরত সংগঠিত হয়, ইতিহাসের বিবর্তনে তার বহুবিধ উদ্দেশ্য ও রূপ ফুটে উঠেছে:

নবুয়তের যুগের স্থান পরিবর্তন: ইসলামের শুরুর দিকে ইমান ও জীবন রক্ষার জন্য সাহাবিদের হাবশায় (আবিসিনিয়া) হিজরত, পরবর্তী সময়ে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত, মদিনাকেন্দ্রীক সমাজ গঠনে বিভিন্ন আরব্য গোত্রের নবীজির কাছে আগমন এবং মক্কা বিজয়ের আগে মক্কাবাসীদের মদিনামুখী সফর—এসবই ছিল নবীযুগের বিশেষ হিজরত।

মানুষের ভেতরের রূপান্তর বা আত্মিক হিজরত, বাহ্যিক হিজরতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাহ্যিক হিজরতের বিশেষ বিধান শেষ হয়ে গেলেও আমলের এই হিজরত কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের সমাপ্তি: ৮ হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর যখন বিজিত ভূখণ্ড নিজেই ‘দারুল ইসলামে’ (ইসলাম অধ্যুষিত ভূমি) পরিণত হলো, তখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হলো।

মহানবী (সা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, “মক্কা বিজয়ের পর আর কোনো হিজরত নেই; তবে বাকি রয়েছে জিহাদ ও (সৎ কাজের) নিয়ত।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৮৩)

পরবর্তী যুগের ধর্মীয় সফরসমূহ: নবীজির ওফাতের পর ইসলামের বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে সাহাবি ও তাবেয়িদের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো, হাদিস ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর পথ অতিক্রম করা কিংবা কোনো দেশে ইমান ও ধর্মীয় পরিচয় টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়লে নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হওয়া—এ সবই শারীরিক হিজরতের আধুনিক রূপ।

২. আমলি হিজরত 

এটা হলো মানুষের ভেতরের রূপান্তর বা আত্মিক হিজরত, বাহ্যিক হিজরতের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাহ্যিক হিজরতের বিশেষ বিধান শেষ হয়ে গেলেও আমলের এই হিজরত কেয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

মহানবী (সা.) এই আত্মিক হিজরতের আসল সারমর্ম ফুটিয়ে তুলে বলেছেন, “প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী) তো সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)

এ যুগে আত্মিক হিজরতের রূপরেখা

আজকের পৃথিবীতে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্বায়নের প্রভাবে মানুষের ঘরে ঘরে যখন নৈতিক অবক্ষয়, পাপের নানাবিধ সুযোগ ও আত্মিক উদাসীনতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তখন ‘রহমানের আনুগত্যে হিজরত’ করার প্রয়োজনীয়তা অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকৃত মুহাজির (হিজরতকারী) তো সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা ত্যাগ করেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০

দৈনন্দিন জীবনে এই আত্মিক হিজরতের রূপায়ণ যেভাবে ঘটতে পারে:

  • শিরক থেকে তাওহিদের দিকে হিজরত: সমস্ত কৃত্রিম ভরসা, বস্তুপূজা বা অহংকার ত্যাগ করে একমাত্র এক আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করা।

  • বিদআত থেকে সুন্নাহর দিকে হিজরত: ধর্মীয় জীবনে মনগড়া প্রথা বা কুসংস্কার ছেড়ে নবীজির সুনির্দিষ্ট সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা।

  • পাপ থেকে আনুগত্যের দিকে হিজরত: চোখ, কান, জবান ও হাতের অবাধ পাপ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা।

  • উদাসীনতা থেকে জিকিরের দিকে হিজরত: পার্থিব বস্তুমোহ ও গাফলতি থেকে বের হয়ে রবের সার্বক্ষণিক স্মরণে মনকে সজীব রাখা।

  • কুসঙ্গ থেকে সৎসঙ্গের দিকে হিজরত: যেসব পরিবেশ বা বন্ধু মানুষকে পাপের দিকে টানে, তা ত্যাগ করে এমন মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়া যারা আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেয়।

হৃদয়ের এই সফর কীভাবে শুরু করবেন

হৃদয়কে পাপাচারের অন্ধকার থেকে রহমানের আনুগত্যের আলোয় নিয়ে আসার এই সফরটি খুব জটিল কোনো বিষয় নয়; বরং এর জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা:

১. সত্যকারের তওবা ও অনুশোচনা: অতীতের ভুলত্রুটির জন্য রবের কাছে লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে অন্যায়ে না ফেরার দৃঢ় সংকল্প করা।

২. ঐশ্বরিক সাহায্য প্রার্থনা: মানুষ নিজের শক্তিতে সবসময় প্রবৃত্তি জয় করতে পারে না। তাই প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া—‘হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।’

৩. ধারাবাহিক আত্মসংগ্রাম : একে ইসলামের পরিভাষায় বলে মুজাহাদা। পাপের ইচ্ছা জাগলে সাময়িক কষ্ট সহ্য করে রবের ভয়ে তা থেকে বিরত থাকা এবং সৎকাজে নিজের মনকে অভ্যস্ত করা।

৪. ব্যর্থতায় হতাশ না হওয়া: কোনো ভুল বা পাপ পুনর্বার ঘটে গেলেও হতাশ হয়ে পড়া যাবে না; বরং সাথে সাথে তওবা করে পুনরায় আনুগত্যের হিজরতে ফিরে আসতে হবে।

প্রতিদিনের পাপ, গাফলতি, অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে পরম করুণাময় রহমানের সুশীতল আনুগত্যের দিকে হিজরত করার সুযোগ আমাদের সামনে উন্মুক্ত।

আত্মিক হিজরতের লাভ

যে ব্যক্তি নিজের নফস ও শয়তানের প্ররোচনাকে পেছনে ফেলে মহান আল্লাহর আনুগত্যের দিকে হিজরত করে, সে জীবনে অনেক আসমানি ও আত্মিক নেয়ামতে ভূষিত হয়। যেমন:

  • আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি: নিজের প্রিয় কুপ্রবৃত্তি বিসর্জন দিয়ে প্রতিপালকের দিকে ধাবিত হলে আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করা যায়।

  • অন্তরের স্থায়িত্ব ও মানসিক প্রশান্তি: পাপাচারের তপ্ত দাহ থেকে বের হয়ে আসার পর অন্তরে এক অনাবিল শান্তি ও সাকিনাহ অবতীর্ণ হয়।

  • অন্যায় ও পাপ মোচন: আন্তরিক তওবা ও সৎকাজের দিকে প্রত্যাবর্তন অতীতের অপরাধসমূহ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয়।

  • ইমানের দৃঢ়তা ও আত্মিক শক্তি: প্রতিনিয়ত আল্লাহর পথে টিকে থাকার এই লড়াই মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী ও ইমানে অবিচল করে তোলে।

শেষ কথা

সাহাবি আবু ফাতিমা (রা.) একবার নবীজির কাছে আরজ করলেন, “আল্লাহর রাসুল, আমাকে এমন একটি কাজের উপদেশ দিন, যার ওপর আমি শক্তভাবে কায়েম থাকতে পারি।” মহানবী (সা.) তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, “তুমি হিজরতকে আঁকড়ে ধরো; কারণ এর সমকক্ষ আর কোনো আমল নেই।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৪১৬৮)

এখানে মহানবী (সা.) মূলত আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন, তা থেকে আমৃত্যু দূরে থাকার আত্মিক হিজরতের প্রতি নির্দেশ করেছেন।

আধুনিক পৃথিবীতে ভৌগোলিক সীমান্ত অতিক্রম করে আমাদের হয়তো কোথাও হিজরত করার সুযোগ তো নেই; কিন্তু প্রতিদিনের পাপ, গাফলতি, অন্যায় ও কুপ্রবৃত্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে পরম করুণাময় রহমানের সুশীতল আনুগত্যের দিকে হিজরত করার সুযোগ আমাদের সামনে উন্মুক্ত।