আল্লাহ–তাআলা নবীজিকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। তাই পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে সত্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর দায়িত্ব। সে কারণেই আল্লাহর রাসুল (সা.) তৎকালীন আরব উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাজা ও শাসকদের উদ্দেশে পত্র প্রেরণ করেন।
আল্লামা আহমদ ইবনে আলির প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সুবহুল আ‘শা ফি সানাআতিল ইনশা–এর আলোকে আল্লাহর রাসুলের এই পত্রাবলির বিভিন্ন ধরন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি লেখেন, এসব পত্র মূলত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়—
এক. মুসলিম শাসক ও গোত্রপ্রধানদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্র
দুই. অমুসলিম শাসক ও গোত্রপ্রধানদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্র
নবীজি (সা.) যেসব অমুসলিম রাজা ও গোত্রপ্রধানের কাছে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
হাবশার রাজা আসহামা নাজ্জাশি, রোমের সম্রাট কায়সার হিরাক্লিয়াস, পারস্যের সম্রাট কিসরা খসরু পারভেজ, আলেকজান্দ্রিয়া ও মিসরের শাসক মুকাউকিস, বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাওয়া, ইয়ামামার শাসক হাওজা ইবনে আলি, দামেস্কের শাসক হারিস গাসসানি, ওমানের শাসক জাইফার ও আব্দ, নাজরানের জনগণ, মুসাইলিমা কাজ্জাব, বনু জুযামা, বনু বকর ইবনে ওয়াইল, জুল-কিলাআ প্রমুখ।
অল্প কয়েকজন অমুসলিম শাসক ব্যতীত অধিকাংশ শাসক ও গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেন।
খ্রিষ্টানদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রসমূহে তিনি তাদের সঙ্গে একটি যৌথ মূলনীতির কথা উল্লেখ করেন। তা হলো তাওহিদ।
রাসুল (সা.) মুসলিম শাসক ও গোত্রপ্রধানদের কাছেও বিভিন্ন নির্দেশনামূলক পত্র প্রেরণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, মুনজির ইবনে সাওয়া, ফারওয়া ইবনে আমর আল-জুযামি, উকাইদির, ওয়াইল ইবনে হুজর, মালিক ইবনে নমত, বনু নাহদ, হাদরামাউতের জনগণ এবং আয়কিয়াল আবাহিলা।
নবীজি (সা.)-এর এসব পত্র বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করে। নিচে এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোকপাত করা হলো।
আল্লাহর রাসুল (সা.) মুশরিক আরবদের পাশাপাশি খ্রিষ্টান, ইহুদি ও অগ্নিপূজক শাসক ও নেতৃবৃন্দের কাছে ইসলামের পথে আসার আহ্বান জানিয়ে বার্তা ও পত্র প্রেরণ অব্যাহত রাখেন। এসব পত্রে তাদের উপদেশ দেওয়া হয় এবং ইমান ও সৎকর্মের আহ্বান জানানো হয়।
মুশরিক আরবদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রসমূহে তিনি তাদের শিরক ও মূর্তিপূজা পরিহার করে একমাত্র আল্লাহ–তাআলার ইবাদতের দিকে ডাকেন। পাশাপাশি পরকালের প্রতি বিশ্বাস, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ও হিসাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁকে আল্লাহর রাসুল হিসেবে মেনে নেওয়া এবং দুনিয়া ও ধর্মের সকল ক্ষেত্রে তিনি তাঁর অনুসরণের নির্দেশ দেন।
খ্রিষ্টানদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রসমূহে তিনি তাদের সঙ্গে একটি যৌথ মূলনীতির কথা উল্লেখ করেন। তা হলো তাওহিদ। তিনি হজরত ইসা (আ.)–কে আল্লাহর বান্দা ও রাসুল এবং ‘কালিমাতুল্লাহ’ হিসেবে স্বীকার করার ভিত্তিতে ইসলাম ও নবী হিসেবে তাঁর সত্যতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। কায়সার, মুকাউকিস ও নাজরানের জনগণের কাছে প্রেরিত পত্রগুলোতে এ বিষয়টি স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।
অগ্নিপূজকদের উদ্দেশে প্রেরিত বার্তায় আহরিমান ও ইয়াজদান পূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে বলেন তিনি। নিজেকে সমগ্র জগতের জন্য প্রেরিত রাসুল হিসেবে ঘোষণা করেন এবং আল্লাহর একত্ববাদে ইমান আনার দাওয়াত দেন।
কিসরা খসরু পারভেজের কাছে প্রেরিত পত্রে এই বিষয়টি সুস্পষ্ট। সেখানে ইসলাম গ্রহণ করলে নিরাপত্তা ও শান্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় আর অস্বীকার করলে সমগ্র পারস্যবাসীর গোমরাহি ও ধ্বংসের দায়ভার তার ওপর বর্তাবে বলে সতর্ক করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগা কিসরা সেই পত্র ছিঁড়ে ফেলে। ফলে আল্লাহর রাসুল (সা.) তার সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেন এবং তা সত্যে পরিণত হয়।
মুসলিম শাসক ও গোত্রপ্রধানদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রগুলোতে দাওয়াত নয়; বরং উপদেশ, নৈতিক নির্দেশনা এবং কখনো নামাজ, রোজা ও বিশেষভাবে জাকাত সংক্রান্ত বিধিবিধান বলা হয়েছে। যেমন: জাকাতের নিসাব, পরিমাণ, জাকাতযোগ্য সম্পদের ধরন ও অবস্থা ইত্যাদি।
কয়েকটি পত্রে ছিল প্রশাসনিক নির্দেশনা, যেখানে ভূমি দান, শাসনক্ষমতা বহাল রাখা ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে। দাওমাতুল জান্দালের জনগণের কাছে বাগান ও ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত চিঠি ছিল এক ধরনের চুক্তিপত্র। ওয়াইল ইবনে হুজরের কাছে প্রেরিত পত্রে তাঁর সকল সম্পত্তির মালিকানা নিশ্চিত করা হয় এবং অন্য কারো হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কোনো শাসক ইসলাম গ্রহণ না করলে তার অধীনস্থ প্রজাদের পাপের দায়ভারও তার ওপর বর্তাবে। অন্যদিকে মুসলমানদের কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অমান্য করলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও শাসকদের অপসারণের হুমকি দেওয়া হয়।
চুক্তিসংক্রান্ত পত্রে বিভিন্ন গোত্রকে অঙ্গীকার রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং রাসুলের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মুসলিম শাসকদের ইমান ও আমলের ওপর অবিচল থাকলে পুরস্কার, সম্মান ও জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। আর অমুসলিম শাসকদের ইসলাম গ্রহণ করলে শান্তি, নিরাপত্তা ও ক্ষমার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
নবীজি (সা.) ছিলেন নবী হিসেবে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। তাই তিনি স্পষ্ট ভাষায় অবিশ্বাসীদের জানিয়ে দেন, ইসলাম গ্রহণ না করলে জিজিয়া কর প্রদান করতে হবে আর তাও অস্বীকার করলে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তাতে দোজখের শাস্তির ভয় দেখানো হয়।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, কোনো শাসক ইসলাম গ্রহণ না করলে তার অধীনস্থ প্রজাদের পাপের দায়ভারও তার ওপর বর্তাবে। অন্যদিকে মুসলমানদের কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অমান্য করলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও শাসকদের অপসারণের হুমকি দেওয়া হয় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয় প্রদর্শন করা হয়।
সপ্তম শতাব্দীতে পৃথিবীতে দুটি প্রধান সাম্রাজ্য ছিল—রোম ও পারস্য। আরব উপদ্বীপে তখন গোত্রভিত্তিক জীবনব্যবস্থা চালু ছিল। রোম সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা পেয়েছিল। কারণ সম্রাট নিজেই ছিলেন খ্রিষ্টান। পারস্যে অগ্নিপূজক ধর্ম রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। নবী ইবরাহিমের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে আরব সমাজে প্রচলিত হয়েছিল মূর্তিপূজা।
এভাবে সমগ্র পৃথিবী কুফর ও শিরকের অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মানবতা অবিচার ও নির্যাতনের চাপে নিষ্পেষিত হচ্ছিল। ঠিক এই সময়েই নবুয়ত সূর্যের উদয় হলো। নবীজি (সা.) বৈশ্বিক শান্তি ও কল্যাণের বার্তা নিয়ে মক্কার উপত্যকায় আত্মপ্রকাশ করলেন। প্রথমে কিছু পবিত্র হৃদয়ের মানুষ এই আহ্বানে সাড়া দিল। এরপর সমগ্র বিশ্বের প্রতি রহমত হিসেবে তাঁর দাওয়াত বিস্তৃত করা হলো।
তিনি সাহাবিদের একত্র করে ঘোষণা করলেন, আমাকে সকল জগতের জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। তাই নিকট ও দূরের গোত্র ও শাসকদের কাছে শান্তি ও বিপ্লবের বার্তা পৌঁছে দাও। তারা হয় ইসলাম গ্রহণ করবে, নয়তো জিজিয়া প্রদান করবে; অন্যথায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
তবে এই তিনটির যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করল, কেউ নীরব রইল; আর কিসরা নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনল।
ইয়েমেনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ তা ছিল উর্বর, সমৃদ্ধ ও সুসংগঠিত অঞ্চল। তাই বহু পত্র ইয়েমেন সংশ্লিষ্ট গোত্রগুলোর কাছে পাঠানো হয়। এর ফলে আবদুল কাইস, আশআরিয়্যিন, কিনদা, আজদ, হামদান, গামিদ, নাখা’, বনু হারিস, দাওস, তুজিব, বাহরা, বালি, নাজরান ও হাদরামাউতের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়।
পত্রের শেষে নবুয়তের মোহর সংযুক্ত ছিল, যার ওপর ‘আল্লাহ’, মাঝে ‘রাসুল’ এবং নিচে ‘মুহাম্মদ’ খোদাই করা ছিল।
রাসুলের পত্রাবলিতে পত্ররচনার সর্বোচ্চ সাহিত্যিক গুণাবলি বিদ্যমান। কোরআনের পর তাঁর রচনা সর্বোচ্চ ভাষা–অলঙ্কার সমৃদ্ধ। তবে তা দীর্ঘসূত্রিতা, কৃত্রিম ছন্দ বা অলঙ্কারের ভারে নুয়ে পড়েনি। বরং সহজ, সংক্ষিপ্ত ও গভীর অর্থবহ ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি বাক্যে নবুয়তের সত্যতা, দৃঢ় বিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্পের ছাপ সুস্পষ্ট।
পত্রগুলোর ভাষা কঠোর নয়; কোমল, হৃদয়গ্রাহী। এই কারণেই অধিকাংশ শাসক ও গোত্র এসব পত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। লেখনশৈলী এতটাই স্পষ্ট যে, তা পত্ররচনার একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিটি পত্রের শুরুতে প্রেরক হিসেবে তাঁর নাম ও ‘আল্লাহর রাসুল’ উপাধি উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ‘আল্লাহর বান্দা’ শব্দ যুক্ত করে খ্রিষ্টানদের ইসা (আ.)–এর প্রভুত্বের ভ্রান্ত ধারণার সূক্ষ্ম প্রতিবাদ করা হয়েছে। প্রাপকের নাম ও উপযুক্ত উপাধিও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: ‘হিরাক্লিয়াস, রোমের মহাসম্রাট’, ‘কিসরা আব্রুয়েজ, পারস্যের বাদশাহ’, ‘নাজ্জাশি, হাবশার রাজা’।
শান্তির সম্ভাষণ প্রাপকের অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন হয়েছে। মুসলিমের জন্য ‘তোমার প্রতি শান্তি’ বা ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এনেছে, তার প্রতি শান্তি’; আর অমুসলিমের জন্য ‘যে হেদায়াত অনুসরণ করে, তার প্রতি শান্তি’।
এরপর আল্লাহর প্রশংসা, আল্লাহর একত্ব ও তাঁকে রাসুল হিসেবে মেনে নেওয়া এবং উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দূতদের আনুগত্যকে নিজের আনুগত্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অপরাধীদের ক্ষমার ঘোষণা রয়েছে। ইসলাম গ্রহণ না করলে জিজিয়া আরোপের বিধান উল্লেখ আছে। পত্রের শেষে নবুয়তের মোহর সংযুক্ত ছিল, যার ওপর ‘আল্লাহ’, মাঝে ‘রাসুল’ এবং নিচে ‘মুহাম্মদ’ খোদাই করা ছিল।
এই রচনাশৈলী অধিকাংশ পত্রে অভিন্ন হলেও কিছু পত্রে সূচনার ধরন ভিন্ন। যেমন, মালিক ইবনে নমত ও রিফাআহ ইবনে জায়েদের কাছে পত্রের শিরোনাম ছিল ‘হাযা কিতাব’, আর মুনজির ইবনে সাওয়ার পত্রের সূচনা ছিল ‘সালামুন আনতা’।