অধিকাংশ সময় তাঁর খাবারে থাকত কেবল খেজুর ও পানি
অধিকাংশ সময় তাঁর খাবারে থাকত কেবল খেজুর ও পানি

সিরাত

মহানবীর প্রিয় খাবার ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস

মহানবী (সা.)-এর খাদ্যাভ্যাস ছিল অত্যন্ত পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না; ভালো লাগলে খেতেন, আর ভালো না লাগলে চুপচাপ রেখে দিতেন।

বিলাসিতা নয়, বরং যা পাওয়া যেত তা দিয়েই তিনি তৃপ্ত হতেন। তাঁর প্রিয় খাবারগুলোর মধ্যে এমন কিছু খাদ্য ছিল, যা আজও পুষ্টিবিজ্ঞানে অত্যন্ত কার্যকর হিসেবে স্বীকৃত।

খাবারে পরিমিতিবোধ

নবীজির খাবার ছিল সাধারণ। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারের জন্য জীবনধারণের মতো প্রয়োজনীয় রিজিক দান করুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫৫)।

ইমাম ইবনুল কাইয়িম বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সা.) কখনো নির্দিষ্ট কোনো খাবারের জন্য জেদ করতেন না। ঘরে যা পাওয়া যেত, তা-ই খেতেন। আবার কোনো ভালো খাবার সামনে এলে তা গ্রহণেও দ্বিধা করতেন না।

তিনি দিনে দুই বেলার বেশি খাবার খেতেন না এবং অধিকাংশ সময় তাঁর খাবারে থাকত কেবল খেজুর ও পানি। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ২/৩৫৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)

তিনি দিনে দুই বেলার বেশি খাবার খেতেন না এবং অধিকাংশ সময় তাঁর খাবারে থাকত কেবল খেজুর ও পানি।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.), জাদুল মাআদ

নবীজির প্রিয় কিছু খাবার

হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে মহানবীর প্রিয় কিছু খাবারের তালিকা পাওয়া যায়:

১. খেজুর ও মধু: নবীজি (সা.) মধু ও মিষ্টি জাতীয় খাবার খুব পছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৩১)

বিশেষ করে আজওয়া খেজুরের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল।

২. গোশত ও পায়া: তিনি ছাগলের সামনের দিকের গোশত ও ঘাড়ের অংশ বেশি পছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৪৮)

৩. লাউ বা কদু: তিনি লাউ খুব পছন্দ করতেন। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুলকে পাত্রের চারপাশ থেকে লাউ খুঁজে নিয়ে খেতে দেখেছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৪৩৬)

৪. সারিদ: এটি ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় খাবার। এটি মূলত গোশতের ঝোল ও রুটির টুকরো দিয়ে তৈরি করা এক ধরনের সুস্বাদু খাবার।

৫. দুধ ও পনির: দুধ ছিল তাঁর নিত্যদিনের খাবারের বড় অংশ। এছাড়া তাবুক যুদ্ধের সময় তিনি পনির খেয়েছিলেন বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮১৯)

আহার কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, এটি একটি ইবাদতও বটে। অতিরিক্ত ভোজন এড়িয়ে চলা, খাবারের অপচয় না করা এবং হালাল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করাই ছিল তাঁর শিক্ষা।

খাদ্যের ভারসাম্য রক্ষা

নবীজি (সা.) খাবারের ভারসাম্য রক্ষায় সজাগ ছিলেন। তিনি তরমুজের সাথে তাজা খেজুর মিলিয়ে খেতেন এবং বলতেন—এটির গরম অন্যটির ঠান্ডা দিয়ে প্রশমিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৩৬)

তিনি জলপাই তেল খাওয়ার এবং ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। এছাড়া সিরকা বা ভিনেগারকেও তিনি ‘উত্তম সালুন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৫১)

অল্পে তুষ্টি ও শুকরিয়া

নবীজি (সা.)-এর ঘরে টানা দুই মাস উনুনে আগুন জ্বলত না—এমন অবস্থাও গেছে। তখন খেজুর ও পানিই ছিল তাঁদের প্রধান খাবার। অভাবের সময়েও তিনি ধৈর্য ধরতেন এবং প্রাচুর্যের সময়েও অপচয় করতেন না। 

জবের রুটি ছিল তাঁর প্রধান খাদ্য। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল ইন্তেকাল পর্যন্ত টানা দুই দিন পেট ভরে জবের রুটি খাননি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৭০)

মহানবীর খাদ্যাভ্যাস আমাদের শেখায়, আহার কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, এটি একটি ইবাদতও বটে। অতিরিক্ত ভোজন এড়িয়ে চলা, খাবারের অপচয় না করা এবং হালাল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করাই ছিল তাঁর শিক্ষা।