ধর্ম–দর্শন

ইসলামের আয়নায় পেশা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্কৃতি

মহানবী (সা.)-এর যুগে এমন বহু পেশার অস্তিত্ব ছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর আদর্শ ও জীবনাচারের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তাঁর সময়ে আমরা বিভিন্ন পেশাজীবীর দেখা পাই।

যেমন: শিক্ষক হিসেবে আবু সাইদ খুদরি, অনুবাদক হিসেবে জায়েদ ইবনে সাবেত, চিকিৎসক হিসেবে আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এবং বর্তমানের সাব-রেজিস্ট্রার বা দলিল লেখকের মতো কাজ করেছেন আলা ইবনুল উকবা, হোসাইন ইবনে নুমাইর ও মুগিরা ইবনে শুবা।

এ ছাড়া মন্ত্রী হিসেবে ছিলেন জায ইবনে সুহাইল সুলামি, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দিহয়া ইবনে খলিফা আল-কালবি, দ্বাররক্ষী হিসেবে রাবাহ আসওয়াদ, আবু মুসা আশআরি ও আনাস ইবনে মালিক (রা.)।

রাজমিস্ত্রি হিসেবে ছিলেন আম্মার ইবনে ইয়াসির ও তালক ইবনে আলী আত-তামিমি। ব্যবসায়ী হিসেবে ছিলেন উসমান ইবনে আফফান ও আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)।

নেতা বা প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন ইসলামের প্রথম ‘নারী নেত্রী’ আসমা বিনতে ইয়াজিদ এবং আউস আনসারি।

এবং সেই জাহাজসমূহ যা মানুষের উপকারে (পণ্য নিয়ে) সমুদ্রে চলাচল করে… তার মধ্যে বিবেকসম্পন্ন লোকেদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৪

সে সময়ে কামার হিসেবে ছিলেন আবু সাইফ কাইনি, খেজুর পাতা দিয়ে মাদুর বা ঝুড়ি তৈরিকারক ছিলেন সালমান ফারসি, বাবুর্চি ছিলেন আবু উবাইদা কাদি, এমনকি নৌ-উদ্ধারকারী পুলিশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সফিনা (রা.)।

এসব বিচিত্র পেশা ও কারিগরি দক্ষতা আমাদের সামনে নবুয়তের আদর্শের এক অজানা দিক উন্মোচন করে।

মহানবী (সা.) পেশাজীবীদের গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাঁদের পেশাগত শিষ্টাচার ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি তাঁদের সর্বোচ্চ সততা, আমানতদারি ও নিপুণতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হয়।

মানুষের উপকার করা এমন এক মহৎ কাজ, যার সম্পর্কে আল্লাহ আপন নিদর্শনাবলির উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘...এবং সেই জাহাজসমূহ যা মানুষের উপকারে (পণ্য নিয়ে) সমুদ্রে চলাচল করে… তার মধ্যে বিবেকসম্পন্ন লোকেদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৪)

আল্লাহ এই বাণীর মাধ্যমে এমন অসংখ্য পেশার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।

জাহাজ যখন মানুষের উপকারের জন্য সমুদ্রপথে চলে, তখন তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বিশাল সব বন্দর—আর সেখানে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কাজের সুযোগ ও পেশা। গড়ে ওঠে বিশ্ব বাণিজ্য ও নৌ-চলাচলের পথ, সেখানেও তৈরি হয় অগণিত পেশা। মালামাল খালাসের জন্য সৃষ্টি হয় ভিন্ন ভিন্ন কর্মসংস্থান।

যে ফসল, কৃষিপণ্য, শিল্পজাত দ্রব্য বা পণ্যসামগ্রী নিয়ে এই জাহাজগুলো চলাচল করে, সেগুলো উৎপাদন করতে গিয়েও তৈরি হয় অনেক পেশা। এমনকি এসব পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের খাদ্য ও পানীয়র চাহিদা মেটাতে গিয়ে জন্ম নেয় আরও হরেক রকমের কাজ।

দারিদ্র্য আমাদের চিরশত্রু, আর এর একমাত্র চিকিৎসা হলো সভ্যতা বিনির্মাণ ও পেশাগত কর্মসংস্থান। ধর্মীয় বাণী মানুষকে অভাবমুক্ত ও সচ্ছল হওয়ার আহ্বান জানায়।

এটা আসলে জীবন-জীবিকার বড় একটা জোয়ার এবং হাজারো পরিবারের অন্নের সংস্থান! আপন কর্ম, শ্রম ও পেশা দিয়ে মানুষের সেবা করার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম।

আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর ফেনাগুলো তো নিঃশেষে বিলীন হয়ে যায়, আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিনে স্থায়ী হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ১৭)

আল্লাহর রাসুলও এর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ (তাবারানি, আওসাত, হাদিস: ৫৭৮৭)

তিনি আরও বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর।’ (তাবারানি, আওসাত, হাদিস: ৬০২৬)

নবীজি (সা.) দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কুফরি ও দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চাই।’ তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই দুটি কি সমান (বিপজ্জনক)?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’ (নাসায়ি, হাদিস: ৫৪৭৩; মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ২৪৮১)।

দারিদ্র্য আমাদের চিরশত্রু, আর এর একমাত্র চিকিৎসা হলো সভ্যতা বিনির্মাণ ও পেশাগত কর্মসংস্থান। ধর্মীয় বাণী মানুষকে অভাবমুক্ত ও সচ্ছল হওয়ার আহ্বান জানায়।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদের নিঃস্ব ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস: ৩৯৩৬; মুসলিম, হাদিস: ১৬২৮)

আজ যখন বিশ্ব দ্রুতগামী ও ঝুঁকিপূর্ণ ডিজিটাল বিপ্লবের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কাজের ধরনকে নতুন করে সাজাচ্ছে এবং উৎপাদন ও দক্ষতার ধারণাকে বদলে দিচ্ছে।

এই সন্ধিক্ষণে অতীতের গভীর পাঠ, বর্তমানকে দূরদর্শিতার সঙ্গে বোঝা এবং ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কন করা একান্ত প্রয়োজন।

বর্তমানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের সামনে যে নতুন বাস্তবতা হাজির করেছে, সেখানে কেবল কায়িক শ্রম বা প্রথাগত ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং অ্যালগরিদমের এই যুগে পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে।

তোমার উত্তরাধিকারীদের সচ্ছল অবস্থায় রেখে যাওয়া তাদের নিঃস্ব ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।
বুখারি, হাদিস: ৩৯৩৬

নবীজি (সা.) যেভাবে সাহাবিদের সমকালীন প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার উৎসাহ জুগিয়েছেন, আজ আমাদেরও তেমনিভাবে সময়ের শ্রেষ্ঠ কারিগরি বিদ্যায় পারদর্শী হতে হবে। তবে এই যান্ত্রিক উৎকর্ষ যেন আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস না করে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন অনেক মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে, তখন আমাদের এমন এক কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রযুক্তি হবে মানুষের সহায়ক, প্রতিপক্ষ নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, যন্ত্রের কোনো রুহ বা আত্মা নেই; তাই প্রযুক্তির প্রতিটি ধাপে আমানতদারি ও ইহসানের প্রয়োগই হবে একজন পেশাদার মুসলিমের প্রধান স্বাতন্ত্র্য।

আর এই পথরেখা হতে হবে এমন এক দর্শননির্ভর যা শরিয়তের মহান মূল্যবোধ থেকে প্রেরণা নেবে এবং আধুনিক যুগের হাতিয়ার থেকে শক্তি সঞ্চয় করবে; যাতে আমরা মানুষ ও যন্ত্র, নৈতিকতা ও প্রযুক্তি এবং আত্মা ও বস্তুর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় গড়ে তুলতে পারি।

abdullahalbaqi00@gmail.com 

আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার