ধর্ম–দর্শন

রমজানে আল্লাহ–তাআলার ‘দানশীলতা’

হাদিসে দানশীলতা ও বদান্যতা বোঝাতে যে আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা হলো ‘আল-জূদ’।

এ শব্দের ভেতরে কেবল দান করার অর্থই নিহিত নয়; বরং রয়েছে উদার হৃদয়, প্রশস্ত মানসিকতা, স্বতঃস্ফূর্ত দানপ্রবণতা এবং বিনিময়ের প্রত্যাশাহীন অনুগ্রহের গভীর তাৎপর্য।

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি তার বিশ্লেষণে বলেন, ‘জূদ’ অর্থ হলো ব্যাপক ও প্রাচুর্যময় দান—এমন দান, যা সংকীর্ণতা বা হিসাব-নিকাশের মানসিকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়।

অর্থাৎ দানশীলতা এখানে কেবল একটি কাজ নয়; বরং এটি এক মহান চরিত্রগুণ, যা উদারতা ও মহত্ত্বের পরিচায়ক। 

আল্লাহ–তাআলা নিজেকে ‘জাওয়াদ’—অর্থাৎ মহাদাতা এবং ‘কারীম’—অর্থাৎ পরম উদার বলে পরিচয় দিয়েছেন।

এই ‘জূদ’ শব্দের সর্বোচ্চ ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটে স্বয়ং আল্লাহ–তাআলার সত্তায়। আল্লাহ–তাআলা নিজেকে ‘জাওয়াদ’—অর্থাৎ মহাদাতা এবং ‘কারীম’—অর্থাৎ পরম উদার বলে পরিচয় দিয়েছেন।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ জাওয়াদ; তিনি দানশীলতা ভালোবাসেন। তিনি কারীম; উদারতা ভালোবাসেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯)

এই ঘোষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, দানশীলতা কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রিয় একটি বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি দানশীল হয়, সে আল্লাহর এক প্রিয় গুণকে নিজের জীবনে ধারণ করে নেয়।

আল্লাহর দানশীলতার ব্যাপ্তি ও অসীমতা বোঝাতে হাদিসে কুদসিতে এক চমৎকার উপমা এসেছে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, হে আমার বান্দারা! তোমরা আদি-অন্ত, জীবিত-মৃত, আদ্র-শুষ্ক—সমস্ত সৃষ্টিজগত যদি একত্র হয়ে প্রত্যেকে আমার কাছে তার প্রয়োজন পেশ করে এবং আমি প্রত্যেকের আবেদন পূরণ করি, তবুও আমার ভাণ্ডার এতটুকু কমবে না, যতটুকু একটি সুঁই সমুদ্রে ডুবিয়ে তুলে আনলে সমুদ্রের পানি কমে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৫)

আমার বান্দারা যদি আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তবে বলুন, আমি তো নিকটেই আছি; যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬

এই দানশীলতার উৎস যে আল্লাহ নিজেই, তা আরেকটি বাণীতে সুস্পষ্ট হয়েছে। প্রসিদ্ধ বুজুর্গ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এর উক্তি অনুযায়ী, আল্লাহ–তাআলা প্রতিরাতে ঘোষণা করেন, আমি মহাদাতা; আমার থেকেই দানশীলতার সূত্রপাত। আমি উদার; আমার থেকেই উদারতার সূচনা।

আল্লাহর দানশীলতার বিশেষ প্রকাশ ঘটে কিছু নির্দিষ্ট সময় ও মুহূর্তে। এর মধ্যে সর্বাধিক তাৎপর্যপূর্ণ সময় হলো রমজান মাস। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আমার বান্দারা যদি আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তবে বলুন, আমি তো নিকটেই আছি; যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)

এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর নৈকট্য ও সাড়া দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। রমজান এমন এক মাস, যখন বান্দা তার প্রভুর দিকে অধিকতর মনোযোগী হয়, আর প্রভুও তাঁর রহমত ও দানশীলতার দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।

হাদিসে এসেছে, রমজান মাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক আহ্বান করেন, হে কল্যাণকামী, এগিয়ে এসো, হে অকল্যাণে লিপ্ত ব্যক্তি, বিরত হও।  (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস: ৭৩৮৬)

অর্থাৎ এই মাসে কল্যাণের সুযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সওয়াব বৃদ্ধি পায়, ক্ষমার দরজা খুলে যায় এবং জাহান্নাম থেকে বহু বান্দাকে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রতিরাতে অসংখ্য মানুষ মুক্তি লাভ করে—এটি আল্লাহর দানশীলতারই এক মহিমান্বিত প্রকাশ।

রমজান মাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ঘোষক আহ্বান করেন, হে কল্যাণকামী, এগিয়ে এসো, হে অকল্যাণে লিপ্ত ব্যক্তি, বিরত হও।

রমজানে আল্লাহর দানশীলতার আরেকটি দিক হলো দ্রুত দোয়া কবুল হওয়া। রোজা এমন এক ইবাদত, যা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য। বান্দা ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করে, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখে। এর প্রতিদানও আল্লাহ নিজেই প্রদান করেন।

হাদিসে বলা হয়েছে, রোজাদারের দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না।

এভাবে দানশীলতা কেবল বস্তুগত দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমা, রহমত, হেদায়েত, তাওফিক—সবই আল্লাহর দানের অন্তর্ভুক্ত। মানুষ যখন পাপ থেকে ফিরে আসে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, তখন আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করেন—এটিও এক মহাদান। মানুষ যখন বিপদে পড়ে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন—এটিও তাঁর উদারতার বহিঃপ্রকাশ।