
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কারাগার এক প্রাচীন ব্যবস্থা। ইসলামি শাসনের শুরু থেকে এই ব্যবস্থার বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক যুগের কারাগার ব্যবস্থাপনা, সংস্কার, নিপীড়ন, মুক্তি ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে ৪ পর্বের রচনার আজ প্রথম পর্ব।
নবুয়ত যুগ থেকে শুরু করে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমল পর্যন্ত কারাগার কীভাবে একটি পেশাদার প্রশাসনিক রূপ লাভ করেছিল, আজ আমরা সেই ইতিহাসই ফিরে দেখব।
ইসলামি আইনশাস্ত্রে কারাগারের মূল দর্শন কেবল সংকীর্ণ কোনো কক্ষে কাউকে বন্দি করা নয়, বরং ব্যক্তির চলাচলের স্বাধীনতাকে সীমিত করা। ইমাম ইবনে তাইমিয়ার মতে, শরয়ি পরিভাষায় বন্দিত্ব হলো ব্যক্তির নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা থেকে বিরত রাখা, তা কোনো ঘর বা মসজিদেও হতে পারে (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৫/৩৯৮, দারুল ওফা, বৈরুত, ২০০৫)।
নবীজির যুগে কোনো স্থায়ী বা নির্দিষ্ট কারাগার ভবন ছিল না। যুদ্ধবন্দী বা অপরাধীদের সাধারণত মসজিদের খুঁটিতে অথবা সাহাবিদের ঘরে রেখে নজরদারি করা হতো। যেমন—সুদাইর ইবনে সুমামাকে যখন বন্দি করা হয়, তখন তাকে মসজিদে নববির খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৪২)
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মক্কায় সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে চার হাজার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দিয়ে একটি বাড়ি ক্রয় করে সেটিকে সর্বপ্রথম স্থায়ী কারাগারে রূপান্তর করেন।
ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর আমলে অপরাধীদের জন্য স্থায়ী বন্দিশালার প্রয়োজন অনুভূত হয়। তিনি মক্কায় সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কাছ থেকে চার হাজার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) দিয়ে একটি বাড়ি ক্রয় করে সেটিকে সর্বপ্রথম স্থায়ী কারাগারে রূপান্তর করেন।
এর মাধ্যমে তিনি ইসলামি ইতিহাসে কারাগার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য হন। (মুহাম্মদ ইবনুল ফারাজ তলায়ি, আকদিয়াতু রাসুলিল্লাহ, পৃষ্ঠা, ১৫৪, দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১৯৮৭)
পরবর্তীকালে আলি (রা.)-এর শাসনামলে কুফায় ‘নাফে’ নামক একটি বাঁশের তৈরি জেলখানা নির্মিত হয়। তবে সেটি মজবুত না হওয়ায় বন্দিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত। এরপর তিনি ‘আল-মুখায়্যাস’ নামে আরও একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী কারাগার নির্মাণ করেন। (ইবনুল আসির, আন-নিহায়া ফি গারিবিল হাদিস, ২/৮২, বৈরুত, ১৯৭৯)
উমাইয়া যুগে কারাগার ব্যবস্থার বিস্তার ঘটলেও কিছু ক্ষেত্রে তা চরম অমানবিক রূপ ধারণ করেছিল। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের নাম এই ক্ষেত্রে খ্যাত। তার নির্মিত ‘দিমাস’ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি ছিল মূলত ছাদহীন এক অন্ধকূপ, যেখানে বন্দিরা রোদ-বৃষ্টিতে পশুর মতো জীবন যাপন করত।
শরয়ি পরিভাষায় বন্দিত্ব হলো ব্যক্তির নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা থেকে বিরত রাখা, তা কোনো ঘর বা মসজিদেও হতে পারে।ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ.)
ইবনে জাওজির বর্ণনা অনুযায়ী, সেখানে বন্দিদের খাবারের সঙ্গে বালু ও ছাই মিশিয়ে দেওয়া হতো, ফলে কিছুদিন পর বন্দিদের চেহারা চেনা দায় হয়ে পড়ত। (ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম, ৬/৩২২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৯২)
নিষ্ঠুরতার এই যুগে দিশারী হয়ে আসেন খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র.)। তিনি কারাগারকে নিছক শাস্তির জায়গা থেকে সরিয়ে একটি মানবিক ও সংশোধনাগারে রূপান্তর করেন। তিনি প্রতিটি বন্দীর জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেন এবং একটি ‘দিওয়ান’ বা তালিকা প্রণয়ন করেন। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৫/৩৫০, বৈরুত, ১৯৯০)
তাঁর যুগান্তকারী সংস্কারগুলো ছিল:
অসুস্থ ও নিঃস্ব বন্দীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা।
দাগী অপরাধী ও সাধারণ ঋণগ্রস্তদের আলাদা রাখা।
নারীদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রহরীর অধীনে আলাদা জেলখানা নির্মাণ।
কারারক্ষী হিসেবে সৎ ও নির্লোভ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া (আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা ১৫১, বৈরুত, ১৯৭৯)
বাগদাদের ‘আল-মুতবিক’ ছিল একটি কেন্দ্রীয় এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত কারাগার। এটি মাটির নিচে নির্মিত ছিল বলে অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকত।
আব্বাসীয় শাসনামলে কারাগার ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও আধুনিক হয়। বাগদাদের ‘আল-মুতবিক’ ছিল একটি কেন্দ্রীয় এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত কারাগার। এটি মাটির নিচে নির্মিত ছিল বলে অত্যন্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকত।
খলিফা মুতাদিদ বিল্লাহ (৮৯২-৯০২ খ্রি.) তাঁর রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ‘আল-মাতামির’ নামক একটি সুরক্ষিত বন্দিশালা নির্মাণ করেন, যা ছিল সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ এবং একই সঙ্গে নিখুঁত স্থাপত্যশৈলীর জন্য পরিচিত। (খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ১/১০২, বৈরুত, ১৯৯৭)
এই যুগেই অপরাধীদের ধরন অনুযায়ী জেলের আধুনিকায়ন শুরু হয়। তবে ক্ষমতার লড়াইয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও এই কারাগারগুলোতে পচে মরতে হয়েছে।
তৎকালীন যুগের উজির ইয়াকুব ইবনে দাউদ এই ভূগর্ভস্থ জেলের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে সেখানে দীর্ঘকাল থাকার ফলে তিনি তার চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছিলেন। (তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৮/১৬২, বৈরুত, ১৯৬৭)
ইসলামি ইতিহাসের প্রাথমিক কয়েক শতাব্দীতে কারাগার ব্যবস্থা নমনীয়তা থেকে কঠোরতা এবং পরবর্তীকালে সংস্কারের মধ্য দিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রূপ লাভ করে। এই কারাগারগুলোই পরবর্তীকালে অনেক বরেণ্য ইমাম ও মনীষীদের জীবন সংগ্রামের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়
আগামী পর্বে আমরা দেখব এই জেলখানার অন্ধকার দিক, বন্দিদের অধিকার ও ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি।