আমরা ‘সুরা ফাতেহা’র আয়াত দিয়ে প্রার্থনা করি, ‘আল্লাহ আমাদের সরল পথ দেখান’। সেই সরল পথ কোনটি—আল্লাহ তা সুরা আনআমের ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর আয়াতে বিশদ বলেছেন। যেখানে আল্লাহ–তাআলা মানবজীবনের মৌলিক অনুশাসনগুলো একত্র করে বলে দিয়েছেন এবং তা ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এই তিনটি আয়াতের সমাপ্তিতে আল্লাহ–তাআলা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, ‘এসব বিষয়ে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা প্রজ্ঞা ও উপদেশ গ্রহণ করো।’ আয়াতের শেষ অংশে নবীজিকে আল্লাহ জানাতে বলেছেন যে ‘এটাই আমার সরল পথ’।
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এই আয়াতগুলোর গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে এক অবিস্মরণীয় উপমা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুহাম্মদের এমন অসিয়তনামা দেখতে চায় যার ওপর স্বয়ং তাঁর নিজস্ব সিলমোহর অঙ্কিত রয়েছে, সে যেন সুরা আনআমের এই আয়াতগুলো পাঠ করে।’ এরপর তিনি ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পাঠ করেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩০৭০)
আমরা ‘সুরা ফাতেহা’র আয়াত দিয়ে প্রার্থনা করি, ‘আল্লাহ আমাদের সরল পথ দেখান’। সেই সরল পথ কোনটি—আল্লাহ তা সুরা আনআমের ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর আয়াতে বিশদ বলেছেন।
আরব সংস্কৃতিতে কোনো শাসকের মোহরাঙ্কিত দলিলের অর্থ ছিল—এর প্রতিটি শব্দ অকাট্য, অপরিবর্তনীয় ও চূড়ান্ত। মহানবী (সা.) পার্থিব কোনো ধন-সম্পদ রেখে যাননি; উম্মতের জন্য তিনি রেখে গেছেন হেদায়েতের অমূল্য দলিল।
আয়াত ১৫১: বলুন: ‘এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের ওপর যা হারাম করেছেন, তা পাঠ করে শোনাই—তোমরা তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না;পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে; দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, আমিই তোমাদের এবং তাদের রিজিক দিই; প্রকাশ্য হোক কিংবা গোপন, অশ্লীলতার ধারেকাছেও যাবে না; আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করবে না। তিনি তোমাদের এসব বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা উপলব্ধি করতে পারো।’
আয়াত ১৫২: ‘আর এতিম বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তার সম্পদের ধারেকাছেও যাবে না—উত্তম কল্যাণকামী উদ্দেশ্য ছাড়া; এবং ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে মাপ ও ওজন পূর্ণ করবে। আমি কাউকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিই না। আর যখন কথা বলবে, তখন ইনসাফ রক্ষা করে কথা বলবে—যদিও সে তোমাদের নিকটাত্মীয় হয় এবং আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। তিনি তোমাদের এসব বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’
আয়াত ১৫৩: ‘আর নিশ্চয়ই এটিই আমার সরল পথ; সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য পথের অনুসরণ কোরো না—করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। তিনি তোমাদের এসব বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’
সুরা আনআমের এই তিন আয়াতে ইসলামি শরিয়তের যে ১০টি মৌলিক মূলনীতি সন্নিবেশিত হয়েছে, তা বিশদভাবে আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক না করা: পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে মারাত্মক ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক বা অংশীদার সাব্যস্ত করা। হাদিসে একে ‘আকবারুল কাবায়ের’ বা সর্বশ্রেষ্ঠ কবিরা পাপ বলা হয়েছে।
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না; এ ছাড়া অন্য যেকোনো পাপ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক (সে ধ্বংস হোক), যে তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেয়েও তাদের সেবার মাধ্যমে জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না।সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫১
২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা: পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে তাওহিদের নির্দেশের পরই পিতা-মাতার অধিকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক (সে ধ্বংস হোক), যে তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেয়েও তাদের সেবার মাধ্যমে জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫১)
৩. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা: পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বের পর এখানে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নির্দেশ করা হয়েছে।
জাহেলি যুগে আরবরা অনাহার ও দারিদ্র্যের ভয়ে নিষ্পাপ সন্তানদের জীবন্ত সমাহিত করত। আধুনিক যুগে অর্থনৈতিক সংকটের আতঙ্কে সন্তানকে অস্বীকার করাও এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
৪. সব ধরনের অশ্লীলতা বর্জন করা: অশ্লীলতা মানুষের অন্তরের পবিত্রতা ও সমাজের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দেয়। কোরআনে ব্যভিচার তো বটেই, ব্যভিচারের দিকে ধাবিত করে এমন সব মাধ্যম থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চোখ, কান কিংবা প্রযুক্তির মাধ্যমে গোপনে কৃত পাপও এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর চেয়ে অধিক আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন আর কেউ নেই; সে কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীলতাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৬৩৪)
৫. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা: ইসলামে মানবজীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শরিয়তসম্মত আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল।
মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, কেবল তিনটি অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়—বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার, অন্যায্য হত্যার কিসাস এবং ধর্ম ত্যাগ করে সমাজে বিদ্রোহ সৃষ্টি করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৭৮)
৬. এতিমের সম্পদে হাত না দেওয়া: অসহায় এতিমের সম্পদ সংরক্ষণ করা সমাজের আমানত। পিতা হারানো সন্তানের সম্পদ তাদের প্রাপ্তবয়স্ক ও সুবোধ হওয়ার আগপর্যন্ত পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
অন্য আয়াতে নিজের স্বার্থে এতিমের ধনসম্পদ আত্মসাৎ করাকে পেটে দোজখের আগুন ভরার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ১০)
৭. ব্যবসায় পরিমাপে ইনসাফ রাখা: লেনদেনে সততা রক্ষা করা ইমানের দাবি। পণ্য আদান-প্রদানের সময় ওজনে কম দেওয়া বা হেরফের করাকে কোরআনে ধ্বংসের কারণ বলা হয়েছে। (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১-৩)
অতীতে নবী শোয়াইবের কওম এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির কারণেই আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়েছিল।
৮. আপনজনের বিরুদ্ধে গেলেও ন্যায়ের পক্ষে বলা: সাক্ষ্য প্রদান, বিচার-ফয়সালা কিংবা ব্যক্তিগত আলাপে সর্বাবস্থায় সত্য বলা ফরজ। কারও আত্মীয়তা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা শত্রুতার প্রভাব যেন ইনসাফের পথে অন্তরায় না হয়। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ও সত্য গোপন করাকে হাদিস শরিফে অন্যতম মহাপাপ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৭)
তিনি মাটিতে একটি সোজা দাগ টানলেন এবং তার ডানে-বাঁয়ে আরও কিছু শাখা দাগ টানলেন। এরপর বললেন, ‘এই সোজা পথটি আল্লাহর পথ, আর পাশের শাখা পথগুলোতে শয়তান বসে থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডাকছে।’
৯. আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করা: আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকারের মূল অর্থ হলো—তাঁর প্রতিটি আদেশ-নিষেধ পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে পালন করা এবং তাঁর শরিয়তের সীমানা মেনে চলা। বান্দা যখন রবের প্রতি ঈমান আনে, তখন সে কার্যত আল্লাহর বিধান মেনে চলার চুক্তি করে।
আমানত রক্ষা করা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করা মুমিনের চারিত্রিক ভূষণ।
১০. একমাত্র সরল পথের অনুসরণ করা: এই নয়টি মূলনীতি বর্ণনার পর আল্লাহ–তাআলা দশম ও চূড়ান্ত নির্দেশটি দিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী সব বিধানের কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড: ‘আর এটাই আমার সরল-সঠিক পথ; সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং অন্যান্য ভ্রান্ত পথের অনুসরণ কোরো না। করলে তা আল্লাহর পথ থেকে তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৫৩)
মহানবী (সা.) এই সরল পথের চমৎকার একটি উপমা দিয়েছেন। তিনি মাটিতে একটি সোজা দাগ টানলেন এবং তার ডানে-বাঁয়ে আরও কিছু শাখা দাগ টানলেন। এরপর বললেন, ‘এই সোজা পথটি আল্লাহর পথ, আর পাশের শাখা পথগুলোতে শয়তান বসে থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডাকছে।’
এরপর তিনি সুরা আনআমের এই ১৫৩ নম্বর আয়াতটি পাঠ করলেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৪১৪২)
অন্য হাদিসে মহানবী (সা.) সরল পথকে এমন এক রাজপথের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার দুই পাশে সুরম্য প্রাচীর ও পর্দাঘেরা অসংখ্য উন্মুক্ত ফটক রয়েছে। আর এক আহ্বানকারী ওপর থেকে ডাক দিয়ে বলছে, ‘হে লোকসকল, তোমরা সবাই সোজা পথে চলো, ডানে-বাঁয়ে দৃষ্টি দিয়ে পর্দা সরাবে না; পর্দা সরালেই নিষিদ্ধ সীমালঙ্ঘনে জড়িয়ে পড়বে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৮৫৯)
মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর