
ইউরোপের দেশ জার্মানিতে গ্রীষ্মের রমজান মানে এক দীর্ঘ ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রায় ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা না খেয়ে থাকার পর যখন ইফতারের সময় হয়, তখন ক্লান্তি ছাপিয়ে আনন্দ আর ঐক্যের এক অদ্ভুত আবহ তৈরি হয়।
জার্মানির শহরগুলোতে এখন আর ইফতার কেবল ঘরের চার দেয়ালে বা মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথে, এমনকি চার্চের আঙিনাতেও।
জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর পফোর্টসহাইম। এখানকার ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদ কর্তৃপক্ষ যখন ইয়োর্গ রাতগিব সড়কে ইফতারের আয়োজন করে, তখন তা এক উৎসবের রূপ নেয়।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি টেবিল, ওপরে সাদা চাদর—সেখানে বসে ইফতারের অপেক্ষায় থাকেন সিরিয়া, তুরস্ক, আরবসহ বিভিন্ন দেশের শত শত মুসলিম।
এই আয়োজনের বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়। জার্মান প্রতিবেশীরাও সেখানে আমন্ত্রিত হন। এটি তাদের মনে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে। ইফতারের আগে সেখানে পরিবেশিত হয় ‘মলোভিয়া’ বা সুফি নৃত্য।
জার্মানির রাজধানী বার্লিনের ‘ওয়েডিং’ জেলাটি এক বৈচিত্র্যময় জনপদ। এখানকার ‘নাজারেথ চার্চ’-এর আঙিনায় গত কয়েক বছর ধরে আয়োজিত হচ্ছে ইফতার অনুষ্ঠান। চার্চের প্রাঙ্গণে মুসলিমরা দস্তরখান বিছিয়ে অমুসিলমদের সঙ্গে ইফতার করেন।
ইফতারের পূর্বে এখানেই আজান হয়। চার্চের ঘণ্টাও বাজতে শোনা যায়। ইফতারে ইহুদি রাবাই, খ্রিষ্টান যাজক এবং মুসলিম ইমামরা একসঙ্গে বসে ধর্মের মূল দর্শন—ত্যাগ ও সহমর্মিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
রাইন নদীর তীরের এই জার্মানি আজ কেবল শিল্প-কারখানার দেশ নয়, এটি এখন বৈচিত্র্যময় বিশ্বাসের অপূর্ব মিলনস্থল।
জার্মানিতে ইফতার টেবিলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের খাবার থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক খাবারের মেলা:
খেজুর ও পানি: চিরাচরিতভাবে খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু হয়।
টার্কিশ স্যুপ ও ল্যান্টিন: তুরস্কের প্রভাব থাকায় ডাল ও সবজির স্যুপ খুব জনপ্রিয়।
সিরিয়ান কাবাব ও হামুস: আরব দেশগুলোর সুস্বাদু কাবাব আর হামুস টেবিলের শোভা বাড়ায়।
জার্মান রুটি ও চিজ: অনেক সময় স্থানীয় জার্মান খাবারও ইফতারের মেনুতে যুক্ত হয়।
জার্মানিতে রমজান পালন করা সবসময় সহজ নয়। বিশেষ করে ডানপন্থীদের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার মুখে মুসলিমদের নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখতে বেগ পেতে হয়।
কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী মনে করে, রমজান জার্মানির সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খায় না। কিন্তু মুসলিম সমাজ তাদের পরোপকার ও উদারতার মাধ্যমে এই ভুল ধারণাগুলো ভাঙার চেষ্টা করছে।
অনেকে আবার ১৯ ঘণ্টার দীর্ঘ রোজা রেখেও কর্মক্ষেত্রে পূর্ণ উদ্যমে কাজ করেন।