কোরআন

সৃষ্টিজগতের যে ৮ নিদর্শন সংশয়বাদীকেও ভাবতে বাধ্য করে

বারান্দায় বসে আছেন। মাথার ওপর রাতের আকাশ। অসংখ্য তারা জ্বলছে ও নিভছে। মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগে, এই বিশাল মহাবিশ্ব, এত নিখুঁত নিয়ম, এত সূক্ষ্ম ভারসাম্য, এসব কি এমনি এমনি তৈরি হয়ে গেল?

এই প্রশ্নটা নতুন নয়। যুগে যুগে অসংখ্য মানুষ, এমনকি যাঁরা কখনো স্রষ্টায় বিশ্বাস করেননি, তাঁরাও প্রকৃতির এই বিস্ময়কর শৃঙ্খলা দেখে থমকে গেছেন। কোরআনও মানুষকে বারবার আহ্বান জানিয়েছে, পৃথিবীটা ঘুরে দেখো, সৃষ্টিজগতের দিকে তাকাও, তারপর গভীরভাবে চিন্তা করো এসবের পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত-দিনের পরিবর্তনে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)

সৃষ্টিজগতের কিছু বিস্ময়কর নিদর্শন

১. মানুষের দেহ একটি বিস্ময়: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে নিদর্শন। তোমরা কি দেখছ না?’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ২১)

এই আয়াতের অর্থ হলো স্রষ্টার সবচেয়ে বড় প্রমাণ খুঁজতে দূরে যাওয়ার দরকার নেই, নিজের শরীরই যথেষ্ট। হৃৎপিণ্ড প্রতিদিন প্রায় এক লাখ বার স্পন্দিত হয়, কোনো বিরতি ছাড়াই সারা জীবন কাজ করে। মস্তিষ্কে প্রায় আশি বিলিয়ন স্নায়ুকোষ আছে, এরা প্রতি মুহূর্তে ট্রিলিয়ন সংযোগের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়া করছে।

একটি কোষের ভেতরে ডিএনএতে যে পরিমাণ তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তা একটি বিশাল লাইব্রেরির সমান। এই পুরো ব্যবস্থাপনা প্রতিটি মুহূর্তে নিখুঁতভাবে চলছে। এর একটি অংশও মানুষের সচেতন নিয়ন্ত্রণে নেই। এত জটিল একটা তন্ত্র নিজে নিজে দুর্ঘটনাক্রমে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সচেতন মানুষ মাত্রই প্রশ্ন তোলেন।

আর আমি পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ইমান আনবে না?
সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০

২. পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তুর সূচনা: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর আমি পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ইমান আনবে না?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)

পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাতীত, এটা আধুনিক জীববিজ্ঞানের একেবারে মৌলিক সত্য। পানির অণুর একটা বিশেষ গঠন আছে, একদিকে ধনাত্মক, অন্যদিকে ঋণাত্মক চার্জ, যার কারণে এটি অসংখ্য জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত দ্রাবক হিসেবে কাজ করে।

মানবদেহের প্রায় ৬০ শতাংশ পানি দিয়ে গঠিত আর কোষের ভেতরের প্রতিটি বিপাকীয় প্রক্রিয়া পানির উপস্থিতি ছাড়া অচল। বিজ্ঞানীরা যখন অন্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা খোঁজেন, তাঁরা প্রথমে যে জিনিসটা খোঁজেন, তা হলো তরল পানির অস্তিত্ব।

দেড় হাজার বছর আগে, যখন কোষ বা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের কোনো ধারণাই ছিল না, তখন এই সত্য কোরআনে এমনভাবে বলা হয়েছে, যা আজকের জীববিজ্ঞানের একেবারে কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে মিলে যায়।

৩. সূর্য ও চাঁদের নির্দিষ্ট কক্ষপথ: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ আল্লাহর নির্ধারণ। আর চাঁদের জন্য আমি নির্দিষ্ট মনজিল ঠিক করেছি।’ (সুরা ইয়াসিন, আয়াত: ৩৮-৩৯)

সূর্য স্থির নয়, সেটিও নিজস্ব কক্ষপথে ছুটে চলছে, এই ধারণা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে অনেক পরে। সৌরজগৎ পুরোটাই মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রকে ঘিরে একটা নির্দিষ্ট গতিপথে প্রদক্ষিণ করছে, যে চক্র সম্পূর্ণ হতে প্রায় ২২ থেকে ২৩ কোটি বছর লাগে।

চাঁদের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে যে ২৮টি ধাপে এর আকৃতি বদলায়, তা এতটাই সুনির্দিষ্ট যে এর ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্যালেন্ডারগুলো তৈরি হয়েছে। এই নিখুঁত গাণিতিক শৃঙ্খলার কথা কোরআন এমন এক সময়ে বলেছে, যখন মহাকাশ পর্যবেক্ষণের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি মানুষের হাতে ছিল না।

৪. সমুদ্রের দুই স্রোতের মাঝে অদৃশ্য বাধা: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তিনি দুটি সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়। তাদের মাঝে আছে এক অন্তরায়, যা তারা অতিক্রম করে না।’ (সুরা রহমান, আয়াত: ১৯-২০)

সমুদ্রবিজ্ঞানে এ ঘটনাকে বলা হয় হ্যালোক্লাইন, যেখানে ভিন্ন লবণাক্ততা, তাপমাত্রা ও ঘনত্বের দুটি জলরাশি পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েও একধরনের অদৃশ্য সীমারেখা বজায় রাখে।

জিব্রাল্টার প্রণালির মতো জায়গায় ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি মিলিত হয়েও ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে সহজে সম্পূর্ণ মিশে যায় না, দীর্ঘ দূরত্বজুড়ে আলাদা স্তরে প্রবাহিত হতে থাকে।

এই রহস্যের কথা বিজ্ঞান অনেক পরে দিলেও কোরআন এই তথ্য জানিয়ে দিয়েছে হাজার বছর আগেই।

সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস লবণকণা তুলে নিয়ে মেঘে পরিণত করার প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখে, যা পরে বৃষ্টি হয়ে নামে। এই পুরো প্রক্রিয়া খালি চোখে দেখা যায় না, অথচ কোরআনে বায়ু, পরাগায়ন ও বৃষ্টির মধ্যকার এই সংযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. মানুষের সৃষ্টির পর্যায়ক্রমিক বিবরণ: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। এরপর তাকে শুক্রবিন্দু হিসেবে এক সুরক্ষিত স্থানে রেখেছি। তারপর শুক্রবিন্দুকে রূপান্তরিত করেছি রক্তপিণ্ডে, রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে, মাংসপিণ্ড থেকে তৈরি করেছি হাড়, তারপর হাড়কে মাংস দিয়ে ঢেকে দিয়েছি।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১২-১৪)

আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান মানব ভ্রূণের বিকাশকে বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করে। শুরুতে নিষিক্ত ডিম্বাণু, তারপর তা জরায়ুর দেয়ালে আটকে থাকা জোঁকের মতো এক গুচ্ছ কোষে পরিণত হয়, এরপর তা চিবানো মাংসের মতো দেখতে এক পিণ্ডে রূপ নেয়, তারপর সেই পিণ্ডের ভেতরে হাড়ের কাঠামো তৈরি হতে শুরু করে, আর সবশেষে সেই হাড়কে ঘিরে মাংসপেশি গড়ে ওঠে।

এই ক্রমটা আধুনিক আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ছাড়া খালি চোখে দেখা সম্ভব ছিল না। তাহলে দেড় হাজার বছর আগে এই স্তরভিত্তিক বিবরণ কীভাবে দেওয়া সম্ভব হলো, এই প্রশ্ন চিন্তাশীল মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে।

৬. বায়ুর মাধ্যমে পরাগায়ন: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর আমি বায়ু পাঠাই পরাগায়নকারী হিসেবে। তারপর আকাশ থেকে পানি নাজিল করি এবং তোমাদের তা পান করাই।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ২২)

বহু উদ্ভিদ, যেমন ঘাসজাতীয় ফসল ও কনিফার গাছ, বংশবিস্তারের জন্য সম্পূর্ণভাবে বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। বাতাস পরাগরেণু এক ফুল থেকে আরেক ফুলে বহন করে নিয়ে যায়, যাকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে বলা হয় অ্যানিমোফিলি।

এমনকি সমুদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস লবণকণা তুলে নিয়ে মেঘে পরিণত করার প্রক্রিয়াতেও ভূমিকা রাখে, যা পরে বৃষ্টি হয়ে নামে। এই পুরো প্রক্রিয়া খালি চোখে দেখা যায় না, অথচ কোরআনে বায়ু, পরাগায়ন ও বৃষ্টির মধ্যকার এই সংযোগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৭. মৌমাছির প্রতি প্রত্যাদেশ: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আর তোমার রব মৌমাছিকে ওহি করলেন, পাহাড়ে, গাছে ও মানুষের তৈরি কাঠামোয় তুমি ঘর তৈরি করো। তাদের পেট থেকে বের হয় বিভিন্ন রঙের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৬৮-৬৯)

মৌচাকের ষড়ভুজাকার কুঠুরিগুলো গাণিতিকভাবে সবচেয়ে কম মোম ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি মধু সংরক্ষণের সবচেয়ে কার্যকর কাঠামো, যা গণিতবিদেরা বহু শতাব্দী পরে প্রমাণ করেছেন।

মৌমাছি দলবদ্ধভাবে বিশেষ নাচের মাধ্যমে একে অপরকে খাবারের দিকনির্দেশনা দেয়, যে আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিশ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। মধুর মধ্যে প্রাকৃতিক অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান থাকে, যে কারণে ক্ষত সারাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানেও মধু ব্যবহারের প্রচলন আছে।

একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের এত জটিল আচরণ ও দরকারি উৎপাদন কোনোভাবেই কাকতালীয় হতে পারে না। বরং এর পেছনে রয়েছে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা ও আদেশ।

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো, আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তা করো না, কারণ, তোমরা তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারবে না।
আস-সিলসিলাতুস সহিহা, আলবানি, হাদিস: ১৭৮৮

৮. আঙুলের ছাপের অনন্যতা: আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে আমি তার হাড়গুলো একত্র করব না? হ্যাঁ, আমি তার আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজিয়ে দিতে সক্ষম।’ (সুরা কিয়ামা, আয়াত: ৩-৪)

প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ আলাদা, এমনকি একই ডিম্বাণু থেকে জন্ম নেওয়া যমজ ভাইবোনেরও। গর্ভাবস্থার প্রায় ২৪ সপ্তাহের মধ্যে এই ছাপ তৈরি হয়ে যায়, আর তা নির্ধারিত হয় জিন এবং গর্ভফুলের ভেতরের তরলের চাপের সূক্ষ্ম তারতম্যের মিশ্রণে।

বিংশ শতাব্দীতে এসে ফরেনসিক বিজ্ঞান এই অনন্যতা আবিষ্কার করে, তার পর থেকেই এটা হয়ে উঠেছে মানুষ শনাক্তকরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। পুনরুত্থানের প্রসঙ্গে আল্লাহ ঠিক এই সূক্ষ্মতম অংশটির কথাই উল্লেখ করেছেন, যা বিজ্ঞানের চোখে ধরা পড়েছে অনেক পরে।

হাদিসে কী আছে

মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করো, আল্লাহর সত্তা নিয়ে চিন্তা করো না, কারণ, তোমরা তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারবে না।’ (আস-সিলসিলাতুস সহিহা, আলবানি, হাদিস: ১৭৮৮)

আজ রাতে একবার আকাশের দিকে তাকান। অথবা নিজের হাতের দিকে, আঙুলের রেখাগুলোর দিকে। অথবা জানালার পাশে ফুটে থাকা কোনো ফুলের দিকে, যেখানে হয়তো একটা মৌমাছি উড়ে বেড়াচ্ছে।

এই প্রতিটি দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য নিখুঁত পরিকল্পনা। মহানবী (সা.) রাতের নির্জনতায় আসমান-জমিনের এই নিদর্শনগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। সেই আকাশ আজও আছে। সেই নিদর্শনগুলো আজও আমাদের সামনে ছড়িয়ে আছে। দরকার শুধু একবার থেমে তাকানো, আর গভীরভাবে চিন্তা করা।

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়