মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন ও সফলতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো ধর্মীয় জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য করা হয়েছে। যেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, সেখানে অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং নানা ভ্রষ্টতা বাসা বাঁধে।
ফলে মানুষ ইহকাল ও পরকাল—উভয় জগৎই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)
কোরআনে জ্ঞানার্জনের নির্দেশ
অজ্ঞতা মানবজাতির জন্য এক মহা অভিশাপ। এটি মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয় এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই লাঞ্ছিত করে। এ জন্যই পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত : ১)
সীমাহীন আফসোসের দিন
জ্ঞানের অভাব শুধু মানুষকে দুনিয়াতেই পথভ্রষ্ট করে না, নিজের খেয়ালখুশিমতো জীবন যাপন করার কারণে পরকালে মর্মান্তিক শাস্তির মুখোমুখি করে। তখন বীভৎস আজাবের দৃশ্য দেখার পর জাহান্নামিদের আফসোস আর আক্ষেপের শেষ থাকে না।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এবং তারা বলবে, আমরা যদি শুনতাম অথবা বুদ্ধি খাটাতাম, তবে আজ জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত হতাম না।’ (সুরা মুলক, আয়াত : ১০)
অজ্ঞতার ক্ষতি
জ্ঞানের অভাবে মানুষ অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে প্রধান কয়েকটি দিক নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১. ইবাদত ও আকিদাগত বিপর্যয়
সঠিক জ্ঞানের অভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইমান ও আকিদা। ধর্মীয় জ্ঞান না থাকলে মানুষ আল্লাহর একত্ববাদ সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। ফলে শিরক ও বেদাতের মতো ভয়াবহ পাপে লিপ্ত হয় এবং নিজের মনগড়া উপাসনা করে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়ে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘আমাদের এই শরিয়তে সংগত নয়, কেউ এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যান করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)
২. অন্ধ অনুকরণ
জ্ঞানের আলো না থাকলে মানুষ অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত হয়। পূর্বপুরুষ বা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যা করে, সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই তা গ্রহণ করে নেওয়ার পরিণাম মারাত্মক ভয়াবহ। কোরআনে এটাকে চরম ক্ষতিগ্রস্তদের পথ বলা হয়েছে।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যখন তাদের (কাফেরদের) বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তোমরা তার অনুসরণ করো, তখন তারা বলে, ‘না, বরং আমরা তো শুধু সে সকল বিষয়েরই অনুসরণ করব, যার ওপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।’ আচ্ছা! যখন তাদের বাপ-দাদা (দ্বীনের) কিছুমাত্র বুঝ-সমঝ রাখত না, আর তারা কোনো (ঐশী) হিদায়াতও লাভ করেনি, তখনো কি (তাদের অনুসরণ করা উচিত)? (সুরা বাকারাহ, আয়াত: ১৭০)
৩. পাপাচার ও নৈতিক অবক্ষয়
অজ্ঞতা মানুষকে পাপ ও চারিত্রিক স্খলনের দিকে ধাবিত করে। মানুষ যখন আল্লাহর শাস্তি ও পুরস্কার, হালাল ও হারামের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ হয়, তখন সে খুব সহজেই প্রবৃত্তির দাসত্ব গ্রহণ করে নেয়।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলে দাও, আমার প্রতিপালক তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজসমূহ—প্রকাশ্য হোক বা গোপন এবং সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায়ভাবে (কারও প্রতি) সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলাকে, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৩)
৪. পার্থিব জীবন ও সমাজব্যবস্থার বিপর্যয়
জ্ঞানহীন সমাজ কখনো উন্নতি করতে পারে না। জ্ঞানের অভাবে মানুষ অন্যায়, জুলুম, অবিচার ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। যখন সমাজে যোগ্য ও জ্ঞানী মানুষের অভাব ঘটে, তখন অযোগ্য ও মূর্খ লোকেরা নেতৃত্বের আসনে বসে, গোটা জাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। সমাজ থেকে জ্ঞান উঠে যাওয়া এবং অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়া কেয়ামতের অন্যতম আলামত।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কেয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে এবং অজ্ঞতার বিস্তার ঘটবে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৭৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭১)
মোটকথা, ইসলাম মানুষকে অজ্ঞতার আঁধার থেকে আলোতে আনার জন্য জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়েছে। সুতরাং অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুক্তির জন্য পর্যাপ্ত ও সঠিক জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য।
মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী