ব্যক্তিত্ব

জয়নাব বিনতে কামাল: এক চিরকুমারী হাদিস বিশারদ

আজ থেকে প্রায় আটশত বছর আগের কথা। যখন ছিল না উড়োজাহাজ, দ্রুতগামী কোনো যানবাহন কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা। তা সত্ত্বেও কেবল একজন নারীর কাছে হাদিস শিক্ষার ব্যাকুলতায় হাজারো মানুষ মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে আসতেন।

তিনি ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অনন্য পাণ্ডিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র জয়নাব বিনতে কামাল। দ্বাদশ শতাব্দীতে দামেস্কের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী নারী মুহাদ্দিসা বা হাদিস পণ্ডিত ছিলেন তিনি।

অসাধারণ ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সমকালে তাঁকে ‘মুসনিদাতুশ শাম’ বলা হতো। অর্থাৎ তিনি ছিলেন তৎকালীন বৃহত্তর শাম বা সিরিয়া অঞ্চলের ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষার প্রধানতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।

তিনি ইতিহাসে এক ‘চিরকুমারী মুহাদ্দিসা’ হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, বিবাহিত জীবনের ব্যস্ততায় যেন ওহি ও সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত না ঘটে, সে জন্য তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তিনি ইতিহাসে এক ‘চিরকুমারী মুহাদ্দিসা’ হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, বিবাহিত জীবনের ব্যস্ততায় যেন জ্ঞানার্জনে ব্যাঘাত না ঘটে, তাই তিনি আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

সংগ্রামমুখর শৈশব ও মেধার স্ফুরণ

১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কে বিখ্যাত ‘আল-মাকদিসা’ পরিবারে জয়নাব জন্মগ্রহণ করেন। জয়নাবের পরিবারকে বলা হতো হাম্বলি মাজহাবের প্রধান উৎসধারা। তাঁদের বংশ থেকেই যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন হাম্বলি মাজহাবের শতাধিক প্রাজ্ঞ আলেম, যাঁরা পরবর্তীকালে এই মাজহাবের প্রচার ও প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। (খাইরুদ্দিন আজ-জিরাকলি, আল-আলাম: কামুসুত তারা জিম, ৩/৬৫, দারুল ইলম লিল মালাইয়িন, বৈরুত, ২০০২)

জয়নাব ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী ও প্রখর ধীসম্পন্ন। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি তাঁর চাক্ষুষ দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু চোখের আলো না থাকলেও জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা তাঁর এতটাই তীব্র ছিল যে ওস্তাদদের মুখ থেকে শুনে শুনেই তিনি হাজারো হাদিস ও ইসলামি পাণ্ডুলিপি মুখস্থ করে ফেলেন।

তিনি কেবল নিজ শহরের শায়খদের জ্ঞান অর্জন করেই ক্ষান্ত হননি, বরং ইলমের সন্ধানে দীর্ঘ দেশভ্রমণও করেছিলেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, আদ-দুরারুল কামিনাহ ফি আয়ানিল মিআতিস সামিনাহ, ২/২৪৮, মজলিসু দাইরাতুল মাআরেফ আল-উসমানিয়াহ, হায়দরাবাদ, ১৯৭২)

জ্ঞানার্জনের প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসা তিনি লাভ করেছিলেন তাঁর পিতার কাছ থেকে। শৈশবেই তাঁর পিতা তাঁকে তৎকালীন প্রখ্যাত নারী শিক্ষাবিদ শাইখা হাবিবা বিনতে আবি ওমরের পাঠশালায় সোপর্দ করেন। বলা যায়, ইলম ও আধ্যাত্মিকতার এক পবিত্র পরিবেশেই জয়নাব লালিত-পালিত হয়েছিলেন।

মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি তাঁর চাক্ষুষ দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু চোখের আলো না থাকলেও জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা তাঁর এতটাই তীব্র ছিল যে ওস্তাদদের মুখ থেকে শুনে শুনেই তিনি হাজারো হাদিস ও ইসলামি পাণ্ডুলিপি মুখস্থ করে ফেলেন।

বর্তমান তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মারদিন শহরের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আলেম আবদুল খালিক আল-নিশতিবির কাছ থেকে তিনি তাঁর প্রথম ‘ইজাজাহ’ বা হাদিস বর্ণনার আনুষ্ঠানিক লিখিত অনুমতি লাভ করেন।

মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই জয়নাব ইলমের সন্ধানে দামেস্ক থেকে বাগদাদ, হালব, হারান, কায়রো ও ইস্কান্দরিয়া (আলেকজান্দ্রিয়া) সফর করেন। শৈশবেই তিনি বিশ্বখ্যাত সব মুহাদ্দিস ও শাইখ-শাইখাদের সান্নিধ্য লাভ করেন, যা পরবর্তী সময়ে নিরলস সাধনার মাধ্যমে তাঁকে তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদে পরিণত করে।

৪০০ গ্রন্থের শিক্ষক

জয়নাব বিনতে কামাল দামেস্কে সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিমসহ ইসলামের বড় বড় মৌলিক হাদিস গ্রন্থের নিয়মিত পাঠদান করতেন। তাঁর সেই সুবিশাল ক্লাসগুলোতে যুগপৎ অংশগ্রহণ করতেন হাজারো নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থী।

তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ও বুঝানোর শৈলী ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। তিনি দিনভর ক্লান্তিহীনভাবে পড়াতেন, জ্ঞানপিপাসু ছাত্রদের ভিড়ে কখনো একটুও বিরক্ত হতেন না।

সমকালীন ইতিহাসগ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিনি তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকজীবনে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার শতাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসের মূল কিতাব ছাত্রদের পড়িয়েছেন।

জয়নাবের ছাত্রদের তালিকা দেখলে যে কেউ বিস্মিত হতে বাধ্য। হাদিস ও ইতিহাস শাস্ত্রের কিংবদন্তি ইমাম শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি (রহ.) ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান ছাত্র।

ইমাম জাহাবি তাঁর এই মহান শিক্ষিকা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি ছিলেন সুন্নাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, অত্যন্ত ধার্মিক ও বিনয়ী রমণী। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। শিক্ষার্থীরা তাঁকে গোল করে ঘিরে ধরতেন এবং তিনি বড় বড় মূল গ্রন্থ থেকে হাদিস পড়ে শোনাতেন।’ (শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি, আল-ইবার ফি খবারি মান গাবার, ৪/৭৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৮৫)

তাঁর আরেক ধন্য ছাত্র ইবনে রাফি সুল্লামি বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত নেককার ও সৎ শিক্ষিকা, উচ্চ সনদধারী ও দীর্ঘায়ু নারী। বিশ্বজুড়ে মানুষ তাঁর জ্ঞান থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে।’ (সালিহ ইউসুফ মাতুক, জুহুদুল মারআতি ফি রিওয়ায়াতিল হাদিসি আল-করনাস ছামিনাল হিজরি, পৃষ্ঠা: ২৫৬-২৮০, দারুল বাশায়ির আল-ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

তিনি ছিলেন সুন্নাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, অত্যন্ত ধার্মিক ও বিনয়ী রমণী। বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। শিক্ষার্থীরা তাঁকে গোল করে ঘিরে ধরতেন এবং তিনি বড় বড় মূল গ্রন্থ থেকে হাদিস পড়ে শোনাতেন।
ইমাম শামসুদ্দিন আজ-জাহাবি (রহ.)

শেষ বিদায়

হাফেজ ইবনে কাসির (রহ.)-এর নিজ হাতে লেখা একটি প্রাচীন নোটে পাওয়া যায় যে জয়নাব বিনতে কামালের দরবারে বসে তিনি ইমাম মালিকের বিখ্যাত ‘মুওয়াত্তা’ গ্রন্থের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক পাঠটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল দামেস্কের কাসিয়ুন পর্বতের নিকটবর্তী ঐতিহ্যবাহী হানাবিলা মসজিদে।

এছাড়া তাঁর নিয়মিত ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন হাদিস শাস্ত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম হাফেজ জামালুদ্দিন আল-মিজ্জি এবং বিশ্ববিখ্যাত মহান ঐতিহাসিক ও পর্যটক ইবনে বতুতা।

তৎকালীন রক্ষণশীল যোগাযোগব্যবস্থার যুগে একজন দৃষ্টিহীন নারী হয়েও জয়নাব বিনতে কামাল যে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ, সামাজিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতা অর্জন করেছিলেন, তা আধুনিক পৃথিবীর মানুষের জন্যও এক পরম বিস্ময়।

তিনি তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর বাহ্যিক অবয়বে নয়; বরং তাঁর গভীর ইলম, তাকওয়া এবং সমাজ ও উম্মাহর জন্য রেখে যাওয়া অক্ষয় অবদানে।

৭৪০ হিজরিতে ৯৪ বছর বয়সে দামেস্কে এই মহান মুহাদ্দিসা ইন্তেকাল করেন।

  • ড. সাজেদা হোমায়রা: শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার ও আলোচক

    homairasajeda@gmail.com