জীবনে ইসলাম

দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় যেভাবে ইসলামকে প্রাধান্য দেবেন

ইসলাম কোনো খণ্ডকালীন বা নিছক আনুষ্ঠানিক উপাসনাকেন্দ্রিক আচার নয়; বরং এটি সামগ্রিক জীবনের এক ভারসাম্যপূর্ণ দর্শন। মানবজীবনের স্বাভাবিক মনোদৈহিক ছন্দ ও আত্মিক প্রশান্তি অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে একজন মানুষ কর্মক্ষম ও উৎপাদনশীল থাকতে পারে, ইসলামে রয়েছে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা।

আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ এবং কোরআন-সুন্নাহর শাশ্বত নির্দেশনার আলোকে পড়াশোনা ও কর্মজীবনে প্রেরণা পুনরুদ্ধার এবং একটি সুষম দিনলিপি গঠনের পাঁচটি মৌলিক দিক বিশ্লেষণ করা হলো।

১. নামাজকেন্দ্রিক সময় ব্যবস্থাপনা

বস্তুবাদী সময় ব্যবস্থাপনায় ঘড়ির যান্ত্রিক কাঁটাকে প্রধান মানদণ্ড ধরা হলেও ইসলামি সময় ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দু হলো দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজ কেবল একটি ধর্মীয় ফরজ বিধানই নয়, বরং এটি দিন ও রাতের বিভিন্ন প্রহরকে সুষমভাবে বিভক্ত করার এক স্বাভাবিক ছন্দ।

আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা মুমিনদের ওপর ফরজ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১০৩)

যাঁরা পড়াশোনায় গভীর মনোযোগ চান কিংবা কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চান, তাঁদের উচিত কাজের সময়সূচিকে নামাজের সময়ের সঙ্গে সমন্বিত করা। ফজর থেকে জোহর, জোহর থেকে আসর—এভাবে প্রতিটি ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময়কে কাজের এক একটি নিবিড় ‘ব্লক’ হিসেবে ভাগ করে নিলে প্রাত্যহিক জীবনে চমৎকার নিয়মানুবর্তিতা তৈরি হয়।

নামাজে একাগ্রতা (খুশু-খুজু) মানুষের মানসিক স্থিরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পূর্বসূরিরা নামাজকে অন্তরের শান্তি ও মানসিক অবসাদ দূর করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, জাদুল মা‘আদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৪/১৮৬, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)

নামাজ শেষে নিভৃতে আল্লাহর সমীপে মোনাজাত করা উচিত। কারণ, মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরের সূক্ষ্মতম অনুভূতির খবর রাখেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয়, তা-ও আমি জানি। আর আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনি অপেক্ষা অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬)

পড়াশোনার ক্লান্তি ও ভবিষ্যতের যাবতীয় অনিশ্চয়তা নিভৃতে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করলে মানসিক চাপ অনেকটাই প্রশমিত হয়।

২. কোরআনের সঙ্গে সংলাপ

কোরআনকে শুধু আনুষ্ঠানিক পাঠের গ্রন্থ মনে না করে জীবনের পথনির্দেশক বা ‘সংবিধান’ বিবেচনা করা প্রয়োজন। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট কোরআনের অর্থ ও মর্ম অনুধাবনের (তাদাব্বুর) জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত।

পড়ার টেবিলে বসার আগে বা রাতে ঘুমানোর পূর্বে অন্তরে এই জিজ্ঞাসা থাকা দরকার—আজ আমার প্রতিপালক আমাকে কী বার্তা দিতে চান? পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো, এর মর্মার্থ গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং তা অন্তরে ধারণ করা। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৭/৬৩, দার তাইবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

যেসব দিনে কাজের উদ্যম বা শারীরিক শক্তি কম থাকে, সে দিনগুলোতে হালকা বিষয় পড়া বা অপেক্ষাকৃত সহজ কাজগুলো সেরে ফেলা এবং উদ্যম তুঙ্গে থাকলে কঠিন অধ্যায়গুলো শেষ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কোরআনের একটি আয়াতও যদি হৃদয়ে আলো ফেলে, তবে তা ক্লান্ত আত্মায় নতুন শক্তি জোগায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত ছোট ছোট আমলের তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪)

৩. সময় ও কর্মশক্তির ব্যবস্থাপনা

সময়ের হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের শারীরিক ও মানসিক শক্তির মাত্রা (অ্যানার্জি লেভেল) অনুধাবন করা। একজন মানুষ প্রতিদিন একটানা ১০–১২ ঘণ্টা সমান মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না; মানবদেহে শক্তির স্বাভাবিক উত্থান-পতন থাকে।

বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতি মাসের হরমোনজনিত পরিবর্তন ও শারীরিক চক্রের কারণে কোনো কোনো সময়ে তীব্র ক্লান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর দেখা দিতে পারে। এই অবস্থাকে অলসতা ভেবে নিজেকে অপরাধী মনে করা নিতান্তই ভুল; বরং এটি সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত এক প্রাকৃতিক বিধান।

যেসব দিনে কাজের উদ্যম বা শারীরিক শক্তি কম থাকে, সে দিনগুলোতে হালকা বিষয় পড়া বা অপেক্ষাকৃত সহজ কাজগুলো সেরে ফেলা এবং উদ্যম তুঙ্গে থাকলে কঠিন অধ্যায়গুলো শেষ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এর পাশাপাশি শরীরকে সচল রাখতে দৈনিক অন্তত ২০–৩০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চার অভ্যাস রাখা প্রয়োজন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে শক্তিশালী ও সুস্থ মুমিন আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

শারীরিক কসরত মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিন ক্ষরণ বাড়িয়ে মানসিক অবসাদ দূর করতে সাহায্য করে।

৪. বিশ্রামও ইবাদতের অংশ

অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, সার্বক্ষণিক নিজেকে পড়ার টেবিলে আটকে রাখাই হয়তো নিষ্ঠার চূড়ান্ত মাপকাঠি। এই ধরনের ‘বিষাক্ত উৎপাদনশীলতা’ খুব দ্রুত মানসিক অবসাদ বা বার্নআউটের জন্ম দেয়। মানুষের মন যন্ত্র নয়; অতিরিক্ত চাপের মুখে তা একপর্যায়ে উদ্যম হারিয়ে ফেলে।

নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে এবং তোমার চোখেরও হক রয়েছে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫

ইসলাম দেহের অধিকার রক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার শরীরের হক রয়েছে এবং তোমার চোখেরও হক রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৭৫)

পরবর্তী কাজের শক্তি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে বিশ্রাম গ্রহণ করাও ইসলামি শরিয়তে একটি প্রশংসনীয় আমল। সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বলতেন, ‘আমি রাতের ঘুম বা বিশ্রামের মাধ্যমেও নেকির আশা রাখি, ঠিক যেভাবে রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে নেকির প্রত্যাশা করি।’ (আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ৮/৬০, দারুল মা‘রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হি.)

তাই কাজের ফাঁকে বিরতি নেওয়া, পরিবারের সঙ্গে প্রফুল্ল সময় কাটানো কিংবা রুচিশীল বিনোদনে যুক্ত হওয়া উদ্যম ধরে রাখতে সহায়তা করে।

৫. সকালের বরকত অন্বেষণ

দিনের শুরুতে ভোরের প্রহরকে কাজে লাগানো নববি সুন্নাহ। রাসুল (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের সকালের প্রহরে (ভোরের সময়ে) বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)

ফজরের পর নিষ্ক্রিয় অলসতায় না কাটিয়ে ভোরে পড়াশোনা বা মূল কাজ শুরু করলে অল্প সময়ে বিপুল ফল পাওয়া যায়। মানুষ যখন নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা সম্পন্ন করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করে (তাওয়াক্কুল), তখন কোনো সাময়িক ব্যর্থতার ভয় তাকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলতে পারে না।