
সুদানের রমজান মানে উদারতার মাস। নীল নদের অববাহিকায় অবস্থিত এই দেশটিতে রমজান আসে এক অভূতপূর্ব সামাজিক সংহতি নিয়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা আর যুদ্ধের দামামার মধ্যেও সুদানিরা রাজপথে ঐতিহ্যের ‘বারিশ’ বিছাতে ভুল করেনি।
সুদানি রমজানের সমার্থক শব্দ হলো ‘হুলুমুর’ বা ‘আরি লাল’। নামের অর্থ মিষ্টি-তেতো।
প্রস্তুত প্রণালী: এটি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে। লাল ভুট্টার অঙ্কুরোদগম ঘটিয়ে তা শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। এরপর আদা, দারুচিনি, এলাচ আর হরেক রকম ভেষজ মিশিয়ে লোহার তাওয়ায় সেঁকে পাতলা চাদরের মতো তৈরি করা হয়।
বিশেষত্ব: ইফতারের সময় এটি জলে ভিজিয়ে চিনি মিশিয়ে পান করা হয়। এর তীব্র সুগন্ধ দূর থেকে জানান দেয় যে রমজান এসেছে।
সুদানের সবচেয়ে গর্বের ঐতিহ্য হলো ‘ইফতার আল-শারে’ বা রাস্তার ইফতার। আসরের পর থেকে প্রতিটি পাড়ার পুরুষরা ঘর থেকে খাবার বের করে এনে রাস্তার ওপর খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে বসে পড়েন। এই পাটিকে সুদানে বলা হয় ‘বারিশ’।
তাদের লক্ষ্য থাকে কোনো পথচারী বা মুসাফির যেন ইফতারের সময় একা না থাকে। এমনকি তারা চলন্ত গাড়ি থামিয়ে যাত্রীদের অনুরোধ করেন যেন এসে ইফতার করে যান। কখনো কখনো তা জবরদস্তি মনে হয় এবং একে বলা হয় ‘পথচারী ওপর হামলা’, যা আসলে ভালোবাসার চরম বহিঃপ্রকাশ।
সুদানি ইফতারের প্রধান খাবার হলো ‘আসিদা’। এটি ভুট্টার আটা দিয়ে তৈরি এক প্রকার ঘন মণ্ড, যা দেখতে অনেকটা কেকের মতো।
এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ‘মুল্লাত তাগলিয়া’ (মাংসের গুঁড়ো ও ওকরা দিয়ে তৈরি ঘন ঝোল) অথবা ‘মুল্লাত নাইমিয়া’ (টক দই ও পিনাট বাটার দিয়ে তৈরি সাদা ঝোল)।
এছাড়া ‘বালিলা’ (সেদ্ধ ডাল বা ছোলা) সুদানজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
২০১৯ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনগুলোতে সুদানের সেনাসদরের সামনে কয়েক হাজার মানুষ যখন গণতন্ত্রের দাবিতে অনশন ও বিক্ষোভ করছিলেন, তখন রমজান এসে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
প্রচণ্ড দাবদাহ আর ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যেও বিক্ষোভকারীরা মাঠ ছাড়েননি। পুরো দেশ থেকে মানুষ খাবার পাঠিয়েছেন সেই আন্দোলনকারীদের জন্য।
খোদ সেনাসদরের সামনে রাজপথে বসে হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে ইফতার করার দৃশ্যটি ছিল সুদানিদের অজেয় ইচ্ছাশক্তির প্রতীক।
রমজানের শেষ বৃহস্পতিবার সুদানিরা পালন করে ‘রহমাতাৎ’। এই দিনে পরিবারগুলো বড় বড় ভোজের আয়োজন করে মূলত মৃত আত্মীয়দের স্মরণে।
ছোট ছোট শিশুরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘোরে এবং ‘রহমাতাৎ’ (রহমত এসেছে) বলে চিৎকার করে। বড়রা তাদের ভালো খাবার ও উপহার দেন। এটি এক প্রকার সামাজিক সদকা বা দান।
দুর্ভাগ্যবশত, ২০২৪ এবং তার পরবর্তী সময়ে সুদানের কিছু অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। এমনকি ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে আতবারা শহরে একটি ইফতার মাহফিলে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
তবুও সুদানিরা তাদের আতিথেয়তা ছাড়েনি। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোও তাবুর সামনে ছোট করে পাটি বিছিয়ে ইফতার ভাগ করে নিচ্ছেন, যেন তা তাদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।