ইসলামে এমন কিছু বিশেষ ক্ষণ বা মৌসুম রয়েছে, যা ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির জন্য অত্যন্ত বরকতময়। সময়ের সদ্ব্যবহার এবং বছরের প্রতিটি মাসের ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে কালজয়ী এক গাইডলাইন হলো ইমাম ইবনে রজব হাম্বলির (র.) বিখ্যাত গ্রন্থ লাতায়েফুল মাআরিফ ফীমা লি-মাওয়াসিমিল আমি মিনাল অজাইফ (বছরের বিভিন্ন ঋতুতে পালনীয় আমলসমূহের সূক্ষ্ম পরিচয়)
এটি কেবল একটি তথ্যবহুল কিতাব নয়, বরং মুমিনের অন্তরকে বিগলিত করার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
ইমাম জয়নুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনে আহমদ আল-বাগদাদি, যিনি ইবনে রজব হাম্বলি (৭৩৬–৭৯৫ হি.) নামেই অধিক পরিচিত। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ফকিহ, মুহাদ্দিস এবং আধ্যাত্মিক চিকিৎসক।
তাঁর পিতা তাঁকে ইলম অর্জনের জন্য মক্কা, মদিনা, দামেস্ক ও জেরুসালেমের মতো বড় বড় জ্ঞানকেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর মতো বড় বড় আলেমদের ছাত্র ছিলেন।
তাঁর রচনার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—তাতে একই সঙ্গে গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং হৃদয়স্পর্শী আধ্যাত্মিক উপদেশের সমন্বয় থাকে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে জামেউল উলুমি ওয়াল হিকাম এবং ফাতহুল বারি (বুখারির অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যাগ্রন্থ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইমাম ইবনে রজব তাঁর কিতাবটির ভূমিকায় লিখেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করে এই কিতাবটি সংকলন করেছি যাতে বছরের বিভিন্ন মাসের আমলসমূহ—যেমন নামাজ, রোজা, জিকির, শোকর এবং অন্যের খিদমত—একত্র করা যায়। এটি যেন আমার এবং আমার ভাইদের জন্য মৃত্যুর আগের প্রস্তুতি এবং পরকালের পাথেয় হিসেবে সহায়ক হয়।” (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ১২, দারু ইবনি কাসির, বৈরুত, ২০০৪)
বইটি বছরের বিভিন্ন মাসের ফজিলত ও আমল অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। প্রতিটি মাসকে তিনি বিভিন্ন ‘মজলিস’ বা অধিবেশনে ভাগ করেছেন। তবে তিনি তিনটি মাস—রবিউস সানি, জুমাদাল উলা ও জুমাদাল আখিরা—সম্পর্কে কোনো আলোচনা করেননি; কারণ তাঁর মতে এই মাসগুলোতে নির্ধারিত বিশেষ কোনো ইবাদতের মৌসুম নেই।
১. মহররম ও সফর: কিতাবটি শুরু হয়েছে বছরের প্রথম মাস মহররমের ফজিলত এবং আশুরার রোজা নিয়ে। এরপর সফর মাসে ‘লা আদওয়া ওয়ালা তিয়ারা’ (সংক্রামক ব্যাধি ও অপয়া বিশ্বাসের প্রতিবাদ) হাদিসের ব্যাখ্যায় ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর ভরসার গুরুত্ব আলোচনা করেছেন।
২. রবিউল আউয়াল: এই মাসে তিনি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জন্ম ও মৃত্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা পাঠকের হৃদয়ে নবিপ্রেম জাগ্রত করে।
৩. রজব ও শাবান: রজব মাসে তিনি হারাম মাসগুলোর মর্যাদা এবং শাবান মাসে রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি ও রোজা নিয়ে আলোচনা করেছেন। শাবান মাসকে তিনি রমজানের ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
৪. রমজান ও শওয়াল: রমজানের ফজিলত, দান-সদকা, তেলাওয়াত এবং শেষ দশকের ইবাদত নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। এরপর শওয়াল মাসে ঈদের খুশি এবং ছয় রোজার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।
৫. জিলহজ ও ঋতু পরিবর্তন: জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন এবং হজের ফজিলত ছিল কিতাবটির অন্যতম প্রাণবন্ত অধ্যায়। এর বাইরে তিনি বছরের চারটি ঋতু (শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত) পরিবর্তনের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করেছেন।
কিতাবটিতে এমন কিছু চমৎকার কথা রয়েছে যা মানুষের জীবনদর্শন বদলে দিতে পারে। যেমন:
তওবার মহিমা: ইমাম ইবনে রজব বলেন, “গুনাহগারদের ক্রন্দন আল্লাহর কাছে তাসবিহ পাঠকারীদের গুঞ্জনের চেয়েও বেশি প্রিয়; কারণ তাসবিহের মধ্যে অনেক সময় অহংকার থাকে, কিন্তু ক্রন্দনের মধ্যে থাকে বিনয় ও আত্মসমর্পণ।” (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ২০২)
দুনিয়ার হাকিকত: তিনি দুনিয়াকে ক্ষণস্থায়ী সরাইখানার সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন যে, পরকালের বাড়ি নির্মাণের জন্য নেক আমলের ভিত্তি স্থাপন এখনই করা প্রয়োজন।
রাতের নামাজের শ্রেষ্ঠত্ব: দিনের চেয়ে রাতের নামাজ কেন বেশি সওয়াবের, তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন— রাতের নামাজ রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা থেকে মুক্ত এবং আল্লাহর সঙ্গে একান্তে কথা বলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। (লাতায়েফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা: ৪৩)
ইমাম ইবনে রজব তাঁর কিতাবটি শেষ করেছেন তওবার আলোচনার মাধ্যমে। তিনি একে অভিহিত করেছেন ‘জীবনের সব সময়ের আমল’ হিসেবে। মানুষ যখন তওবার মাধ্যমে তার আমলনামা পরিচ্ছন্ন করে, তখনই সে আল্লাহর রহমতের যোগ্য হয়।
লাতায়েফুল মাআরিফ কেবল একটি কিতাব নয়, এটি মুমিনের জীবনের আয়না। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মাস আসবে মাস যাবে, কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি যে সময়ের এই চাকা থেকে নিজের পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে পেরেছে।