বিধান

মালিক খুঁজে না পেলে অবৈধ সম্পদ থেকে দায়মুক্তির পথ কী

মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা বা চুরি করা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। কিন্তু আল্লাহর হেদায়েত পেয়ে অনেকে অতীতের সেই ভুল বা অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং চায় সেই পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে।

কিন্তু সমস্যা বাঁধে তখন, যখন সেই সম্পদের প্রকৃত মালিককে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মালিকের মৃত্যু হলে বা তার কোনো হদিস না থাকলে সেই সম্পদ থেকে দায়মুক্ত হওয়ার উপায় কী?

তওবার মৌলিক শর্ত

তওবা কবুল হওয়ার জন্য কেবল অনুতাপ বা ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; যদি তা অন্য কোনো মানুষের অধিকার বা ‘হাক্কুল ইবাদ’ সংশ্লিষ্ট হয়। বরং শর্ত হলো—আত্মসাৎকৃত সম্পদ মালিক বা তার উত্তরাধিকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া।

কিন্তু যদি মালিককে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে সেই ব্যক্তির তওবা হবে কি না, তা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে তিনটি প্রধান মত রয়েছে।

প্রথম মত: একদল মনে করেন, মালিককে সম্পদ ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তওবা পূর্ণ হবে না। যেহেতু দুনিয়ায় মালিককে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই কেয়ামতের দিন নিজের পুণ্য দিয়ে এই দেনা শোধ করতে হবে।

তাদের মতে, অপরাধীকে প্রচুর ভালো করতে হবে যেন পাওনাদারকে দেওয়ার মতো যথেষ্ট পুঁজি তার থাকে। (ইমাম কুরতুবি, তাফসিরুল কুরতুবি, ৫/১৬০-১৬৩, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ২০০৬)

দ্বিতীয় মত: অন্য একদল মনে করেন, সেই সম্পদ কোনোভাবেই নিজের কাছে রাখা বা খরচ করা যাবে না।

এটি সরকারি কোষাগারে বা আমানতদার কোনো প্রতিনিধির কাছে জমা রাখতে হবে, যাতে কখনো মালিকের সন্ধান মিললে তা বুঝিয়ে দেওয়া যায়। (ইউসুফ আল-কারজাভি, ফিকহুত তাওবা, ১/১৬৬, মাকতাবাতু ওয়াহবা, কায়রো: ২০০১)

তৃতীয়মত: ইমাম ইবনুল কাইয়িমসহ একদল ফকিহ মনে করেন, আল্লাহর রহমতের দরজা কারো জন্যই বন্ধ নয়। যদি মালিককে পাওয়া না যায়, তবে সেই ব্যক্তির তওবা হলো—ওই সম্পদটুকু প্রকৃত মালিকের পক্ষ থেকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া জনকল্যাণমূলক কাজে বা গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৫/৭৭৮-৭৮০, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪)

একে ‘সদকা’ বলা হলেও এটি মূলত ‘দায়মুক্তি’ বা সম্পদ থেকে বিযুক্ত হওয়া।

সাহাবিদের আমল 

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জীবনে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। তিনি এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি দাসী ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু বিক্রেতা মূল্য নেওয়ার আগেই ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যায়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন তাকে আর পাওয়া গেল না, তখন ইবনে মাসউদ (রা.) সেই সমপরিমাণ অর্থ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে দোয়া করেছিলেন, “আল্লাহ, এটি ওই বিক্রেতার পক্ষ থেকে। সে যদি কেয়ামতের দিন এতে রাজি হয় তবে সওয়াব তার, আর সে যদি রাজি না হয় তবে সওয়াব আমার এবং আমার নেকি থেকে তাকে পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।” (ইমাম বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ৬/১৮৯-১৯২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ২০০৩)

একইভাবে যুদ্ধের গনিমত সম্পদ থেকে কেউ কিছু আত্মসাৎ করে পরে অনুতপ্ত হলে এবং সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে ওই সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাকি অংশ সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়ার মত দিয়েছেন তারা। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৫/৭৭৯, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪)

কারণ আল্লাহ ওই সেনাবাহিনীর সবার নাম ও পরিচয় জানেন এবং তিনি ঠিকই এই সওয়াব তাদের কাছে পৌঁছে দেবেন।

আমরা কী করতে পারি

যিনি অতীতের কোনো অবৈধ উপার্জন বা চোরাই সম্পদ থেকে মুক্তি পেতে চান, তাঁর জন্য বর্তমান সময়ের আলেমদের পরামর্শ হলো:

  • অনুসন্ধান: প্রথমে সাধ্যমতো মালিক বা তার উত্তরাধিকারীকে খোঁজার চেষ্টা করতে হবে।

  • বিযুক্ত হওয়া: যদি মালিককে পাওয়া না যায়, তবে সেই অর্থ নিজের কাছে রাখা যাবে না। এটি এতিমখানা, হাসপাতাল বা অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।

  • নিয়ত: এই অর্থ ব্যয়ের সময় নিজের জন্য সওয়াবের আশা করা যাবে না, বরং মালিকের পক্ষ থেকে দায়মুক্তির নিয়ত করতে হবে।

  • পরকালের প্রস্তুতি: এরপরও যদি কিয়ামতের দিন পাওনাদার এই দানে সন্তুষ্ট না হয়, তবে নিজের নেক আমল থেকে তাকে ভাগ দিতে হবে—এই মানসিক প্রস্তুতি রাখা এবং বেশি বেশি ইবাদত করা।

ইসলাম আমাদের শেখায় যে, পাহাড়সম পাপের চেয়েও আল্লাহর ক্ষমার পরিধি বিশাল। তবে সেই ক্ষমা পাওয়ার জন্য সৎ সাহস ও ত্যাগের প্রয়োজন। অন্যের সম্পদ ভোগ করে আত্মিক শান্তি পাওয়া অসম্ভব।

তাই মালিককে খুঁজে না পাওয়া গেলে তা আল্লাহর সৃষ্টি বা বান্দাদের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়াই হলো তওবার সর্বোত্তম ও কার্যকর পথ।