বিধান

হাদিসের শব্দ পরিবর্তন যেখানে নিষিদ্ধ

হাদিস বিশারদদের মতে, হাদিসের মূল শব্দ মনে না থাকলে কেবল তখনই অর্থের পরিবর্তন না করে অন্য শব্দে বর্ণনা করার অনুমতি (রুখসত) রয়েছে। তবে এটি সবার জন্য নয়, বরং কেবল সেই ব্যক্তির জন্য জায়েজ যিনি শব্দের মারপ্যাঁচ এবং অর্থ পরিবর্তন হওয়ার সূক্ষ্ম দিকগুলো সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্য রাখেন।

তা সত্ত্বেও পাঁচটি ক্ষেত্রে হাদিসকে অবশ্যই তার মূল শব্দে বর্ণনা করতে হবে।

১. সংকলিত কিতাবের হাদিস

হাদিস যখন মুখে মুখে বর্ণিত হতো, তখন ‘অর্থের মাধ্যমে বর্ণনা’ করার কিছুটা সুযোগ ছিল। কিন্তু ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম বা অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ যখন কিতাব আকারে হাদিস সংকলন করে ফেলেছেন, তখন আর নিজের ভাষায় হাদিস বলার কোনো সুযোগ নেই।

কিতাবে যে শব্দে হাদিসটি লিপিবদ্ধ আছে, তা সেভাবেই উদ্ধৃত করা ওয়াজিব। তবে কেউ যদি কেবল আলোচনার খাতিরে কোনো হাদিসের মর্মার্থ বোঝাতে চান (রেফারেন্স হিসেবে নয়), তবে তা জায়েজ।

২. বিশ্বাস সংক্রান্ত হাদিস

আল্লাহ–তাআলার নাম ও গুণাবলি সংক্রান্ত হাদিসগুলো সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয়। আল্লাহ নিজেকে যে নামে বা গুণে অভিহিত করেছেন, ঠিক সেই শব্দই ব্যবহার করতে হবে।

যেমন—আল্লাহর গুণ ‘সামিউন’ (সর্বশ্রোতা) বা ‘বাসিরুন’ (সর্বদ্রষ্টা)-কে অন্য কোনো সমার্থক শব্দ দিয়ে পরিবর্তন করা যাবে না। কারণ আল্লাহর মহিমা বর্ণনায় মানুষের দেওয়া কোনো শব্দই মহানবী (সা.)–এর শেখানো শব্দের সমতুল্য হতে পারে না।

৩. ইবাদত ও জিকির সংক্রান্ত হাদিস

এমন কিছু হাদিস রয়েছে যার শব্দগুলো স্বয়ং ইবাদত হিসেবে গণ্য। যেমন:

  • আজান ও ইকামতের শব্দসমূহ।

  • নামাজের তাকবির, দোয়ায়ে কুনুত এবং তাশাহহুদ।

  • নামাজ পরবর্তী জিকির, ঘুমানোর বা সফরের দোয়া। এসব দোয়া বা জিকিরের ক্ষেত্রে নবীজি (সা.) যে শব্দ শিখিয়েছেন, ঠিক সেটিই বলতে হবে।

সাহাবি বারা ইবনে আজিব (রা.) একবার একটি দোয়া পড়ার সময় নবীজির শেখানো ‘নাবিয়্যিকা’ (আপনার নবী) শব্দের স্থলে ‘রাসুলিকা’ (আপনার রাসুল) বলেছিলেন। নবীজি (সা.) তৎক্ষণাৎ তা সংশোধন করে দিয়ে মূল শব্দটিই পড়তে বলেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ২৪৭)

৪. জাওয়ামিউল কালিম

রাসুল (সা.)-এর অন্যতম মোজেজা ছিল অল্প কথায় বিশাল অর্থ প্রকাশ করা, যাকে বলে ‘জাওয়ামিউল কালিম’। যেমন, “নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল” অথবা “ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতি সওয়াও যাবে না”।

এই বাক্যগুলো ইসলামি শরিয়তের একেকটি মূলনীতি (লিগ্যাল ম্যাক্সিমস)। এর একটি শব্দ পরিবর্তন করলে তার বিশাল অর্থ ও আইনি গুরুত্ব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। নবীজির অলঙ্কারশাস্ত্র ও বাগ্মিতা রক্ষা করাও উম্মতের দায়িত্ব, তাই এসব হাদিস হুবহু বর্ণনা করা জরুরি।

৫. কূটনৈতিক পত্র, সন্ধিপত্র ও আইনি পরিভাষা

রাসুল (সা.) বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদের কাছে যে পত্র পাঠিয়েছেন, বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে যে সন্ধি (যেমন: হোদাইবিয়ার সন্ধি) করেছেন বা জাকাত-সদকার যে পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তার শব্দগুলো অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।

এসব ক্ষেত্রে একটি শব্দের পরিবর্তনে ভুল অর্থ প্রকাশ পেতে পারে। এ ছাড়াও নবীজির ব্যবহৃত বিশেষ কিছু যুদ্ধকালীন পরিভাষা (যেমন: ‘হামিয়াল ওয়াতিস’) হুবহু বর্ণনা করতে হয়।

সারকথা, হাদিসের শব্দ হুবহু বর্ণনা করাই হলো মূল নিয়ম। নবীজি (সা.) দোয়া করেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে উজ্জ্বল ও সজীব রাখুন, যে আমার কথা শুনল, তা মুখস্থ করল এবং যেভাবে শুনেছে ঠিক সেভাবেই অন্যের কাছে পৌঁছে দিল।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৬০)

তাই হাদিস বর্ণনার সময় সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।