সাহাবিদের কথা

বেহেশত কিনেছিলেন তিনি একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে

দুনিয়ার সম্পদ অর্জন ও রক্ষার জন্য মানুষ কত পরিশ্রমই না করে! অথচ পরকালের প্রতি দৃঢ়বিশ্বাস মানুষকে কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হয়।

এমনই একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.)। বেহেশতের আশায় নিজের খেজুরবাগান বিক্রি করে দিয়েছিলেন তিনি।

খেজুরগাছের বিনিময়ে বেহেশতের প্রস্তাব

সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে অভিযোগ করলেন, অমুক ব্যক্তির একটি খেজুরগাছ তাঁর বাগানে রয়েছে। গাছটি থাকায় তিনি নিজের বাগানের প্রাচীর নির্মাণ করতে পারছেন না।

তাই তিনি নবীজিকে অনুরোধ করলেন যেন গাছের মালিককে বলেন সেটি তাঁকে দিয়ে দিতে।

রাসুল (সা.) গাছের মালিককে ডেকে বললেন, তিনি যেন গাছটি ওই ব্যক্তিকে দিয়ে দেন। বিনিময়ে বেহেশতে একটি খেজুরগাছ পাবেন। কিন্তু লোকটি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

বেহেশতের আশায় নিজের বাগান বিনিময়

গাছটির মালিকের প্রত্যাখ্যানের কথা জানতে পেরে সাহাবি আবু দাহদাহ (রা.) এগিয়ে এলেন। তিনি ওই ব্যক্তিকে বললেন, একটি বাগানের বিনিময়ে খেজুরগাছটি বিক্রি করতে। লোকটি রাজি হয়ে গেলেন।

নিজের বাগান বুঝিয়ে দিয়ে আবু দাহদাহ (রা.) গাছটি নিয়ে নিলেন। তারপর নবীজির কাছে গিয়ে বললেন, একটা বাগানের বিনিময়ে খেজুরগাছটি তিনি কিনেছেন। এখন সেই প্রাচীর নির্মাণকারী ব্যক্তিকে গাছটি দিয়ে দিতে চান।

তোমরা কখনোই পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো। আর তোমরা যা কিছুই ব্যয় করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।
সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯২

কেন এমন করলেন আবু দাহদাহ

আবু দাহদাহ্‌র এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল পরকালের প্রতি বিশ্বাস এবং অন্যের উপকার করার আগ্রহ। তিনি দুনিয়ার সম্পদকে চূড়ান্ত অর্জন মনে করেননি, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেছিলেন।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা কখনোই পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে ব্যয় করো। আর তোমরা যা কিছুই ব্যয় করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯২)

আয়াতটি প্রিয় সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে পুণ্য অর্জনের একটি সাধারণ নীতি তুলে ধরেছে। আবু দাহদাহ্‌র ঘটনা সেই নীতির বাস্তব প্রতিফলন।

আবু দাহদাহ্‌র জন্য বেহেশতের সুসংবাদ

আবু দাহদাহ্‌র এই মহৎ কাজের কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, ‘আবু দাহদাহর জন্য বেহেশতে কত ঝুলন্ত ফলভর্তি খেজুরের ছড়া রয়েছে!’ নবীজি এ কথাটি একাধিকবার বলেছিলেন।

একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে নিজের বাগান ছেড়ে দেওয়ার প্রতিদান হিসেবে বেহেশতে খেজুরের কাঁদির এই সুসংবাদ ছিল আবু আবু দাহদাহ্‌র জন্য বিরাট প্রাপ্তি।

স্ত্রীর ইমানদীপ্ত প্রতিক্রিয়া

বাগান বিনিময়ের পর আবু দাহদাহ (রা.) স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে উম্মে দাহদাহ, বাগান থেকে বেরিয়ে এসো। আমি এটি বেহেশতের একটি খেজুরগাছের বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছি।’

স্ত্রী উত্তরে বললেন, ‘নিশ্চয়ই ব্যবসা লাভজনক হয়েছে।’

দাম্পত্য জীবনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অনেক রূপ রয়েছে। এর মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেওয়া নেক সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে গভীর জীবনবোধ। স্বামীর সিদ্ধান্তে তাঁদের বসবাসের বাগান হাতছাড়া হয়েছে, তবু স্ত্রী সেটিকে ক্ষতি হিসেবে দেখেননি। বরং বেহেশতের প্রতিদানের আশায় সম্পদ বিনিময়কে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

দাম্পত্য জীবনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর অনেক রূপ রয়েছে। এর মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নেওয়া নেক সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আবু দাহদাহ্‌র স্ত্রী দেখিয়েছেন, ইমানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিবারে দুনিয়ার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি বেশি গুরুত্ব পায়।

এ ঘটনা আমাদের যা শেখায়

সাহাবি আবু দাহদাহ্‌র ঘটনা আমাদের পরিপূর্ণরূপে সম্পদ ত্যাগ করতে হবে, এমন কোনো সাধারণ নির্দেশ দেয় না। এটি বরং শেখায়, সম্পদ যেন মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা এবং নেক কাজে এগিয়ে আসা মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

আল্লাহ–তাআলা বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ গ্রহণ করার কথা ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাঁদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন, এর বিনিময়ে তাঁদের জন্য রয়েছে বেহেশত।’ (সুরা তওবাহ, আয়াত: ১১১)

এই আয়াত–আল্লাহর পথে জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার মহান মর্যাদা তুলে ধরেছে। আবু দাহদাহ্‌র ঘটনা এই শিক্ষার একটি হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত।

সূত্র: মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৪৮২; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭১৫৯

  • নাহাদি সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    nahidasultana753375@gmail.com