ইবাদত

গুনাহ পুড়িয়ে ফেলার মাস রমজান

আমরা সবাই মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছি এবং মুখোমুখি হতে যাচ্ছি অনন্ত পরকালের জীবনের। যে জীবনের শুরুতে খোলা হবে এ জীবনের হিসাব-নিকাশের খাতা। সেই কঠিন হিসাবের খাতা থেকে আমাদের ছোট-বড়, জানা-অজানা গুনাহগুলোকে পুড়িয়ে ফেলতেই এই রমজান।

কারণ, ‘রমজান’ শব্দটির আভিধানিক অর্থই হচ্ছে উত্তাপ, তাপের উচ্চমাত্রা বা পুড়িয়ে দেওয়া। রমজান শব্দের ভাষাগত অর্থ সম্পর্কে আলেমগণ বলেছেন, এটি ‘রমদ’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রচণ্ড তাপ বা জ্বালা। আর এ মাস বান্দার গুনাহকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মুছে দেওয়ার উপলক্ষ।

রমজানকে তাই বলা যায়, গুনাহগার বান্দাদের গুনাহগুলো পুড়িয়ে নিজেদের শুদ্ধ করার মাস। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা পালন করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংসের কথা বলেছেন। তার এক শ্রেণি হলো যারা রমজান মাস পেল, অথচ এই মাসে নিজেদের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, আল্লাহর ক্ষমা আদায় করে নিতে পারল না।

যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে রোজা পালন করবে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮

রমজান তাই শুধু একটি মাস নয়। এটি আল্লাহর চূড়ান্ত হিসাবের আগেই নিজেদের হিসাব ঠিক করার সময়। গুনাহের আগুন নিভিয়ে ফেলার সময়। অন্তরকে শুদ্ধ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে ফিরে যাওয়ার সময়।

বান্দার জন্য নেক আমল যেমন দরকার, তেমনি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াও জরুরি। আল্লাহ–তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, “তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন গুনাহ পরিত্যাগ করো।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১২০)

রমজানে যেসব গুনাহ আমাদের ঈমানকে দুর্বল করে, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

১. শিরক থেকে বাঁচা

শিরক মানে আল্লাহ–তাআলার সাথে কাউকে শরিক করা। ইবাদতে, দোয়ায়, নির্ভরতায় বা ভালোবাসায় এমনভাবে কাউকে অংশীদার করা, যা কেবল আল্লাহর জন্যই প্রাপ্য।

শিরক মানুষের সব ধরনের আমল নষ্ট করে দেয়। তাই সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো শিরক। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এ ছাড়া অন্যান্য পাপ, যার জন্য তিনি চান।” (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)

২. রিয়া থেকে দূরে থাকা

রিয়া হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা বা ভালো কাজ করা। বাইরে থেকে কোনো আমল সুন্দর মনে হলেও, যদি নিয়ত আল্লাহর জন্য না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হয় না।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসের ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।” সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, “রিয়া।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৩০)

৩. নামাজে অবহেলা থেকে সতর্ক থাকা

নামাজ ঈমানের অন্যতম স্তম্ভ। কিয়ামতের দিন নামাজের হিসাব সবার আগে নেওয়া হবে। তাই নামাজ ত্যাগ করা বা নামাজে অবহেলা করা একটি কবিরা গুনাহ।

জাবির (রা.) বলেন, নবীজিকে বলতে শুনেছি, “বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে নামাজ পরিত্যাগ করা।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৯)

রিয়া হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করে মানুষকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা বা ভালো কাজ করা। বাইরে থেকে কোনো আমল সুন্দর মনে হলেও, যদি নিয়ত আল্লাহর জন্য না হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হয় না।

৪. গিবত ও পরনিন্দা থেকে বাঁচা

গিবত হলো কারো পেছনে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা কি জানো গিবত কী? তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯)

কোরআনেও এসেছে: “আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো।” (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)

গিবত শুধু মুখের গুনাহ নয়, বরং এটি হৃদয়ের অসুস্থতার প্রকাশ। এটি সম্পর্ক নষ্ট করে, অন্তর কালো করে এবং আমল ধ্বংস করে দিতে পারে।

৫. মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা

মিথ্যাকে সব ধরনের পাপের মা বলা হয়। কারণ মিথ্যা মানুষকে পাপের দিকে এবং পাপ জাহান্নামের দিকে পরিচালিত করে। হাদিসে মিথ্যা বলাকে মুনাফিকির অন্যতম চিহ্ন বলা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারী মিথ্যাবাদীকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সুরা মুমিন, আয়াত: ২৮)

৬. অহংকার ত্যাগ করা:

অহংকার শুধুমাত্র আল্লাহর পোশাক, বান্দার জন্য নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)

রমজান আমাদের শেখায় বিনয়ী হওয়া এবং অন্তরের নম্রতার দিকে মনোযোগ দেওয়া।

যে গুনাহগুলো সরাসরি আকিদা, ইবাদত ও চরিত্র নষ্ট করে দেয়, সেগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করা বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি।

৭. মানুষের হক নষ্ট না করা

মানুষের সম্পদ, সম্মান বা অধিকার ক্ষুণ্ণ করা ভয়ংকর গুনাহ। বান্দার হক নষ্ট করলে বান্দা মাফ না করলে স্বয়ং আল্লাহও মাফ করবেন না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে সে যেন তা থেকে আজই মাফ চেয়ে নেয়, তার ভাইয়ের জন্য তার কাছ থেকে নেকি কেটে নেওয়ার আগে...” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫৩৪)

৮. সুদ ত্যাগ করা:

সুদ মানুষের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ অকৃতজ্ঞ পাপীদের ভালোবাসেন না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৬)

৯. অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকা

চোখ, কান ও অন্তরকে হেফাজত না করলে বড় গুনাহে জড়িয়ে পড়া সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “মুমিন পুরুষদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে...” (সুরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

পরের আয়াতে নারীদের জন্যও একই নির্দেশ এসেছে। তাই হারাম সম্পর্ক, অশ্লীল কথা, ছবি বা কনটেন্ট—এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি।

যে গুনাহগুলো সরাসরি আকিদা, ইবাদত ও চরিত্র নষ্ট করে দেয়, সেগুলো থেকে বাঁচার চেষ্টা করা বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি। হারাম বর্জনই অনেক সময় ঈমানকে রক্ষা করার সবচেয়ে শক্ত ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ আমাদের সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করে প্রকৃত রোজাদারদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

writerismat@gmail.com

ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক