প্রাচীন ইসলামি নগরীগুলোর দিকে তাকালে স্থাপত্যকে শুধু পাথরের স্তূপ মনে হয় না—মনে হয় প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি তোরণ যেন একটা করে গল্প বলছে। প্রতিটি ইমারতের পেছনে আছেন এক দানশীল মানুষ, যিনি আজ বেঁচে নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর একটা স্থায়ী সৎকাজ—একটা ওয়াক্ফ।
আর তার ফল ভোগ করছে আজকের জীবন্ত শহরটা। মিসরীয় ভূগোলবিদ জামাল হামদান একবার বলেছিলেন, ভূগোলের কাজ কোনো অঞ্চলের শুধু বাহ্যিক রূপটা দেখা নয়, বরং তার আত্মাকে খোঁজা। (জামাল হামদান, শাখসিয়্যাতু মিসর: দিরাসা ফি আবকারিয়্যাতিল মাকান, কায়রো: দারুল হিলাল, ১৯৯৩)
ইসলামি শহরের ক্ষেত্রে এই খোঁজ চালালে দেখা যায়, তার আত্মাটা হলো ওয়াক্ফ—মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করা সম্পদ।
আমাদের কাছে ওয়াক্ফ মানে সাধারণত মসজিদের পাশে একটু জমি দান করা বা এতিমখানায় কিছু সদকা করা। কিন্তু নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ওয়াক্ফ আসলে একটা শহর গড়ে তোলার মূল শক্তি ছিল।
ফিকহের ভাষায় ওয়াক্ফ মানে—মূল সম্পত্তিটা চিরতরে আটকে রেখে তার থেকে আসা লাভ জনকল্যাণে খুলে দেওয়া। (কামিল আবু সাকর, আল-আওলামাতুত তিজারিয়্যা ওয়াল ইদারিয়্যা ওয়াল কানুনিয়্যা: রুইয়া ইসলামিয়্যা, বৈরুত: দারুল উইসাম, ২০০০)
ওয়াক্ফ আসলে কোনো সাময়িক ত্রাণ বা খয়রাতি ব্যবস্থা ছিল না—এটা ছিল দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়নের একটি স্থায়ী অবকাঠামো।
ইসলামি শহরে কোনো মহল্লা কখনো এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি মহল্লার কেন্দ্রে থাকত একটা সুপরিকল্পিত ওয়াক্ফ কমপ্লেক্স—ঠিক মাঝখানে জামে মসজিদ, আর তাকে ঘিরে মাদ্রাসা, থাকার জায়গা, পানির ব্যবস্থা ও চিকিৎসালয়।
এর সবচেয়ে চমৎকার দিকটা ছিল অর্থনৈতিক টিকে থাকার কৌশলে। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশেই গড়ে তোলা হতো দোকানপাট, বাজার, সরাইখানা বা ভাড়াটে বাড়ি। সেখান থেকে আসা ভাড়া বা আয় দিয়েই চলত মসজিদ-মাদ্রাসা-হাসপাতালের খরচ, শিক্ষক-চিকিৎসকদের বেতন আর শিক্ষার্থীদের বৃত্তি। (আব্দুল্লাহ হুসাইন আন-নিআমা, ‘হিনা কাতাবাল ওয়াকফুল মাদিনা’, ইসলাম অনলাইন, দোহা, ২০২২)।
ফলে একটি শহরের জনকল্যাণব্যবস্থা চালু রাখার জন্য কোনো বাদশাহর দয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো না—পুরো ব্যবস্থাটাই ছিল স্বনির্ভর। কায়রোর আল-মুইজ সড়ক ধরে হাঁটলে বা ইস্তাম্বুলের উসমানীয় আমলের সামাজিক কমপ্লেক্সগুলো দেখলে আজও এই কথাটা টের পাওয়া যায়—এই শহরগুলো যেন পাথর দিয়ে নয়, ওয়াক্ফের একটা দর্শন দিয়েই গড়া হয়েছিল।
ওয়াক্ফনির্ভর এই শহরগঠন শুধু রাস্তা আর দালানের নকশাই তৈরি করেনি, পুরো সমাজকেও একটা বন্ধনে জড়িয়ে দিয়েছিল। একটা ওয়াক্ফ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে পুরো মহল্লা যেন একটা পরিবার হয়ে উঠত।
একদিকে ধনী মানুষ সম্পত্তি দান করছেন, অন্যদিকে দরিদ্র, অসহায় আর মুসাফিরেরা সেখান থেকে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া-পানি আর শিক্ষা পাচ্ছেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের জায়গাকে বলেন ‘স্থানহীন স্থান’— যেখানে দালান আছে, কিন্তু অর্থ নেই; দেয়াল আছে, কিন্তু আত্মা নেই।
কোরআনে বলা হয়েছে, প্রকৃত পুণ্য পেতে হলে নিজের প্রিয় জিনিস থেকেই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতে হবে। (সুরা আলে–ইমরান, আয়াত ৯২)
এই শিক্ষার আলোকেই মুসলিম স্থপতি ও দানবীরেরা ওয়াক্ফ ভবন বানানোর সময় সবচেয়ে বেশি যত্ন আর সৌন্দর্য ঢেলে দিতেন। সৌন্দর্য এখানে বিলাসিতা ছিল না, ছিল একধরনের ইবাদত—কারণ, ভবনটা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তো বানানো। তাই পুরো শহরটাই এমনিতেই হয়ে উঠত দৃষ্টিনন্দন।
ওয়াক্ফ আসলে কোনো সাময়িক ত্রাণ বা খয়রাতি ব্যবস্থা ছিল না—এটা ছিল দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়নের একটি স্থায়ী অবকাঠামো। আজকের অর্থনীতি যে ‘টেকসই উন্নয়ন’-এর কথা বলে, ইসলাম শতাব্দীর পর শতাব্দী আগেই ওয়াক্ফের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছিল।
আধুনিক যুগে এই ব্যবস্থায় একটা বড় ধাক্কা লাগে। আধুনিক রাষ্ট্র ওয়াক্ফ সম্পত্তিগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে যায়, আর স্বাধীন বা পারিবারিক ওয়াক্ফের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে শহরগুলো তার সেই চিরন্তন অভিভাবককে হারিয়ে ফেলে। (জালাল আমিন, আল-আওলামা, কায়রো: দারুশ শুরুক, ২০০১)
আর এর ফলাফলটাও স্পষ্ট—মরক্কোর রাবাত থেকে বাহরাইনের মানামা পর্যন্ত আজকের আরব ও মুসলিম শহরগুলো অনেক জায়গায় হয়ে উঠেছে নিষ্প্রাণ ইটপাথরের স্তূপ। নতুন ভবনগুলোর নকশায় কোনো ঐতিহ্য বা আত্মার ছোঁয়া নেই।
সমাজবিজ্ঞানীরা এ ধরনের জায়গাকে বলেন ‘স্থানহীন স্থান’— যেখানে দালান আছে, কিন্তু অর্থ নেই; দেয়াল আছে, কিন্তু আত্মা নেই।
অতীতে জমি বা দালান ওয়াক্ফ করে যদি নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হয়, তাহলে আজকের ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায়, যেখানে দৃশ্যমান জমি নেই, সেখানে ওয়াক্ফ কেমন হবে?
বর্তমানে কাতারের দোহার ‘সুক ওয়াকিফ’ (নামের মধ্যেই ওয়াক্ফ শব্দটা লুকিয়ে আছে) বা মুশাইরিব এলাকার মতো কিছু পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে সেই হারিয়ে যাওয়া আত্মাটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
কিন্তু এগুলোকে শুধু পর্যটকদের দেখার জাদুঘর না বানিয়ে, এখান থেকে আসা আয় আবার সমাজকল্যাণে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।
একটা প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—অতীতে জমি বা দালান ওয়াক্ফ করে যদি বাস্তব নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে আজকের ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায়, যেখানে কোনো দৃশ্যমান জমি নেই, সেখানে ওয়াক্ফের রূপ কেমন হতে পারে?
জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিগত বা ডিজিটাল ওয়াক্ফ—যেমন মুক্ত শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম বা উন্মুক্ত ডেটাবেজ কি নতুন একটা জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাই বোধ হয় আজকের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় কাজ।