গোলটেবিলে বক্তারা

কর্মস্থল নিরাপদ করতে এখনো অনেক কাজ বাকি

‘রানা প্লাজার দুর্ঘটনার ৯ বছর: পোশাক খাতে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত আলোচকেরা। সোমবার, প্রথম আলো কার্যালয়, কারওয়ান বাজার, ঢাকা
  ছবি: প্রথম আলো

রানা প্লাজার দুর্ঘটনার ৯ বছর পার হতে চলল। এ দুর্ঘটনার পর কর্মস্থলে নিরাপত্তার বিষয়টি সবার সামনে আসে। এই কয় বছরে কর্মস্থলে কাজের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়। কর্মস্থল নিরাপদ করতে নীতি নির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক কাজ বাকি। শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, সব উৎপাদনকারী কারখানায় নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

‘রানা প্লাজার দুর্ঘটনার ৯ বছর: পোশাক খাতে নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। আজ সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অস্ট্রেলিয়ান এইডের সহায়তায় বৈঠকটির আয়োজন করে একশনএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো।

বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামসুন্নাহার ভুইয়া বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা অনেকটা এগিয়েছি। নিরাপদ কর্মক্ষেত্র জীবন বাঁচায়, উৎপাদন বাড়ায়। এ দেশ মালিকের, শ্রমিকের সবার। কর্মক্ষেত্র অবশ্যই নিরাপদ করতে হবে।’

কর্মক্ষেত্র নিরাপদ করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা কাজ হওয়ার কথা তুলে ধরেন শামসুন্নাহার ভুইয়া। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আরও কাজ করতে হবে। বর্তমানে ২৩ জেলায় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফি) কার্যক্রম আছে। তারপরও তা পর্যাপ্ত নয়। জনবল আরও প্রয়োজন। শ্রমজীবী মানুষের জন্য হেলথ ইনস্যুরেন্স করা দরকার। রানা প্লাজার ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছিল। এতগুলো জীবন হারাতে হলো। এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর জন্য সরকার বিভিন্ন কাজ করছে। কারখানায় সেফটি কমিটি করা হয়েছে, এসব কমিটি লোকদেখানো নয়। এসব কমিটির কার্যক্রম আরও সক্রিয় করা দরকার।

ডাইফির যুগ্ম মহাপরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে অবকাঠামো, অগ্নি ও বিদ্যুৎ–সংক্রান্ত নিরাপত্তা প্রয়োজন। রানা প্লাজার দুর্ঘটনা একটা বড় ধরনের নাড়া দিয়েছিল। রানা প্লাজার ঘটনায় ভবনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। একটা কর্মক্ষেত্রকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। ডাইফি এ তিনটি নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেওয়া শুরু করে। ডাইফিতে এখন পরিদর্শক ৯৯৯ জন। এ সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। ডাইফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি ইউনিট (আইএসইউ) গঠন করেছে। সব শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে এ আইএসইউ কাজ করে।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করতে অনেক কাজ হয়েছে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম। তিনি বলেন, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর শ্রম আইন সংস্কার হয়েছে, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড হয়েছে। তবে দুঃখের বিষয়, ১ হাজার ১৩৫ শ্রমিকের মৃত্যুর পর এসব কাজ হয়েছে, যা আগেই করা উচিত ছিল। শিল্পের বিষয়গুলো কিন্তু এভাবেই হয়। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের অধীন তহবিল করা হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর ১২ মিলিয়ন ডলার জমা হয়। এই তহবিল থেকে দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের সহায়তা দেওয়া হয়। শতভাগ কাজ যে হয়েছে, তা নয়, আরও কাজ বাকি আছে। মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক শতভাগ ভালো তা বলা যাবে না, তবে এ সম্পর্ক আরও ভালো করতে হবে।

শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের আহ্বায়ক হামিদা হোসেন বলেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নির্ধারণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ টাকা কি শুধু পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রেই পাবে নাকি অন্য শিল্প খাতের শ্রমিকেরাও পাবেন—এটা ঠিক করতে হবে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার চর্চার বিষয়টিও নজর দিতে হবে। ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন করতে হবে।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘ মেয়াদে সহযোগিতার বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এর জন্য পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। এটা কোনো দান-দক্ষিণার বিষয় নয়। শ্রমিকদের জন্য হেলথ ও আনএমপ্লয়মেন্ট ইনস্যুরেন্স স্কিমগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক কারখানার জন্য এসব করলে চলবে না, পাশাপাশি উৎপাদনমুখী সব কারখানার জন্য এসব চালু করতে হবে। এর জন্য নীতি নির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দসহ কারখানামালিকদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

বৈঠকে জার্মান সাহায্য সংস্থা জিআইজেড বাংলাদেশের ক্লাস্টার কো-অর্ডিনেটর ওয়ার্নার লাংগে বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নিরাপত্তার বিষয়ে ৯ বছরে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। তবে আহত শ্রমিকদের কথা ভেবে একটি আনএমপ্লয়মেন্ট ইনস্যুরেন্স স্কিম চালু করতে না পারা, এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। রানা প্লাজার দুর্ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হলো, এটা আমাদের ভাবতে হবে। সত্যিকার অর্থেই কারখানাগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ কতটা নিশ্চিত হলো, সে প্রশ্ন বারবার করতে হবে।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সাইদুল ইসলাম বলেন, রানা প্লাজার পরে শিল্প খাতে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়ে বাংলাদেশের অর্জন আছে। ডাইফ আইএসইউ তৈরি করেছে। ৮ বছর আগে এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি ইনস্যুরেন্স স্কিম চালুর আলাপ ওঠে। গত বছর শেষে এটি রূপ পেয়েছে তৈরি পোশাক খাতে এটি চালুর ঘোষণার মধ্য দিয়ে। সরকার একটা কাঠামো তৈরি করছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ হয়েছে, তবে নীতি নির্ধারণ ও মাঠপর্যায়ে এখনো অনেক কাজ বাকি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় হতাহতদের সহযোগিতার বিষয়ে একটা কাঠামো তৈরি দরকার। সে কাঠামো শুধু তৈরি পোশাক খাতের কারখানার জন্য হলে হবে না। অন্য শিল্প খাতের কারখানাগুলোতেও অগ্নি দুর্ঘটনা বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ইনস্যুরেন্স ও দুর্ঘটনাজনিত ইনস্যুরেন্স করা যেতে পারে। শুধু টাকা বা অর্থ সাহায্য দিলেই কিন্তু হবে না। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতাও প্রয়োজন।
সলিডারিটি সেন্টার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এ কে এম নাসিম বলেন, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দেশে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এসব ট্রেড ইউনিয়ন কতটা কার্যকরী, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর সেফটি কমিটি গঠনের বিষয়টি এসেছে। কমিটিতে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব ভালোভাবে কাজ করছে কি না, তা দেখতে হবে। যেভাবে এ কমিটির কাজ করার কথা, তা হচ্ছে না।
শ্রম আইনে হতাহত শ্রমিকের পুনর্বাসনের কথা নেই উল্লেখ করে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় হতাহত হলে শ্রম আইনে ক্ষতিপূরণের কথা বলা আছে। তবে পুনর্বাসনের কথা উল্লেখ নেই। আমাদের মাথাপিছু আয় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অথচ কর্মক্ষেত্রে কেউ মারা গেলে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। এক বছরের মাথাপিছু আয়ের চেয়ে একটা মানুষের জীবনের দাম কম। এটা পুনর্বিন্যাস করা দরকার।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটির ব্যবস্থাপক মরিয়ম নেছা। তিনি একশনএইডের করা একটি জরিপের ফলাফল তুল ধরে বলেন, ২০০ জনের ওপর করা জরিপে এসেছে, ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ আহত শ্রমিক তাঁদের পুরোনো পেশা গার্মেন্টসে ফিরে গেছেন। অনেকেই পেশা বদলে গৃহকর্ম, দিনমজুরি, কৃষিকাজ ও গাড়ি চালানোর পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

মরিয়ম নেছা বলেন, জরিপে এসেছে, বেশির ভাগ আহত শ্রমিকের আয় করোনা মহামারির প্রভাবে ব্যাপকভাবে কমেছে। ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, মহামারির সময়ে তাঁদের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা নিয়মিত বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি এবং ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা সন্তানের সঠিক যত্ন নিতে পারেননি।
বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। আলোচকদের ধন্যবাদ জানান প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।