
কাউকে পেছনে রেখে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। দলিত, সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ট্রান্সজেন্ডার, চা–শ্রমিকসহ সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সমাজের অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পাশাপাশি পিছিয়ে পড়াদের অধিকার নিশ্চিতে বৈষম্য বিলোপ আইনটি দ্রুত পাস হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের বাস্তবায়নও জরুরি।
‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এসব কথা বলেন। শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় বৈঠকটির আয়োজন করে ক্রিশ্চিয়ান এইড, নাগরিক উদ্যোগ ও প্রথম আলো।
সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোকে সামনে এগিয়ে নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, এটিই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বা সংবিধানের নির্দেশ। যারা পিছিয়ে পড়েছে, তাদের জন্য আইন করতে কোনো বাধা নেই। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু কাজ হচ্ছে। তবে এসব কাজ আরও ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।
সংখ্যালঘু ও আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘আমরা এক ধরনের বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করছি। অথচ সংবিধানে লেখা আছে, কোনো বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সংবিধান অনুসরণ করলে দেশে সমতাভিত্তিক একটা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠত।’
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, বৈষম্য বিলোপ আইনটি দ্রুত পাস হবে। তিনি বলেন, সমাজে যারা অনগ্রসর আর যারা অতি অনগ্রসর, তাদের সংজ্ঞায়িত করে তথ্য–উপাত্ত ও তালিকা করা প্রয়োজন। সমাজে নানা স্তরের অসমতা, বৈষম্য ও সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠী আছে। এসব স্তরে দ্রুত হস্তক্ষেপ ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের মানসিকতার পরিবর্তন। কারণ, নাগরিক সমাজ যেসব ইস্যু তুলে ধরে, সরকার অনেক সময় মনে করে, এগুলো তাদের ইস্যু নয়। পিছিয়ে পড়াদের অধিক হারে অধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কর্মসূচির ব্যবস্থাপক লায়লা জেসমিন বানু বলেন, সমাজে অনেক ধরনের বৈষম্য আছে। এসব বৈষম্য চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানা দরকার, যাতে বিভিন্ন উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় তাদের বরাদ্দ বাড়ানো যায়।
ক্রিশ্চিয়ান এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর পঙ্কজ কুমার বলেন, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে যখন বিবেচনায় নেওয়া হয় না, তখন পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব নিয়ে যথাযথ আলোচনাও কম হয়। এখন এটি একটি সুযোগ যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে সরকার, এনজিও ও নাগরিক সমাজ কথা বলছে। এসব নিয়ে আরও আলোচনা দরকার।
সামাজিক সম্প্রীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রয়োগ হয় না বলে মন্তব্য করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হচ্ছে, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীগুলোর একেকটির প্রতি আমাদের একেক ধরনের আচরণ। এদিকে বৈষম্য বিলোপ আইনটি খসড়া হলেও এখনো পাস হয়নি। আইনটি হয়তো পাস হবে। তবে এটি যাতে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও দেখতে হবে।’
বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের (বিডিইআরএম) সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমার ভক্ত বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় দলিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। নানা সমস্যায় জর্জরিত দলিতরা। আমাদের পক্ষ থেকে কথা বলার লোকও কম। আমরা চাই, দ্রুত বৈষম্য বিলোপ আইনটি পাস হোক।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি সবাই সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু সমান মনে করে না। আর তখনই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রাম হয়। এখানে বৈষম্যকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আইন কতটা জনমুখী হবে, সেটিও একটি ব্যাপার।
নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি না দিলে তারা ক্ষমতায়িত হবে না। তাদের ক্ষমতায়নের জন্য আগে চিহ্নিত করা জরুরি। ট্রান্সজেন্ডার, দলিত, চা–শ্রমিক—এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ কত, তাদের জন্য বাজেট কত, তাদের কাকে কী নামে ডাকা হবে, এসব নির্ধারণ করা দরকার।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উপদেষ্টা মো. তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আইন ও নীতিমালাগুলোর মধ্যেও অনেক বৈষম্যের জায়গা রয়েছে, যেগুলো এখনো রাষ্ট্র বা নীতিনির্ধারকদের দ্বারা চিহ্নিত করা যায়নি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলো যে বৈষম্যের শিকার, তা বিদ্যমান আইনের অনেক জায়গায় আছে।
বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহ আহমেদ বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বাজেট থাকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য। তবে কষ্টের কথা হলো, এই বাজেটের আগে কোন খাতে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে প্রক্রিয়ায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষের অংশগ্রহণ থাকে না। যাদের জন্য প্রকল্প, তাদের শুরু থেকে পরিকল্পনায় নেওয়া উচিত। বৈষম্য বিলোপ আইনটি দ্রুত পাস হওয়া দরকার।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতি মানসিকতার পরিবর্তন করার আহ্বান জানিয়ে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, তাদের সমান অধিকার দিতে হবে। সেখানে সরকারের ভালো ভূমিকা, ভালো আইন দরকার হবে। অংশীজনদের কথা শুনতে হবে। সমান বা একটু সুযোগ পেলেই পিছিয়ে পড়া মানুষেরাও যে অনেক ভালো করেন, তার অনেক উদাহরণ আছে।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্রিশ্চিয়ান এইডের জেন্ডার অ্যান্ড ইনক্লুশনের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ফারহানা আফরোজ। বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।