এফসিডিওর সহায়তায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর আয়োজনে ‘সহিসংতা নয়, গড়ি সম্প্রীতির চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গোলটেবিল নির্বাচনী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ চট্টগ্রামের একটি অভিজাত হোটেলে।
শাহাদাত হোসেন, মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
ম্যাম্যানু মারমা, জেলা পরিষদ সদস্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী; সভাপতি, জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দল।
শফিউল আলম, চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, বিএনপি।
জোবাইরুল হাসান আরিফ, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, এনসিপি।
দীপা মজুমদার, চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী,
বাসদ (মার্ক্সবাদী)।
মুহাম্মদ জান্নাতুল ইসলাম, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
জাহিদুল আলম আল জাহিদ, চট্টগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, গণ সংহতি আন্দোলন। আবুল মোমেন, লেখক ও সাংবাদিক।
দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, সভাপতি, সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চট্টগ্রাম।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সাধারণ সম্পাদক (কেন্দ্রীয় কমিটি), কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। সায়মা আলম, সহকারী অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো।
সদরুল আমিন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরামর্শক, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল।
সঞ্চালনা:
ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো
শাহাদাত হোসেন
মেয়র, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
আমি মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণের সময় চারটি স্লোগান দিয়েছিলাম—পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ শহর। নিরাপদ শহর মানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে সহমত এবং সংহতির সঙ্গে থাকতে পারবে, কোনো সহিংসতা হবে না।
গত ১৬ বছরে আমরা ভোটাধিকার হারিয়েছি; জেল, মামলা, নির্যাতন সহ্য করেছি। তাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত—নির্বাচনকে আনন্দের উৎসবে পরিণত করা। আমাদের দেশের নির্বাচনের পরিবেশকে উৎসবমুখর করা এখন অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রীতির নির্বাচন মানে কেবল ভোটারসংখ্যা নয়, মানুষের মানসিক নিরাপত্তা। ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য আমাদের উৎসবমুখর পরিবেশ দরকার—যেখানে শিশু, নারী ও বয়স্ক সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারবে।
নির্বাচন কেবল ভোট নয়, এটি আমাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের প্রতীক। চট্টগ্রামে সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। উৎসবমুখর নির্বাচন মানে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ ভোটদান, যেখানে বিজয়ী হোক বা পরাজিত, সবাই একসঙ্গে এই শহরের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে।
ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য আমাদের যদি সম্প্রীতির জায়গায় আসতে হয়, তাহলে উৎসবমুখর পরিবেশ লাগবে। সব রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধ করব, ঘোষণা দিন, ‘উৎসবমুখর পরিবেশ চাই, সুন্দর নির্বাচন চাই’। এটাই হোক আমাদের লক্ষ্য, এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। আমরা ঈদের মতো একটা পরিবেশ ভোটের দিন চাই। এটা যদি আমরা করতে না পারি, তবে আবারও সহিংসতার দিকে দেশ যাবে। তাই প্রত্যেক প্রার্থী ও ভোটারের কর্তব্য হলো সেই উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে চট্টগ্রাম প্রমাণ করে—নির্বাচন হতে পারে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধ।
ম্যাম্যানু মারমা
জেলা পরিষদ সদস্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলা
পার্বত্য জনপদে যে কথাগুলো আমরা প্রতিনিয়ত শুনি, তার একটি বড় অংশই নির্বাচনী আতঙ্ক ঘিরে। পার্বত্য অঞ্চলে জেলা পরিষদকে এখন অনেকটা অভিভাবক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। সেই জায়গা থেকে মানুষ আমাদের কাছে জানতে চায়—এই নির্বাচনে তারা নিরাপদে ভোট দিতে পারবে কি না।
পাহাড়ে সংকট নতুন কিছু নয়। গণমাধ্যমে প্রায়ই আমরা দেখি সংঘাত, অস্থিরতা বা নানা ঝামেলার খবর।
এসব বাস্তবতার মধ্যেই এবার জাতীয় নির্বাচন সামনে এসেছে। তাই মানুষের মনে সংশয় থাকা অস্বাভাবিক নয়। বান্দরবানের অনেক ইউনিয়ন ও পাড়ায় এখনো সড়ক নেই। এসব এলাকায় যাতায়াত কঠিন। মানুষের ভয় এখানেই—যদি ভোটকেন্দ্রে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তাহলে বার্তা যাবে কীভাবে? নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কাছেও তাৎক্ষণিক খবর পৌঁছাবে কীভাবে? আমার প্রস্তাব, নির্বাচনী সময়ে যেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক নেই, সেখানে অস্থায়ী মোবাইল সংযোগের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্টারলিংক বা বিকল্প কোনো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক দিয়ে, নির্বাচনের আগে-পরে কয়েক দিনের জন্য চালু রাখা যেতে পারে। এতে দুর্গম এলাকার মানুষ অন্তত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বার্তা দ্রুত পৌঁছে দিতে পারবে।
অনেক সময় দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের দিন বয়স্ক বা দূরবর্তী এলাকার মানুষকে কেন্দ্রে আনার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করে দেয়। এতে মানুষ প্রভাবিত হতে পারে। তাই পরিবহনের সুবিধা রাজনৈতিক দল নয়, বরং সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া উচিত।
নির্বাচন কমিশন এবং সরকার—উভয়কেই পাহাড়ি দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষায়িত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে মানুষ নিরাপদ বোধ করবে। পাহাড়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সাঈদ আল নোমান
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী;
সভাপতি, জাতীয়তাবাদী পাট শ্রমিক দল
রাজনীতিবিদের ভাষায় সম্প্রীতি, সৌন্দর্য ও নম্রতা থাকা জরুরি। সম্প্রীতি শব্দটি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সমাজে বৈচিত্র্য থাকে। সেটি ধর্মীয় বৈচিত্র্য হতে পারে কিংবা মানুষে মানুষে শ্রেণিগত বৈচিত্র্যও হতে পারে। উন্নত সমাজেও সাম্য বা ন্যায়বিচার নিখুঁত হয় না, কিন্তু ভিন্নতার মাঝেও সুন্দরভাবে টিকে থাকার প্রচেষ্টা থাকে। তাই সম্প্রীতি টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সংস্কৃতি ও খেলাধুলার চর্চা বাড়াতে হবে।
সংস্কৃতিচর্চা মানুষকে ভিন্ন চিন্তার মানুষের সঙ্গে পরিচিত করে। এই পরিচয়ই মানুষকে ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করতে শেখায় এবং সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করে। তাই এমন প্ল্যাটফর্ম ফেরত আনা দরকার, যেখানে সব ধর্ম ও চিন্তার মানুষ মিলিত হতে পারে।
সহিংসতার সমাধান তখনই সম্ভব হবে, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় থাকা প্রার্থীরা দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করবেন। শুধু নির্বাচনের সহিংসতা নয়, দেশের সামগ্রিক সহিংসতা দূর করার কথাও আমাদের ভাবতে হবে। ৫৪ বছরে অনেক সমস্যা জমে গেছে, যার সমাধান সহজ নয়, কিন্তু শুরুটা আমাদেরই করতে হবে।
আমি সর্বদলীয় ও সব মতের মানুষের অংশগ্রহণে কাজ শুরুর কথা বলে থাকি, যাতে একচোখা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হওয়া যায়। যদি আমি বিজয়ী হই, নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যাগুলো আগামী রাষ্ট্রনায়কের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব আমার। কিছু বিষয়ে আমরা সবাই একমত হতে পারি, যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। আর্থিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সহিংসতার পরিবর্তে সম্প্রীতির চট্টগ্রাম গড়তে হলে আবার সত্তর-আশির দশকের সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা ফিরিয়ে আনা জরুরি। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মনস্তত্ত্ব বুঝতে হবে এবং তাদের আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে বলব, আমরা যদি সহনশীল হই এবং পরস্পরকে সম্মান করি, তাহলে একটি মানবিক সমাজ গড়া সম্ভব। মানবিক সমাজ ছাড়া সম্প্রীতি টেকে না।
শফিউল আলম
চট্টগ্রাম–১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ও সংশয় তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ভোটাধিকার, গণতন্ত্রের পথচলা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব। অতীতের নানা অনিয়ম, ভোটাধিকার হরণ, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলঙ্কিত করেছে। এই সবকিছুর পরও আগামী নির্বাচন একটি সুযোগ। দীর্ঘদিনের ক্ষত মুছে নতুনভাবে এগোনোর সুযোগ।
এবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের প্রতিশ্রুতি, ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়া। কিন্তু সংশয়ও কম নয়, কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে এখনো সমালোচনা গ্রহণের পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ভারতে আমরা যেভাবে সংসদীয় বিতর্কের পরিপক্বতা দেখি, বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। জাতীয় স্বার্থে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সমন্বয়, সংযম ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, কালোটাকা—এসব নির্বাচনকে দূষিত করে। চট্টগ্রামের প্রসঙ্গ এলে দেখা যায়—জলাবদ্ধতা, সিটি করপোরেশনের প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যর্থতা, সংস্থাগুলোর অদক্ষতা—এসবই নেতৃত্বের ঘাটতির প্রতিফলন। অথচ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের সম্ভাবনা বিশাল। নির্বাচনী সম্প্রীতি ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই আগে স্বচ্ছ হতে হবে।
সবশেষে বলব, জনগণের ওপর আস্থা হারালে গণতন্ত্র চলে না। সহিংসতা, বিদ্বেষ বা উসকানিমূলক ভাষা নির্বাচনী পরিবেশকে দুর্বল করে। বিশেষ করে নারী ভোটকর্মী বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে হুমকি দেওয়া—এটি জেন্ডারভিত্তিক অপরাধ এবং অগ্রহণযোগ্য।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৎ ও দায়িত্বশীল হলে নির্বাচন স্বচ্ছ হবে, জনগণ আস্থা ফিরে পাবে। দল–মতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে সবার ভূমিকা রাখা জরুরি।
আবু সুফিয়ান
চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী,
বিএনপি
রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হওয়া উচিত—কীভাবে সত্যিকারের সম্প্রীতিময় চট্টগ্রাম গড়ে তোলা যায়। সম্প্রীতির ভিত্তি হলো সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। অতীতে যা হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না—এমন নৈরাশ্যবাদে আমি বিশ্বাস করি না। আমরা যদি এ দুটি মূল্যবোধ নিশ্চিত করতে পারি, সম্প্রীতির চট্টগ্রাম গড়া কঠিন কিছু নয়।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কথা হচ্ছে, সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ও মানুষের অধিকার রক্ষা করা—আমাদের সেই পথে এগোতে অনুপ্রাণিত করে। তরুণ প্রজন্ম ভোট দেওয়ার আশায় আছে।
আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার একটি মাইলফলক হতে পারে। কিন্তু যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হয়, সহিংসতামুক্ত না হয়, উৎসবমুখর পরিবেশে না হয়—তাহলে এটি আমাদের জাতীয় জীবনে বড় ব্যর্থতা হয়ে ধরা দেবে।
আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণের প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্বেগ। তাঁরা প্রশ্ন করেন, ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না। আমরা আশ্বস্ত করি, কিন্তু চূড়ান্তভাবে এটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের। আমরা চাই প্রশাসন সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সম্প্রীতিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আমাদের প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট—শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে আমরা সহিংসতা পরিহার করব, মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করব, একে অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাব। সম্প্রীতির চট্টগ্রাম নয়, আমরা সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চাই—যে স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের আত্মত্যাগে আরও দৃঢ় হয়েছে।
জোবাইরুল হাসান আরিফ
চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী,
এনসিপি
গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। দীর্ঘদিন পর আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছি। জীবনে এটিই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ। একই সঙ্গে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছি—এ অভিজ্ঞতা অদ্ভুত আনন্দ ও বিস্ময়ের।
নির্বাচন একধরনের উৎসব। দেশজুড়ে সেই উৎসবের আবহ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের ভূমিকা ঠিকভাবে পালন করছে কি না।
সম্প্রীতির চট্টগ্রাম নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। চট্টগ্রাম-৮ আসনের কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করা দরকার। গণসংযোগে গিয়ে কর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো অমীমাংসিত।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। আমার নিজের ক্ষেত্রেও প্রচারকালে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাকে ফোন করেও অনেক সময় পাওয়া যায় না—এ অবস্থায় জরুরি মুহূর্তে তাঁরা কীভাবে ব্যবস্থা নেবেন, সেটাই প্রশ্ন।
আমি মনে করি, সম্প্রীতির চট্টগ্রাম নির্মাণ করতে হলে সব দলের ভেতরেই গণতান্ত্রিক মনোনয়নপ্রক্রিয়া ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটা বিএনপি
হতে পারে, জামায়াতে ইসলামী হতে পারে, এনসিপি হতে পারে। একই সঙ্গে ইসিকে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন করতে হবে, যাতে তারা দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি একটি ভালো নির্বাচন চাই, কিন্তু বাস্তবতা দেখে শঙ্কা জাগে—আমার আসনে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ইতিমধ্যেই ঘটেছে। তাই উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
দীপা মজুমদার
চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী, বাসদ (মার্ক্সবাদী)
আমরা যাঁরা গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী, সাধারণ নাগরিক—সবাই একটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসতেই পুরোনো রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির চর্চা আমরা আবারও দেখতে পাচ্ছি। চট্টগ্রামে গত চার মাসে অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ—এসব ঘটনা আমাদের আরও অনিরাপদ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ও ভৌগোলিক অঞ্চল। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাই মিলে সম্প্রীতির এক সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরি করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নেমে আমরা দেখেছি, সাধারণ মানুষ এখনো সেই সম্প্রীতিকে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু রাজনৈতিক সহিংসতা এই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বহু এলাকায় বিশেষ করে সংখ্যালঘু পাড়া-মহল্লায় হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তখন মুসলিম ও হিন্দু তরুণেরা একসঙ্গে মন্দির-মসজিদ পাহারা দিয়েছেন—এটাই আমাদের আসল সমাজব্যবস্থা।
সংখ্যালঘু এলাকায় গেলে অনেকেই একধরনের অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন—আসলেই কি ভোট নিরাপদ হবে? এখন প্রার্থীদের দায়িত্ব হলো ভোটারদের আশ্বস্ত করা যে নির্বাচনে ভোট দেওয়া নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে বড় দলের প্রতি বিশেষ সুবিধা না দিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। গণমাধ্যম ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো পক্ষপাত এড়িয়ে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা।
মুহাম্মদ জান্নাতুল ইসলাম
চট্টগ্রাম–১০ আসনের প্রার্থী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রার্থীরাই প্রধান ভূমিকা রাখেন। প্রার্থীরা যদি নিজ দলের কর্মীদের বলেন—সহিংসতা করা যাবে না, কারও ব্যানার ছেঁড়া যাবে না, কারও মিছিলে বাধা দেওয়া যাবে না—তাহলেই শান্তি বজায় রাখা সম্ভব। প্রার্থীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলে—আমরা সহিংসতায় জড়াব না, যিনি জয়ী হবেন তাঁকে স্বাগত জানাব—তাহলে খারাপ পরিস্থিতিও সামাল দেওয়া যায়।
আমরা যাঁরা প্রার্থী, নির্বাচনী সহিংসতা কমাতে কী করতে পারি—এ প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, আমাদের নিজেদের নেতা–কর্মীদের সচেতন করাই প্রথম কাজ। এখন নির্বাচনের মাঠে সবাই সমান। কে বড় দল, কে ছোট দল—তা নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে। এখন জোটের রাজনীতি চলছে, তাই জোটের প্রার্থীর ব্যক্তিগত কোনো ভোট নেই।
আজ কাঁচা রাস্তা এলাকা থেকে আমার তিনটি ব্যানার কেটে নেওয়া হয়েছে। কর্মীরা জানালে আমি তাঁদের ধৈর্য ধরতে বলেছি। আমি পাল্টা আরও ব্যানার কাটার নির্দেশ দিইনি। বরং প্রার্থী বা দলীয় প্রধানের সঙ্গে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে চাই। আমি সেই দলের প্রার্থীকে বলব—আপনারা কর্মীদের আরও সহনশীল হতে বলুন।
চট্টগ্রামকে আমরা এমন পরিবেশে গড়ে তুলতে চাই, যাতে এটি সারা দেশের জন্য মডেল হয়। দেশে কোথাও সহিংসতা হলেও চট্টগ্রাম যেন শান্তির উদাহরণ হয়ে থাকে—এই প্রত্যাশা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি।
জাহিদুল আলম আল জাহিদ
চট্টগ্রাম–৪ আসনের প্রার্থী, গণসংহতি আন্দোলন
নির্বাচনী প্রচারণায় বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা মাঠে আছেন। কিন্তু বড় দলগুলো বিশাল লোকবল, শোডাউন এবং নানা প্রদর্শনী নিয়ে মাঠে নেমে যে উত্তেজনা তৈরি করে, তাতে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। সহিংসতা শুধু ঘটনার পরে সংবাদে ওঠে—কিন্তু সহিংসতার ভয়, মানুষের স্বাধীনতা সংকুচিত করে রাখা—সেটিও তো সহিংসতারই অংশ।
আজকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি কারা হয়, যারা কথা দিয়ে সবাইকে আঘাত করতে পারে। প্রচারণায় সর্বোচ্চ পাঁচজন থাকার কথা বলা হলেও বড় প্রার্থীদের পাঁচ হাজারের কম দেখা যায় না। গাড়িবহর থাকে শত শত। এতে কোথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড? সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া কেউ টের পাবে না। রাজনৈতিক ধারার যে পতন-পুনরাবৃত্তি, আমরা কি আবার সেখানেই ফিরে যাব?
সমাধানের পথ মিডিয়ার মধ্যেই নিহিত। মিডিয়া যদি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে, রাষ্ট্রকে আয়নায় দেখানোর দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে দেশের চিত্র বদলাতে পারে। অনেক গুরুতর দুর্ঘটনা বা অনিয়ম আলোচনার বাইরে থাকে—এগুলো সামনে আনতে পারলেই জবাবদিহি তৈরি হবে। টিআরপি-নির্ভর উসকানিমূলক কনটেন্টকে যদি অগ্রহণযোগ্য বানানো যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়, তবে নির্বাচনী পরিস্থিতি সহজ হবে।
আবুল মোমেন
লেখক ও সাংবাদিক
দেড়-দুই বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক আমি দেখি—মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। সবাই চাইছে একটি নির্বাচন হোক। এটিই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমরা বলছি, সহিংসতা নয়, সম্প্রীতির চট্টগ্রাম; আরও বড় অর্থে, সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে মূল ঘাটতি হলো রাজনৈতিক দলগুলোর ন্যূনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে। দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভাব, সমাজে গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব। অফিসে, দলে, পরিবারে—সর্বত্র অটোক্রেটিক আচরণ। এর ফলে মানুষের মধ্যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, অবিশ্বাস বেড়েছে, নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। একটি ক্ষতবিক্ষত সমাজে ক্রোধ জমতেই থাকে—জুলাইয়ের ছাত্র–অভ্যুত্থানও সেই দীর্ঘদিনের অপমানের প্রতিক্রিয়া।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজকে ক্ষতমুক্ত করা ও মানুষকে আশ্বস্ত করা যে মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই কর্মসূচির প্রতিফলন কম; বরং উত্তেজনাকর ও বিরুদ্ধতামূলক ভাষাই বেশি দেখা যায়।চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে বলতে হয়, একসময় চট্টগ্রাম ছিল দেশের অগ্রগামী কেন্দ্র; আজ তা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। যাঁরা নির্বাচিত হবেন—সরকার বা বিরোধী যেই হোন, চট্টগ্রামকে শক্তিশালী দ্বিতীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া এই সংকটের সমাধান হবে না।
দেলোয়ার হোসেন মজুমদার
সভাপতি,
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চট্টগ্রাম
সহিংসতার বিপরীতে সম্প্রীতির যে বাংলাদেশ আমরা চাই, সেটি গড়ে তুলতে হলে গণতান্ত্রিক চর্চাই হতে হবে ভিত্তি। চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটকে জাতীয় কাঠামো থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। চট্টগ্রামের সংকট ও সম্ভাবনার সঙ্গে রাষ্ট্রের নীতি সরাসরি যুক্ত। চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে জাতীয়ভাবে আমরা কোন মূল্যবোধে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাই, তার ওপর।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; বিরোধী মতের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাই তার মূল শক্তি। অগণতান্ত্রিক পরিবেশে সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির নগরী হিসেবে পরিচিত। দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানকার নির্বাচনী পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত থাকে। তবু সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অসহিষ্ণুতা চট্টগ্রামেও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য ধর্মীয় সম্প্রীতি। মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডার এই সহাবস্থান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচেতনা দৃঢ় করা গেলে সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা একই সঙ্গে কমে যাবে।
আমাদের প্রত্যাশা—সব রাজনৈতিক দলই সংযম দেখাবে এবং নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখবে। বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষই জনগণের প্রতিনিধি—এই মানসিকতা রাজনীতিকে সম্প্রীতির পথে এগিয়ে নিতে পারে। সারা দেশে গণতন্ত্র দৃঢ় হতে হলে চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
সাধারণ সম্পাদক (কেন্দ্রীয় কমিটি),
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি
বাংলাদেশে চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আমাকে গভীরভাবে ভাবায়, বিশেষ করে যখন দেখি নির্বাচনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সহিংসতার ভয়ে বারবার বিপর্যস্ত হয়।
আমি অনেক বছর ধরে নির্বাচনকে কাছ থেকে দেখেছি; সত্তরের দশক থেকে ছাত্র হিসেবে, পরে শিক্ষক ও নাগরিক হিসেবে। এত অভিজ্ঞতার পরও আজ বলতে হচ্ছে—নির্বাচন আমাদের দেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ উৎসবমুখর হতে পারেনি; বরং সহিংসতা ও ভয়ভীতিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি বদলানো এখন অত্যন্ত জরুরি।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সহিংসতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না; এটি অনেক সময় ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক যে সহিংসতা দেখা গেছে, সেগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আমি মনে করি, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থানে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ, নির্বাচন শুধু প্রার্থীর লড়াই নয়, এটি জনগণের অধিকার ও সম্মিলিত সম্প্রীতির প্রতীক।
আমি বিশ্বাস করি, একটি সহিংসতামুক্ত, সম্প্রীতিময় চট্টগ্রাম গড়তে হলে নির্বাচনকে প্রথমেই নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করতে হবে। রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক—সবার দায়িত্ব একটাই: নির্বাচনের উৎসবকে রক্ষা করা। এ দায়িত্ব আমরা নিতে না পারলে সহিংসতার শিকড় আরও গভীরে প্রবেশ করবে।
সায়মা আলম
সহকারী অধ্যাপক,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমরা নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে আছি আর চারপাশে নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। এ সহিংসতার বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক ঘটনার বিবরণ নয়; এটি ভয়, অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি করে।
যখন যুক্তির জায়গা সংকুচিত হয়, যখন কথোপকথন ও ভিন্নমতের আদান-প্রদানের পথ বন্ধ হয়ে আসে, তখনই সহিংসতার জন্ম হয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বদলে যায় শত্রুতায়, বিতর্ক বদলে যায় হুমকি-ভীতিতে। এ ভয়কে কেউ কেউ কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করেন। ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা—এটাই হচ্ছে নির্বাচনী সহিংসতার মূল স্রোত।
এ সহিংসতার আরেকটি উৎস হলো রাজনৈতিক ভাষা। আজকাল আমরা দেখি, ভাষার ‘ধার’ই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই ধার কখনো কখনো ঘৃণা, উত্তেজনা ও সংঘাতের জন্ম দেয়। রাজনীতিতে ভাষা হওয়া উচিত যুক্তির, মানবিকতার, শ্রদ্ধার। কারণ, রাজনৈতিক ভাষা নাগরিককে বিভক্তও করতে পারে, আবার একই সঙ্গে সম্প্রীতির সেতুও গড়তে পারে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই, চট্টগ্রামে যেন এমন ভয় বা চাপের কোনো পরিবেশ তৈরি না হয় আর রাজনৈতিক দলগুলো যেন সে ব্যাপারে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়।
সদরুল আমিন
চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরামর্শক,
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের আলোচনায় মাননীয় মেয়রসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সবাই আজ একই মঞ্চে এসে যে বিষয়টি একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, তা হলো—সম্প্রীতি, শান্তি ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশা। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সংলাপে আমরা আলোচকদের বিভিন্ন অভিমত শুনেছি।
চ্যালেঞ্জ আছে, সংশয়ও রয়েছে—এ কথা সবাই স্বীকার করেছেন। তবে দিনের শেষে আশার জায়গাটিও স্পষ্ট হয়েছে: আগামী নির্বাচন যেন সহিংসতামুক্ত হয় এবং চট্টগ্রাম সম্প্রীতির শহর হিসেবে সামনে এগোয়—এ বিষয়ে সবাই একমত।
আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যদি স্থানীয় পর্যায়ে কোনো উত্তেজনা বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে মাঠপর্যায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বদলে নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা যেতে পারে। এতে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব—এটি আমাদের সব আলোচকেরই অভিন্ন মত। রাজনৈতিক নেতারা যদি এই নীতি অনুসরণ করেন, তবে অবশ্যই অনেক সংকট আগে থেকেই ঠেকানো যাবে।
আজকের এই আয়োজনে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা, প্রার্থী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। আশা করি, আগামীর কোনো কর্মসূচিতে আবার একসঙ্গে দেখা হবে।
চট্টগ্রামের নির্বাচন উৎসবমুখর ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের নেতাদের।
স্থানীয় সংঘাত বা উত্তেজনা হলে নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনা করে তা দ্রুত সমাধান করা।
গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করে মিথ্যা তথ্য ও গুজব প্রতিরোধ করা।
চট্টগ্রামে অসাম্প্রদায়িক সহনশীলতা ও সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা।
নির্বাচনের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে সম্প্রীতির ও শান্তিপ্রিয় নগরী হিসেবে প্রদর্শন করা।