
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার কিশোরী ও যুব নারীদের নেতৃত্ব, সক্ষমতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। ‘দুর্বার কন্যা’ নামে এই কর্মসূচির লক্ষ্য দেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের জলবায়ুদূত (ক্লাইমেট অ্যাম্বাসেডর) হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় জলবায়ুঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করবেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘দুর্বার কন্যা প্রোগ্রাম মডেল’ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কিশোরী ও তরুণদের নেতৃত্ব নতুন গতি আনতে পারে। তিনি বলেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিখেছেন, জনসচেতনতা ও সোচ্চার অবস্থান থাকলে সরকারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য হয়। তাঁর ভাষায়, ‘তরুণেরা যদি উদ্যোগ নেয়, সরকার শুনতে বাধ্য।’
প্রতিমন্ত্রী জলবায়ু অভিযোজন ও প্রকৃতিনির্ভর সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির পাশাপাশি ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা নিতে হবে। দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটকে এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম। শিল্পকারখানার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার কাজ শুরু করেছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করতে তরুণদের, বিশেষ করে কিশোরীদের, সক্রিয় অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘শুধু অবকাঠামো ও প্রযুক্তি দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সচেতন, দক্ষ ও ক্ষমতায়িত মানুষ, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া নতুন নতুন ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিরোধ ও নানা সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার অদম্য গল্প তুলে ধরেন চার ‘দুর্বার কন্যা’ প্রতিনিধি। এর মধ্যে ভোলার ফারজানা, বরগুনার উম্মি আক্তার ও ইসরাত জাহান স্বর্ণা এবং খুলনার সাথী তরফদার সামনের দিনেও নিজেদের কাজ অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, ‘জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের, বিশেষ করে যুব নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং জলবায়ু কর্মকাণ্ডে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, শক্তিশালী ও টেকসই কমিউনিটি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘দুর্বার কন্যা প্রোগ্রাম মডেলের’ ধারণা তুলে ধরে দেওয়া বক্তব্যে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না; উপকূলের কিশোরী, চরাঞ্চলের কৃষক কিংবা হাওরের নারীরা ভিন্ন ভিন্নভাবে এই সংকটের মুখোমুখি হয়। তাই বাস্তবতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক শ্যারন কেইন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্বলতার কথাই বেশি উঠে এসেছে; তবে এখন সময় এসেছে তাঁদের নেতৃত্ব ও সমাধান তৈরির সক্ষমতাকে সামনে আনার। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংকটের মধ্যেও সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের অন্তর্ভুক্তিমূলক সহনশীলতা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্সের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুল হাসান শাওন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ধরিত্রী কুমার সরকার। এতে উপস্থিত ছিলেন জার্মান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি ও ডেপুটি হেড অব ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন জ্যানিস হুসাইন।