ওয়াটারএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘পানি নিরাপত্তা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে। এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে সুইজারল্যান্ড সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ওয়াটারএইড ও সুইসকন্টাক্ট কনসোর্টিয়ামের ‘গো–ফর–ইমপ্যাক্ট’ কর্মসূচি। গোলটেবিল বৈঠকে টেকসই, জলবায়ুসহিষ্ণু পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার কাজের মধ্যে সমন্বয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
হাসান জাফির তুহিন
চেয়ারম্যান, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)
বাংলাদেশের একেক অঞ্চলের পানির সমস্যা একেক রকম। বরেন্দ্র অঞ্চল, পাহাড়, উপকূল, শহর ও হাওরের বাস্তবতাও আলাদা। কিন্তু এসব সমস্যা মোকাবিলায় আমাদের কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। দেশে যেসব পরিকল্পনা হয়, সেগুলোও বেশির ভাগ স্বল্পমেয়াদি। দুই বা পাঁচ বছরের পরিকল্পনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর ঘাটতি রয়েছে।
বরেন্দ্র এলাকায় সেচসুবিধা বাড়াতে বিএমডিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উত্তরবঙ্গে দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ ছিল পানির অভাব। পানির প্রাপ্যতা অনেকটা নিশ্চিত হওয়ায় সেখানে দারিদ্র্যও কমেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) বরেন্দ্র এলাকার বড় একটি অংশকে পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হবে।
আমাদের বৃষ্টির পানি যথাযথভাবে ভূগর্ভে পুনর্ভরণ হচ্ছে না। ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। আবার বর্ষায় অতিরিক্ত পানিও সমস্যা তৈরি করছে। এ অবস্থায় পানিনিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো আইন করার আগে তা বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধের উদ্যোগ বাস্তবসম্মত হবে না। কৃষি, পানি ও পরিবেশ–সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সাইফুল ইসলাম মজুমদার
যুগ্ম সচিব, পলিসি সাপোর্ট অধিশাখা, স্থানীয় সরকার বিভাগ
নিরাপদ পানি সরবরাহ স্যানিটেশন ও হাইজিন নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাজ রয়েছে। দেশের পানি খাত এখনো অনেকাংশে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। পানি ব্যবহারের প্রায় ৯০ শতাংশ যায় কৃষিতে, ৮ শতাংশ সুপেয় পানির খাতে এবং ২ শতাংশ শিল্পে। কৃষিতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি ব্যবহার নিয়ে আমরা কথা বলি। একইভাবে তৈরি পোশাক খাতেও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার রয়েছে। এসব ব্যবহারের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়েও পানির অপব্যবহার যথেষ্ট হচ্ছে।
পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পানির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু একটি খাতের ব্যবহার কমিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। কৃষি, শিল্প, সুপেয় পানি ও ব্যক্তিপর্যায়; সব ক্ষেত্রেই পানির সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার ও অপচয় কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন খুবই জরুরি।
পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বশীল ও সাশ্রয়ী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পানির সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। তাই পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানির সঠিক ব্যবহার, অপচয় রোধ এবং আচরণগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এস এম যোবায়দুল কবির
যুগ্ম প্রধান, ডেলটা উইং, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন
বাংলাদেশের মোট পানিপ্রবাহের প্রায় ৯১ শতাংশই দেশের সীমানার বাইরে থেকে আসে। অর্থাৎ আমাদের পানির বড় একটি উৎস আন্তসীমান্ত। এ কারণে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির এই প্রবাহ ও ব্যবস্থাপনাকে তাই শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আমার কাছে প্রশ্নটি শুধু কত পানি আসছে, তা নয়; কখন এবং কতটুকু পানি আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেখতে হবে, সেই পানি কতটা নিরাপদ, কৃষির জন্য কতটা উপযোগী এবং পানির প্রবাহে কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব ভাটির মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর কী পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এসব বিষয়কে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। পানির প্রাপ্যতা, প্রবাহ, গুণমান ও ব্যবহার—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে আন্তসীমান্ত পানির ক্ষেত্রে উজান ও ভাটির বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে পানির পরিমাণের পাশাপাশি এর গুণমান ও প্রবাহের পরিবর্তনও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। তাই বাংলাদেশের পানিনিরাপত্তার জন্য আন্তসীমান্ত পানির বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকে এগোতে হবে।
শিরিন লিরা
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, গভর্ন্যান্স ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, এম্বেসি অব সুইজারল্যান্ড ইন বাংলাদেশ
পানি নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখতে হবে। সুইজারল্যান্ডের কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শুধু আইন ও নীতি তৈরি করলেই হয় না; সেগুলোর স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কমিটি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বরেন্দ্র ও সাতক্ষীরায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক আদিবাসী অঞ্চলে পুকুর বা জলাশয় থাকলেও পাশে বসবাসকারীদের তাতে কোনো অধিকার থাকে না। সাতক্ষীরায় লবণাক্ত পানির কারণে নারী ও প্রান্তিক মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই পানির সমতাভিত্তিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
পানি ব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোর পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকিতে অর্থায়ন প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট থাকা দরকার। আইন ও নীতিতে দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সম্পৃক্ততা, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
আজমান আহমেদ চৌধুরী
কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
পানি নিরাপত্তা শুধু পানির প্রাপ্যতা বা পর্যাপ্ততার বিষয় নয়; নিরাপদ, মানসম্মত, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই পানির প্রাপ্তিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৯৯ শতাংশ মানুষের মৌলিক পানীয় জলের সুবিধা থাকলেও ৪০ শতাংশ মানুষ নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
উপকূলে লবণাক্ততা, হাওর ও খরাপ্রবণ এলাকায় পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শহরাঞ্চলেও জনসংখ্যার চাপ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট ও দূষণ বড় সমস্যা। তাই নিরাপদ পানি সরবরাহকে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। পানির উৎস ও ভূগর্ভস্থ জলাধারের স্থায়িত্ব, নদী-খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। স্থানীয় সরকার ও জনগণকে পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, কার্যকর সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই পানি নিশ্চিত করা সম্ভব।
আনোয়ার জাহিদ
সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড
আমরা এখন এমন এক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের চেয়ে উত্তোলন বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য নিয়ে করা গবেষণায় আমরা দেখেছি, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে আমরা যে পানি ব্যবহার করি, তার প্রায় ৮০ শতাংশই আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে। প্রতিবছর ভূগর্ভে নতুন করে পানি যোগ হয় প্রায় ২১ বিলিয়ন ঘনমিটার, অথচ আমরা তুলছি প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ঘনমিটার। ফলে পানির সংকট ধীরে ধীরে বাড়ছে।
পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল পানির চেয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বেশি জরুরি। পানি আইনে পানীয় ও গৃহস্থালি ব্যবহার, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অথচ ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও শিল্প স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তাই পানির প্রাপ্যতা বিবেচনায় শিল্পাঞ্চল নির্ধারণ করা জরুরি।
পানি আইনে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের কথা থাকলেও সেগুলো কার্যকর নয়। ইউনিয়নে কতটুকু ব্যবহারযোগ্য পানি আছে এবং চাহিদা কত—সেই হিসাব করে পানি বণ্টন করতে হবে। প্রয়োজনে বৃষ্টির পানি, ভূপৃষ্ঠের পানি ও ভূগর্ভস্থ জলাধারে পরিকল্পিতভাবে পানি পুনর্ভরণ কাজে লাগাতে হবে। এসব উদ্যোগে আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি। সংস্থাগুলো আলাদাভাবে নয়, নিজেদের অভিজ্ঞতা ও তথ্য ভাগ করে সমন্বিতভাবে কাজ করলেই পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মোহাম্মদ আলমগীর
মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পিএসও), পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো)
পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যকর করাও জরুরি। পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা পানিসম্পদ নিয়ে নীতি, পরিকল্পনা, কৌশল ও আইন প্রণয়নে কাজ করে। জাতীয় পানিনীতি ও পানি আইনে সুপেয় পানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গৃহস্থালি, কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের পানির চাহিদাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
আমরা ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করেছি, যাতে তৃণমূল থেকে পানি ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। তবে এসব ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। পানি সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিত করাও জরুরি। বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জেলায় গবেষণায় প্রায় ৪৭ শতাংশ এলাকাকে উচ্চ পানি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করে ২০২৫ সালে গেজেট করা হয়েছে। সেখানে নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির যৌথ ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সারা দেশে পানির প্রাপ্যতা ও নিরাপদ উত্তোলনসীমা নির্ধারণের কাজ চলছে। নলকূপে সেন্সর স্থাপন এবং নদীর পানিদূষণ পর্যবেক্ষণে পানি মানসূচক তৈরি করা হয়েছে। তবে কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয় জরুরি। পাশাপাশি পানির অপচয় রোধে সচেতন হতে হবে।
মোতালেব হোসেন সরকার
নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)
কৃষি ও শিল্পে পানির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। পানির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। পানির ব্যবহার আরও দক্ষ করার সুযোগ আমাদের আছে।
শুধু ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর না করে ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ পানির সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণের সময় নদী-খাল ও পানিপ্রবাহের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ানো যেতে পারে।
পানি নিরাপত্তার তিনটি দিক হলো পানির প্রাপ্যতা, ব্যবহারযোগ্যতা ও মান। আমাদের পানি ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় ঘাটতি সমন্বয়ের। সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য কাজ হলেও প্রকল্পগুলোতে এ খাতে আলাদা বাজেট থাকে না। ফলে অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। পানি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে সমন্বিতভাবে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
পানিসম্পদের প্রাপ্যতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও পানির মানের তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করা দরকার। একই সঙ্গে পানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও দূষণরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। আলাদা আলাদাভাবে নয়, একটি কেন্দ্রীয় সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনেই পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তানিয়া হক
অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নিরাপদ পানি আমাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু পানি সরবরাহের সুযোগ থাকলেই যে সবাই সমানভাবে তা ব্যবহার করতে পারছেন, তা নয়। পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবহারের অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় তথ্যঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাড়ির কাছে পানির উৎস না থাকলে পানি সংগ্রহের কাজে যুক্ত নারীর হার ৮২ শতাংশ, পুরুষের ৮ শতাংশ। ফলে পানি ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট জেন্ডার বৈষম্য রয়েছে।
পানি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রান্না ও গৃহস্থালির কাজে নারীরা যে সময় ও শ্রম দিচ্ছেন, তার একটি বড় অংশই অদৃশ্য খরচ। এর প্রভাব পড়ছে নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ওপর। তাই পানি ব্যবস্থাপনাকে শুধু পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটি শাসন ও নীতিনির্ধারণের বিষয়।
আমাদের বড় সংকট হলো সমন্বিত ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্যের অভাব। পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের প্রভাব বিশ্লেষণ এবং নারী-পুরুষভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ জোরদার করতে হবে। নারীদের শুধু পানির ব্যবহারকারী নয়, পানি ব্যবস্থাপনার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতির পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি।
শঙ্কর কুমার বিশ্বাস
পরিচালক, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর
আমাদের বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের কাজের মূল ভিত্তি হলো হাওর ও জলাভূমির সুরক্ষা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। ১৯৭৪ সালে হাওর উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর গঠিত হয়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সুরক্ষা আইন হওয়ার পর আমরা সেই আইনের ভিত্তিতে কাজ করছি।
পানিনিরাপত্তা ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমাদের আইনেও গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের মাস্টারপ্ল্যানের তৃতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। নিরাপদ পানি, কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রতিবেশগত স্থায়িত্বকে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষায়ও আমরা কাজ করছি।
হাওর ব্যবস্থাপনায় আকস্মিক বন্যা, পলি জমা ও পানিপ্রবাহে বাধা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নদী, খাল ও বিলের সংযোগ ফিরিয়ে এনে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সমন্বিত ও প্রকৃতিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হাওর রক্ষা করতে হবে।
মোহাম্মদ মনিরুল আলম
ওয়াশ বিশেষজ্ঞ, পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বিভাগ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ
আমাদের কৃষিতে ব্যবহৃত পানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য নদী-খাল ও অন্যান্য জলাধারের পানি দূষণমুক্ত রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ফিকাল স্লাজ ও অন্যান্য বর্জ্য যথাযথভাবে শোধন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফিকাল স্লাজ নদীতে গিয়ে পড়ছে, যা পানির উৎসকে দূষিত করছে এবং ভবিষ্যতে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। পানি থাকলেই হবে না, ব্যবহারের স্থান পর্যন্ত নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তিগত হ্যান্ডপাম্প ও পানি উত্তোলনও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ওয়াসা ও ডিপিএইচইর কার্যক্রমের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন। শুধু পানি সরবরাহ করাই নয়, সরবরাহ করা পানি ব্যবহারের স্থান পর্যন্ত নিরাপদ অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি জরুরি।
অলোক কুমার মজুমদার
ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম অ্যান্ড অপারেশনস, রেড অরেঞ্জ নেদারল্যান্ডস
পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দূষণ, অপচয় ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমাতে হবে। দেশে প্রায় ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের কাছে বেসিক পানি পৌঁছালেও ৪৭ শতাংশ পানিতে ই-কোলাই পাওয়া যায়। সুয়ারেজের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও শিল্পবর্জ্য এর অন্যতম কারণ। আইন থাকলেও পানিদূষণ রোধে এর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
পানির অপচয়ও বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশে গড়ে ২০ শতাংশের বেশি পানি অপচয় হয়। নন-রেভিনিউ ওয়াটার কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য পানি শোধনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশ বর্জ্য পানি শোধন করা সম্ভব হচ্ছে।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে জরুরি সমন্বয়। ভূগর্ভস্থ পানির বড় অংশ কৃষি ও শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। কৃষির প্রয়োজন বিবেচনায় রেখেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পানি ব্যবহারে মানুষের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা আসবে না।
পানি দূষণ, অপচয়, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা করলেই পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান
উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প
২০১৩ সালের পানি আইনে সুপেয় পানির কথা বলা হলেও এ বিষয়ে আলাদা আইন এখনো হয়নি। আমার মনে হয়, পানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানি ও জন–অংশগ্রহণকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। এসডিজির ৬ নম্বর লক্ষ্যমাত্রাতেও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে।
আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন ও নীতি প্রণয়নের পর সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অবকাঠামোর পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
উজান থেকে ভাটিতে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে যৌথ নদী কমিশনকে কার্যকর করতে হবে এবং জন–অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগানো এবং সেই সঙ্গে তৃণমূলের মানুষদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। তবেই পানিনিরাপত্তা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব।
মো. মাসুদ হাসান
উপনির্বাহী পরিচালক, ভার্ক
পানি নিরাপত্তায় আমাদের বড় সমস্যা শুধু অবকাঠামোর ঘাটতি নয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও সমন্বয়ের অভাবও। মাঠে দেখেছি, একটি নাট বা বাকেটের অভাবে লাখ টাকা দামের টিউবওয়েল দীর্ঘদিন নষ্ট পড়ে থাকে। বরেন্দ্র অঞ্চলে সবুজ দেখা গেলেও ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে। ভোলার মতো এলাকায় এখনো ১২০০ ফুট গভীর থেকে পানি তুলতে হয়।
পানির গুণগত মানও বড় সংকট। একসময় বেসিক পানি কভারেজ ৯৯ শতাংশ বলা হলেও আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নিরাপদ পানির প্রাপ্যতায় ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও রয়েছে। কে কতটা পানি পাচ্ছে এবং কত টাকা দিচ্ছে, তা দেখতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় জরুরি। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে প্রয়োজনীয় জনবল দিতে হবে। আমাদের আইন ও নীতি আছে; এখন দরকার কার্যকর বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
নিশাত সুলতানা
ডিরেক্টর–আইসিসি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
পানির সঙ্গে নারীর সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। গৃহস্থালি ও পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজনে পানি সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত নারী ও কিশোরীদের ওপর পড়ে। অথচ পানির উৎস নির্বাচন, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের মতামত ও নেতৃত্ব উপেক্ষিত থাকে। তাই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোরদেরও সম্পৃক্ত করা জরুরি।
খুলনা ও সাতক্ষীরার এক হাজার ২৬০টি পরিবারের ওপর প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণায় পানি সংগ্রহে নারী ও কিশোরীদের নিরাপত্তাঝুঁকি, নিরাপদ পানির অভাব এবং পানিবাহিত রোগ এবং যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব উঠে এসেছে। পানিসংকটাপন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—সব পর্যায়ে নারীর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের ‘দুর্বার কন্যা’ প্রকল্প কিশোরীদের নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে, যাতে তারা প্রকৃতি, জলবায়ু ও পানি প্রকৃতি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।
যোসেফ হালদার
কান্ট্রি আহ্বায়ক, ফ্যানসা-বাংলাদেশ
২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পর দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোনাপানির সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। চিংড়ি চাষের কারণে পানিসম্পদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, কৃষি ও পুষ্টির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালেও উপকূলের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ এলাকায় লবণাক্ততা থাকছে। এর পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের কর্মকাণ্ডও দায়ী।
পানি খাতে আমাদের অনেক নীতি ও কৌশল আছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন কোথায়? সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ছাড়া কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পাহাড়ে সড়ক নির্মাণের সময় প্রাকৃতিক ছড়া নষ্ট হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলেও ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সবুজায়ন বাড়ানোর আগে এর প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতি বাস্তবায়ন, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও কার্যকর উদ্যোগ এখন সবচেয়ে জরুরি।
সাইফ মনজুর-আল-ইসলাম
টিম লিডার, গো–ফর–ইমপ্যাক্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ
আমাদের দেশে পানির প্রাচুর্য থাকলেও পানিনিরাপত্তায় আমরা এখনো পিছিয়ে। এর বড় কারণ জলবায়ু, অবকাঠামো এবং মানুষের পানিতে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা। নারী, কৃষি, শিল্প—সব ক্ষেত্রেই পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পানি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি দিকের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও তথ্য ভাগাভাগি বাড়াতে হবে। মাঠপর্যায়ে দেখেছি, পানি আইন ও বিধিমালায় স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির কথা থাকলেও অনেক প্রতিনিধি তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট নন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার ও পানি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় জরুরি।
একই সঙ্গে পানি অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকা দরকার। নদী-খালের সঙ্গে মৎস্যচাষি, নৌযান চালকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে খাল খনন ও ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
পানির প্রাপ্যতা, প্রবাহ, গুণমান ও ব্যবহার বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যমান পানির উৎস সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে। উপকূল, হাওর ও খরাপ্রবণ এলাকায় জলবায়ুসহিষ্ণু প্রযুক্তি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কমিউনিটিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বাড়াতে হবে।
পানিসংকটাপন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ ও বিকল্প পানির উৎসের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কৃষি, শিল্প, গৃহস্থালি ও ব্যক্তিপর্যায়ে পানির অপচয় কমিয়ে সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব বণ্টন, সমন্বয় ও জবাবদিহি জোরদার করতে হবে। পানি আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো কার্যকর করতে হবে।
পানিসম্পদে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পানি ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
পানি অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় সরকারকে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বাজেট ও কারিগরি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
পানি নিরাপত্তা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, তথ্য বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
হাসান জাফির তুহিন, চেয়ারম্যান, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। সাইফুল ইসলাম মজুমদার, যুগ্ম সচিব, পলিসি সাপোর্ট অধিশাখা, স্থানীয় সরকার বিভাগ। এস এম যোবায়দুল কবির, যুগ্ম প্রধান, ডেলটা উইং, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন। শিরিন লিরা, সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার, গভর্ন্যান্স ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, এম্বেসি অব সুইজারল্যান্ড ইন বাংলাদেশ। আজমান আহমেদ চৌধুরী, কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। আনোয়ার জাহিদ, সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। মোহাম্মদ আলমগীর,মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পিএসও), পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো)। মোতালেব হোসেন সরকার, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। তানিয়া হক, অধ্যাপক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শঙ্কর কুমার বিশ্বাস,পরিচালক, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর। মোহাম্মদ মনিরুল আলম, ওয়াশ বিশেষজ্ঞ, পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন বিভাগ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ। অলোক কুমার মজুমদার, ডিরেক্টর, প্রোগ্রাম অ্যান্ড অপারেশনস, রেড অরেঞ্জ নেদারল্যান্ডস। মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান, উপনির্বাহী পরিচালক, ডর্প। মো. মাসুদ হাসান, উপনির্বাহী পরিচালক, ভার্ক। নিশাত সুলতানা, ডিরেক্টর–আইসিসি, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। যোসেফ হালদার, কান্ট্রি আহ্বায়ক, ফ্যানসা-বাংলাদেশ। সাইফ মনজুর-আল-ইসলাম, টিম লিডার, গো–ফর–ইমপ্যাক্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ। রঞ্জন কুমার ঘোষ, পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স স্পেশালিস্ট, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।