গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মওদুদ হোসেন আলমগীর, রেজা আলী, সরদার সাখাওয়াত হোসেন ও অধ্যাপক সাহাব উদ্দিন তালুকদার। গতকাল ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়ে
গোলটেবিল বৈঠকে (বাঁ থেকে) মওদুদ হোসেন আলমগীর, রেজা আলী, সরদার সাখাওয়াত হোসেন ও অধ্যাপক সাহাব উদ্দিন তালুকদার। গতকাল ঢাকায় প্রথম আলো কার্যালয়ে

গোলটেবিল বৈঠক

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ঠিক করা দরকার

বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (অস্ট্রেলিয়া) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

দেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার পরিস্থিতি বেশ খারাপ। জরুরি সেবা দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পায়নি। অথচ স্বাস্থ্যপদ্ধতির সদর দরজাই হচ্ছে জরুরি বিভাগ। এর মূল্য দিতে হয় মানুষকে। কিছু বিনিয়োগ ও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে। দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি: অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশি–বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বক্তব্যে এ কথাগুলো উঠে আসে।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (অস্ট্রেলিয়া) ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মূলত জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা জানা–বোঝা এবং সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে কতটা কাজে লাগানো যায়, তা খতিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

চিকিৎসায় নৈতিকতার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রোগীদের বেশি সময় দিতে হবে, মন দিয়ে রোগীর কথা শুনতে হবে, পারলে কম রোগী দেখতে হবে। চিকিৎসকদের চেম্বারে অচিকিৎসকদের বসে থাকতে দেখা যায়। রোগ শনাক্তকরণ প্রতিবেদন জাল করা হয়।

দেশে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠান আয়োজকদের কাছ থেকে প্রস্তাব ও সুপারিশ চান, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা প্রবাসী চিকিৎসকদের কাছ থেকে। সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, লিখিত প্রস্তাব পেলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।

রোগীদের বেশি সময় দিতে হবে, মন দিয়ে রোগীর কথা শুনতে হবে। চিকিৎসকদের চেম্বারে অচিকিৎসকদের বসে থাকতে দেখা যায়। রোগ শনাক্তকরণ প্রতিবেদন জাল করা হয়।
সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কী

অনুষ্ঠানে মূল বিষয় উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল গভর্নমেন্ট ডিপার্টমেন্ট অব হেলথের সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন সিডনির অধ্যাপক রেজা আলী। তিনি বলেন, জরুরি চিকিৎসাসেবার বিষয়টি দেশে একেবারে নতুন নয়। তবে এই সেবা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ অনেক বেশি, সেখানে রোগ শনাক্ত হচ্ছে দেরিতে, অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা হচ্ছে। প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু অনেক বেশি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়াতে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করার পর অধ্যাপক রেজা আলী বলেন, ‘স্বাস্থ্যপদ্ধতির সদর দরজা হচ্ছে জরুরি বিভাগ। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রোগ হাসপাতালে ঢোকে জরুরি বিভাগ দিয়ে। যদি জরুরি বিভাগ ঠিকমতো কাজ করে, তাহলে সমগ্র পদ্ধতি কাজ করবে। যদি জরুরি বিভাগ ব্যর্থ হয়, তাহলে কোনো পদ্ধতিই ঠিকঠাক কাজ করবে না।’

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়ার হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের ৭৯ শতাংশ বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় শক্তিশালী জরুরি সেবা ব্যবস্থার কারণে। জরুরি বিভাগের প্রত্যেক চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য সহযোগী স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রশিক্ষিত। প্রত্যেকেই নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন ও কাজে দক্ষ। বাংলাদেশের জরুরি সেবার জন্য পাঁচটি বিষয় আছে। সেগুলো হচ্ছে—ভৌত অবকাঠামো, রোগ শনাক্তকরণ ও সহায়ক সেবা, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা, রোগীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাব্যবস্থা। বাকি যে পাঁচটি জিনিস দরকার, তা হলো দক্ষ জনশক্তি, ক্লিনিক্যাল পদ্ধতি ও প্রটোকল, তথ্য পদ্ধতি ও ডিজিটাল অবকাঠামো, অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা এবং মাননিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন।

"বাংলাদেশে জরুরী স্বাস্থ্য সেবা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি: অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে" শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর সিডনি প্রতিনিধি কাউসার খান। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা চিকিৎসকেরা বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া চিকিৎসকদের নানা সহায়তা করেন। এদিকে সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল সোসাইটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের সাধারণ সম্পাদক রোকেয়া ফকির কেয়া বলেন, অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি চিকিৎসক আছেন। তাঁদের সংগঠনটি অলাভজনক পেশাজীবী সংগঠন। তাঁরা আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেন। এই সংগঠন এখন বাংলাদেশে কাজ করতে চায়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার ফারহানা হাসান বলেন, অস্ট্রেলিয়াতে জেনারেল প্র্যাকটিশনারদের (জিপি) প্রশিক্ষণের সময় জরুরি চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণও বাধ্যতামূলক। দুটি প্রশিক্ষণ একসঙ্গে চলে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জরুরি চিকিৎসা চালু করার ক্ষেত্রে স্থান হিসেবে বগুড়া বেছে নেওয়া যেতে পারে। সেখানে স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীদের ‘ফার্স্ট এইডের’ (প্রাথমিক চিকিৎসা) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

শুরুতে রোগ যদি ঠিকমতো শনাক্ত হয় তাহলে সমস্যা, জটিলতা কমে বলে মন্তব্য করেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা পায়ের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সায়েদ আহমেদ। তিনি বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ে সমস্যা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে পা কেটে ফেলার সংখ্যা কমে গেছে। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।

বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে চিকিৎসক গোলাম সারওয়ারের। এখন কাজ করছেন অস্ট্রেলিয়াতে। প্রবীণ এই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, জরুরি বিভাগে ট্রায়াজ বা রোগী বাছাই ব্যবস্থা থাকা জরুরি। শুরুতে কে কোন ধরনের রোগী, তা বাছাই করা সম্ভব হলে বুকে ব্যথার রোগীকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে থাকতে হয় না।

বাংলাদেশে কিছু হাসপাতালে মানসম্পন্ন জরুরি চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা আছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেন এভারকেয়ার হাসপাতালের হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. সাহাব উদ্দিন তালুকদার। তিনি বলেন, একটি দুর্বলতা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইমার্জেন্সি মেডিসিন নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি করার আগ্রহ দেখা যায় না। বিষয়টি চিকিৎসা শিক্ষা পাঠক্রমে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

করণীয়

অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা চিকিৎসকেরা সেই দেশে জরুরি বিভাগে কী হয় তার বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি প্রায় প্রত্যেকে বলেন, বাংলাদেশে কী হওয়া দরকার।

বিশিষ্ট অর্থোপেডিক সার্জন ও বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, অনেকে মনে করতে পারেন হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা শুরু করাটা অনেক খরচের ব্যাপার। বাস্তবতা হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাসেবা শুরু করা গেলে ব্যয় কমবে। তিনি পাঁচটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেন এবং প্রতিটি সুপারিশের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে কোর্স চালু, জরুরি বিভাগে জরুরি চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, বড় দুর্ঘটনায় সময় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা, জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে লিখিত প্রটোকল বা গাইডলাইনের ব্যবস্থা করা। তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক সংগঠনের সঙ্গে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ড হতে পারে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট পাভেল আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট রাসেল আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস স্বাস্থ্য বিভাগের সিনিয়র রেসিডেন্ট মেডিকেল অফিসার বিলকিস আকতার।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।