‘কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ কক্সবাজার
‘কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা। ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ কক্সবাজার

কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা

কোস্ট ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন: আজ ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ কক্সবাজারের একটি হোটেলে।

আলোচনা

লুৎফুর রহমান কাজল

মৎস্যজীবী–বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি ও সাবেক সংসদ সদস্য 

 ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কক্সবাজার খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আসিয়ান ও সার্কভুক্ত দেশগুলোর মাঝামাঝি অবস্থানে আছি। মিয়ানমারের সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হলে জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী এখান থেকে রেল বা ট্রান্সপোর্ট চীন পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। একইভাবে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি  পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত খুলবে। মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে যেতে সময় কমবে। কক্সবাজার দুবাই বা দোহার মতো আন্তর্জাতিক হাবে রূপ নিতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দরের ক্ষেত্রেও এখানকার ড্রাফট চট্টগ্রামের চেয়ে বেশি, যা ভবিষ্যতে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়াবে।

১০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় সম্পদ; কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা মাত্র চার-পাঁচ কিলোমিটার এলাকাই সাজিয়েছি, সেটিও অপরিকল্পিতভাবে। বাকি অংশ কীভাবে পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুন্দর করা যায়, সে পরিকল্পনা জরুরি। সবুজ শহরের ধারণা নিয়ে এগোতে হবে। ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাও এখানেই। আমি বিশ্বাস করি, কক্সবাজারকে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারলে এই এক জেলাতেই বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পরিবেশ ও জীবিকার ভারসাম্য দরকার। শিক্ষাক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি। আমাদের এমন শিক্ষা চাই, যা তরুণদের উদ্যোক্তা হতে শেখাবে—কৃষি, পোলট্রি বা পর্যটনে পড়ে যেন তারা নিজে স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদেরও কাজ দিতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ও সুয়ারেজ ব্যবস্থার অভাব—এসব বড় চ্যালেঞ্জ। বর্জ্য সাগরে যাচ্ছে, ফলে পানির রং নীলের বদলে ঘোলা হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ও দূষণের প্রভাবও আমাদের খতিয়ে দেখা দরকার। সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট পানি—অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে লবণাক্ততা বাড়ছে, কয়েক বছরের মধ্যে মিঠাপানি হারানোর আশঙ্কা আছে। এখনই কেন্দ্রীয় সু্৵য়ারেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পানি সরবরাহে উদ্যোগ নিতে হবে।

আবদুল্লাহ আল ফারুক

আমির, কক্সবাজার শহর জামায়াতে ইসলামী

 কক্সবাজার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে এভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু সেটাই হয়েছে। ৫৪ বছরেও কক্সবাজারের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যানও করা যায়নি। মাস্টারপ্ল্যান না থাকার ফলেই আজ অপরিকল্পিত হোটেল-মোটেল, তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খল নগরচিত্র তৈরি হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজার শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এভাবে কোনো পর্যটন নগরী চলতে পারে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাসংকট, বালিয়াড়ি দখল, পাহাড় ও প্যারাবন নিধন। আমরা ইতিমধ্যে অনেক ক্ষতি করে ফেলেছি। তারপরও আমি সামনে তাকিয়ে সম্ভাবনার কথা বলি। আলোচনার মধ্য দিয়ে সচেতনতা তৈরি হলে করণীয় ঠিক করা সম্ভব।

বিশ্বে পর্যটন খাত যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের আশপাশের দেশগুলোর আয় তার প্রমাণ। অথচ কক্সবাজারের আছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, পাহাড় আর সেন্ট মার্টিনের মতো সম্পদ। এগুলো পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে কক্সবাজারকে সুন্দরভাবে সাজানো সম্ভব। যোগাযোগব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি। প্রতি মৌসুমে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে, পর্যটকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসছেন। অথচ কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক জেলায় চার লেন সড়ক হয়েছে—এখানে না হওয়াটা বৈষম্য। মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে মেরিন ড্রাইভ, চকরিয়া, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীতে পর্যটন ও ইকো-ট্যুরিজম সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে শহরের চাপ কমে।

সমুদ্রসৈকতকেই আমরা এখনো ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। রাতে লাইটিং নেই, নিরাপত্তা নেই—ফলে পরিবার নিয়ে পর্যটকেরা স্বস্তি পান না। এগুলো নিশ্চিত করা জরুরি। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, কেব্‌ল কারের মতো উদ্যোগ বেসরকারি খাতে আসতে পারে, সরকারকে নীতিমালা সহজ করতে হবে। পাশাপাশি ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলে মানুষের আচরণ ও সেবার মান উন্নত করতে হবে।

শাহজাহান চৌধুরী

সভাপতি, কক্সবাজার জেলা বিএনপি ও সাবেক সংসদ সদস্য

কক্সবাজারের জন্য তো আলাদা কোনো মাস্টারপ্ল্যানই আমরা করতে পারিনি, আসলে দেশে সামগ্রিকভাবেই মাস্টারপ্ল্যানের সংস্কৃতি নেই। আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। সংসদে থাকতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত একটি কমিটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই কউক গঠনের ধারণা আসে। কউক গঠনের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু শুরু থেকেই এটিকে সঠিক নগরায়ণ বিশেষজ্ঞদের হাতে দেওয়া হয়নি। সেনা বা প্রকৌশল কাঠামোর মধ্যে রেখে উন্নয়ন করা হচ্ছে অ্যাডহক ভিত্তিতে। ফলে কক্সবাজারের উন্নয়ন আজও খণ্ড খণ্ড সিদ্ধান্তনির্ভর। স্থানীয় যারা সমস্যার গভীরতা ও সম্ভাবনার জায়গাগুলো জানি—তাদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা হচ্ছে না।

সমুদ্র নিজেই এক বিশাল সম্পদভান্ডার, কিন্তু এই সম্পদ বোঝা বা কাজে লাগানোর মতো শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি। ট্যুরিজম নিয়ে আমরা শুধু কথায় আগ্রহী, বাস্তবে মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না—সেটাই প্রশ্ন। পর্যটন গড়তে হলে স্থানীয় মানুষদের আগে প্রস্তুত করতে হবে। ইংরেজি ভাষা, আন্তর্জাতিক হোটেলে কাজের দক্ষতা—এসবের জন্য কোচিং ও প্রশিক্ষণ দরকার। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কক্সবাজারের ২০ লাখ মানুষকে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় প্রস্তুত করাই জরুরি।

উখিয়া–টেকনাফ এলাকায় রোহিঙ্গা–সংকটের কারণে স্থানীয় মানুষ চাকরির ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে, যা ভয়াবহ সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে স্থানীয় যুবকদের চাকরিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাস করানো আমাদের জন্য বড় বিপর্যয় হবে। কফি আনানের প্রস্তাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। পানিসংকট সবচেয়ে গুরুতর বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও যদি নাগরিকদের বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা না যায়, তা চরম ব্যর্থতা। ভবিষ্যৎ সরকারকে এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নুর আহমদ আনোয়ারী

আমির, কক্সবাজার জেলা জামায়াতে ইসলামী

 অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে কক্সবাজার শহর আজ বড় সংকটে পড়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করাই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এরই মধ্যে নানা অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। আমার বড় আশঙ্কা হলো—কক্সবাজার থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম যে প্রায় ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত, যার বড় অংশ উখিয়া–টেকনাফ এলাকায়—সেটিও যদি এখনই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় না আসে, তবে কক্সবাজার শহরের মতো একই পরিণতি হবে। আগে থেকেই দখল আর স্থাপনা গড়ে উঠলে পরে মাস্টারপ্ল্যান কাগজেই থেকে যাবে।

এই সৈকত আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর জন্য একটি বাধ্যতামূলক মাস্টারপ্ল্যান করতে হবে, যাতে কেউ এর বাইরে গিয়ে কোনো অবকাঠামো গড়তে না পারে। একই সঙ্গে মেরিন ড্রাইভ সড়ককে শাহপরীর দ্বীপ হয়ে নাফ নদীর তীর পর্যন্ত সম্প্রসারণ জরুরি।

সীমান্তবর্তী নাফ নদী, সাগর, দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ আর পাহাড়—এগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে টেকনাফ বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু টেকনাফ পৌরসভাও কক্সবাজার শহরের পথেই এগোচ্ছে। এটি সীমান্ত এলাকা হলেও ভবিষ্যতে একটি মেগা সিটিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যটনের পাশাপাশি এখানে বাণিজ্যেরও বিশাল সুযোগ আছে। টেকনাফ স্থলবন্দর উন্নত করে চালু করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় অর্জন সম্ভব। তাই এখনই মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে ভাবতে হবে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়েও আমাদের ভাবনায় জটিলতা আছে। পরিবেশ ও আইনের নানা বেড়াজালে আমরা সম্ভাবনাকে আটকে রেখেছি। সাবরাং ইকোনমিক জোন, নাফ ট্যুরিজম পার্ক ও জালিয়ার দ্বীপ—এসব উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে উখিয়া–টেকনাফ ও পুরো কক্সবাজারের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।

রেজাউল করিম চৌধুরী

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, কোস্ট ফাউন্ডেশন

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে একটি সংস্থা আছে। আমার প্রশ্ন হলো, তাদের আদৌ কোনো মাস্টারপ্ল্যান আছে কি না। মাস্টারপ্ল্যান থাকলে সেটি অবশ্যই কক্সবাজারের সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে করতে হবে। এই পরিকল্পনা এমন হওয়া উচিত, যাতে জনবসতি মেরিন ড্রাইভের দিকে চাপ না বাড়ায়। খুরুশকুলের দিকে যেহেতু দুটি সেতু হয়েছে, জনবসতিকে সেদিকে সরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা দরকার। কৃষিজমি নষ্ট করার মতো বিলাসিতা আমাদের করা চলবে না। পকেটে ডলার থাকবে, কিন্তু চাল কেনা যাবে না—এমন পরিস্থিতি যেন না আসে।

আমরা প্রাইভেট সেক্টর উন্নয়নের কথা বলি, অথচ বিনিয়োগের ৭০ শতাংশই সরকারের। উন্নত দেশে উল্টো চিত্র—প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে থাকে। সরকারের প্রতিটি দপ্তরের গেস্টহাউস থাকলে হোটেলশিল্প টিকবে কীভাবে? এসব গেস্টহাউস ভর্তুকিতে চলে। এগুলো ভাড়া দিয়ে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলকভাবে চালানো যেতে পারে। এতে সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার হবে।

কক্সবাজারের মানুষের জীবন প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। লবণ, পানি, সামুদ্রিক মাছ, সৈকত—সবকিছুই ঝুঁকিতে। উখিয়া ও আশপাশে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যেই পয়সা দিয়েও মিঠাপানি পাওয়া যাবে না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও মৌলিক সমস্যা। খুরুশকুলের মতো সুন্দর জায়গায় দুর্গন্ধে থাকা যায় না। অথচ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জাতিসংঘের অর্থায়নে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব হয়েছে। সেখানে ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট, পানি শোধন, প্লাস্টিক আলাদা করে পুনর্ব্যবহার—সবই করা গেছে। তাহলে কক্সবাজার শহরের ১২টি ওয়ার্ডে এটা করা যাবে না কেন?

সরওয়ার কামাল

সাবেক মেয়র, কক্সবাজার পৌরসভা

আমি মূলত কক্সবাজার পৌর শহরের কথাই বলতে চাই। আমাদের দায়িত্বকালে আমরা দেখেছি—কক্সবাজার পৌরসভা সরকার থেকে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল ফান্ড পায়। এটাই বড় একটি সমস্যা। আমরা সরকারের অনুমোদন নিয়ে কক্সবাজার পৌর শহরের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান এবং ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান করতে চেয়েছিলাম। সেটি করা গেলে শহরটি অনেক আগেই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যেত। কিন্তু সে সহযোগিতা আমরা পাইনি।

২০১৩ সালের দিকে একটি মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছিল, যা কক্সবাজার পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তৈরি হয়। তখন আমরা স্পষ্টভাবে বলেছিলাম—কক্সবাজারের বিশিষ্টজনদের মতামত নিয়ে এই পরিকল্পনা করতে হবে, ঢাকায় বসে যেন মাস্টারপ্ল্যান না হয়। বাস্তবে দেখা গেল ঢাকায় বসেই পরিকল্পনাটি করা হলো, যা আমাদের কোনো কাজে আসেনি। এখন আবার কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নতুন করে মাস্টারপ্ল্যানে হাত দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, অতীতের ভুলগুলো যেন আর না হয়।

পৌর শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি হলো সুপেয় পানির সংকট।  কক্সবাজার শহরের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ড্রেনের জন্য একসময় ইউজি–থ্রি প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু একটি ড্রেন ছাড়া বাকিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি, টাকা ফেরত গেছে। পরিকল্পিতভাবে ড্রেনগুলো করা গেলে জলাবদ্ধতা থাকত না।  যানজটও বড় চ্যালেঞ্জ। অবৈধ টমটম বন্ধ করতে পারলে ধীরে ধীরে আধুনিক সিটি বাস চালু করা সম্ভব। সমুদ্রসৈকত পৌর এলাকার মধ্যেই, কিন্তু বিচ ম্যানেজমেন্ট উন্নত করতে হবে।

পর্যটন টেকসই করতে হোটেল আর সমুদ্র দেখা ছাড়াও শিশু পার্ক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম, কেব্‌ল কার দরকার। রাখাইন সংস্কৃতি, পুরোনো মসজিদ ও আদিনাথ মন্দিরকে পর্যটনবান্ধব করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো সেন্ট্রাল এসটিপি স্থাপন। সমুদ্র রক্ষা না করতে পারলে পর্যটনও টিকবে না—এটাই বাস্তবতা।

শামীম আল ইমরান

উপসচিব ও প্রশাসক, কক্সবাজার পৌরসভা

কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিওপলিটিক্যালি, কক্সবাজারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত মিয়ানমারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং এটি ইস্ট–সাউথইস্ট এশিয়ার সঙ্গে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পাহাড়, সমুদ্র, প্যারাবন এবং বিভিন্ন বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য আছে, যা ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। জেলা প্রশাসন ও সরকারি বিভাগগুলো যখন অবকাঠামো উন্নয়ন করে, বন বিভাগ সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণী রক্ষার জন্য বাধা সৃষ্টি করে। এ ভারসাম্য রক্ষা করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সীমান্তের অস্থিতিশীলতা ও হঠাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি—যেমন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আনুষ্ঠানিক লোকসংখ্যা ১২ লাখ হলেও প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি—টেকসই পরিকল্পনার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মের হার ও জনসংখ্যার চাপ নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। এ জন্য দ্রুত প্রত্যাবাসন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যাপ্ত ফান্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

শহরের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোও বড়। সুপেয় পানির ঘাটতি আছে, বাঁকখালী নদী থেকে গ্রাউন্ড ও সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে ৫০০০ হাউসে পানি সরবরাহ প্রকল্প প্রায় শেষ পর্যায়ে। যানজট, বিশেষ করে অতিরিক্ত ট্যুরিস্টের কারণে রাস্তাঘাটে চাপ বেড়ে গেছে। হকার ও পার্কিং সমস্যা শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও চ্যালেঞ্জের মধ্যে অন্যতম। পৌরসভার নতুন উদ্যোগ ও জাইকার অর্থায়নে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে, শহরের সব ময়লা–আবর্জনা সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনঃব্যবহার করা হবে।

অলক বিশ্বাস

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, কক্সবাজার

আমি যখন কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়নের কথা বলি, তখন ‘টেকসই’ শব্দটাতেই আমি সবচেয়ে বেশি জোর দিতে চাই। পরিকল্পনায় ঘাটতি থাকলে উন্নয়ন যত বড়ই হোক, তা টিকবে না। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। আমাদের ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভে নিরাপত্তা, দুর্ঘটনায় উদ্ধার বা জরুরি সাড়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত আছে কি না—সেটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কক্সবাজারের বর্তমান নিরাপত্তাব্যবস্থার দিকে তাকালেও উদ্বেগের জায়গা আছে। পুলিশের জনবল নির্ধারিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর ২০২৪–২৫ পেরিয়ে গেলেও সেই জনবল বাড়েনি। অথচ স্থানীয় প্রায় ২৮ লাখ মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা। অপরাধের একটি অংশ তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত—এই বাস্তবতায় একই জনবল দিয়ে বাড়তি নিরাপত্তা, তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া সামাল দেওয়া কঠিন।

কক্সবাজারের উন্নয়ন বলতে আমরা মূলত পর্যটনকেই বুঝি। কিন্তু আমরা যে পর্যটককে স্বাগত জানাই, তার নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করতে পারছি? ট্যুরিস্ট পুলিশ আছে ঠিকই, কিন্তু এত বছরেও তাদের নিজস্ব ভবন বা অফিস নেই। এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দুর্বল থাকাই স্বাভাবিক।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তৈরি সংকটে আমাদের সামাজিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অবৈধভাবে এনআইডি তৈরি, বাসাভাড়া, নানা সনদ—এসবের পেছনে স্থানীয় কিছু দুষ্ট মানুষের হাত রয়েছে। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই অপরাধী চক্রের মোকাবিলায় সামাজিকভাবে সম্মিলিতোবে কাজ করতে হবে।

মাদকের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা কঠিন। বাংলাদেশে মাদক উৎপাদিত হয় না, কনজিউমারকেও সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আমরা শুধু রুটে ইন্টারসেপ্ট করতে পারি। চেষ্টা হচ্ছে, উদ্ধার বাড়ছে, কিন্তু সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয়।

খন্দকার মাহমুদ পাশা

উপপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার

টেকসই উন্নয়নের মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরিবেশ, জনসংখ্যা, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। কক্সবাজারে জনসংখ্যা ও ভাসমান পর্যটক সংখ্যা বেশি; তাই অবকাঠামো, যানজট, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় পরিকল্পনা অপরিহার্য। পর্যটন বৃদ্ধিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুলিশি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত ট্যুরিস্ট পুলিশ থাকা জরুরি। শহর উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, বন্য প্রাণী, জলাভূমি ও বন সংরক্ষণ একসঙ্গে করা না হলে কোনো প্রকল্পই টেকসই হবে না।

কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। এখানে পাহাড়, সমুদ্র, নদী ও অন্যান্য জলাশয় মিলিয়ে একটি অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মান উন্নয়ন, যা কক্সবাজার জেলা অফিস বাস্তবায়ন করছে। তবে চ্যালেঞ্জগুলো জটিল। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একটি বড় উদ্বেগ; নদী ও সমুদ্রের প্লাস্টিক খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে, বাতাসে ছড়িয়ে গিয়ে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতেও গুরুত্বপূর্ণ।

কক্সবাজারকে দেশের ১৩টি ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়ার মধ্যে রাখা হয়েছে। সোনাদিয়া, সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার পেনিসুলা—এই তিন অঞ্চলে বিশেষভাবে সংরক্ষণ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে কক্সবাজার পেনিসুলায় মৃত কচ্ছপের সংখ্যা ৯৮টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। কচ্ছপ প্রাকৃতিক স্ক্যাভেঞ্জার এবং সমুদ্রের অক্সিজেন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।

অজিত দাশ

সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), কক্সবাজার জেলা কমিটি

কক্সবাজারের পান, সুপারি এবং লবণশিল্প যুগোপযোগী হুমকির মুখে। একসময় পানের জন্য বিখ্যাত কক্সবাজার আজ হারিয়ে গেছে, সুপারি চাষ সম্প্রসারিত হলেও সরকারি সহায়তা নেই। ঐতিহ্যবাহী লবণ ও শুঁটকিশিল্পও ব্যক্তি উদ্যোগে কিছুটা চলছে, কিন্তু আধুনিকীকরণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এখনো প্রচলিত নয়। এই শিল্পগুলো টেকসইভাবে সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন শুধু সৌন্দর্য বা পর্যটন বৃদ্ধি নয়; এটি এখানকার ঐতিহ্য, শিল্প, অবকাঠামো এবং পরিবেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত।

পর্যটন ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। নাজিরারটেক, সেন্ট মার্টিন ও অন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধা নেই; পর্যটকেরা সমুদ্র ও হোটেলের বাইরে কোনো কার্যকর বিনোদন বা অবকাশ উপভোগ করতে পারেন না। সরকারি প্রতিষ্ঠান যত্রতত্র পাহাড়, সমতল ও বালুচরে সাইনবোর্ড বসিয়ে দখল করেছে, ফলে পর্যটন সম্ভাবনা সীমিত হচ্ছে।

যানজট কক্সবাজারের বড় চ্যালেঞ্জ। ডলফিন মোড় ও শহরের প্রধান রাস্তা সংকটে পড়লে বিকল্প পথ নেই। মাঝের ঘাট থেকে থানার মোড় পর্যন্ত নতুন রাস্তা হলেও শহরের রক্ষা বাঁধ ও প্রধান সড়ক উন্নয়নের জন্য আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। টেকনাফ স্থলবন্দর সংস্কার, সোনাদিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় জায়গাগুলো উন্নয়নের জন্য সরকার ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সমন্বয় অপরিহার্য। শাহপরীর দ্বীপ, ইনানি, লাবণী পয়েন্ট, কলাতলী পয়েন্টসহ পর্যটক স্পটগুলো আধুনিক ও নিরাপদভাবে সাধারণ পর্যটকের জন্য সাজানো উচিত।

শিক্ষাক্ষেত্রেও কক্সবাজার পিছিয়ে। দেশের অন্যান্য জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও কক্সবাজারে এখনো কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। পর্যটন, শিল্প, অবকাঠামো ও শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় শিল্পের সমন্বয় অপরিহার্য।

মুকিম খান

সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতি

 কক্সবাজার বিশ্বদরবারে একটি পর্যটন নগরী হিসেবে সুপরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কক্সবাজার কি সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠেছে? বাস্তবতা বলছে, এখনো তা হয়নি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ হয়েছে, তবে সরকারি উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট।

এর ফলে কক্সবাজারের ট্যুরিজম সেক্টরের অবদান দেশের জিডিপিতে কমে এসেছে। আগে এটি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল, এখন ৩ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। এটি আমাদের জন্য চিন্তার বিষয়। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা জরুরি।

কক্সবাজারে মূলত স্থানীয় পর্যটনের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। আন্তর্জাতিক পর্যটক আসেন না, কারণ তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা, সুযোগ-সুবিধা এবং পরিবেশ আমরা এখনো দিতে পারিনি। এখানে প্রায় ৪৫০–৫০০ হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা ৬০–৭০ হাজার। তবু পর্যটকের চলাচল অনেক সময় বিঘ্নিত হয়। যানজট, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং এবং বিশৃঙ্খলা পর্যটনকে প্রভাবিত করছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে উন্নত পর্যটন কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

মেরিন ড্রাইভের প্রতিটি পয়েন্টে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা ও পর্যটকদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা আনা জরুরি। পাহাড়ের অঞ্চলে কেব্‌ল কার, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, সিটি ট্যুরের মতো সুবিধা প্রয়োজন। এসব ব্যবস্থা সরকারি নীতিনির্ধারণ, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আনা যেতে পারে।

পর্যটন, বিনোদন, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রেখে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরীতে পরিণত করা সম্ভব। সরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় অংশীদারত্ব এবং সুসংগঠিত নীতিমালার মাধ্যমে কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হলে এটি কেবল দেশের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

মাহবুবুর রহমান

সভাপতি, কক্সবাজার প্রেসক্লাব

 কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন মানে শুধু নগরীর সৌন্দর্য বা পর্যটনের বৃদ্ধি নয়; এটি কক্সবাজারবাসী ও সারা দেশের মানুষের কল্যাণে প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন, কক্সবাজারে টেকসই উন্নয়নের ধারণা কি বাস্তবায়িত হচ্ছে? বর্তমান সরকার আংশিকভাবে শুধু নিজের বিনোদন, অফিস বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ফুটবল একাডেমি, সরকারি প্রশাসনের ৭০০ একর জমি—সবকিছু কক্সবাজার শহরেই সীমাবদ্ধ। অথচ টেকনাফ, কুতুবদিয়ার মতো অন্যান্য জায়গা আছে, সেখানে উন্নয়ন করা যায়নি। কক্সবাজারের সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণাগার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ বিভাগ—এসব প্রতিষ্ঠানের কাজও পর্যাপ্ত নয়।

যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নেও ঘাটতি আছে। চারটি মাধ্যমের মধ্যে তিনটি রয়েছে—সড়ক, রেল, আকাশপথ; কিন্তু নদীপথে যোগাযোগ নেই। অতীতের স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালু করলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে পারত। সড়কও ছয় লেনে উন্নীত করা জরুরি, কারণ বর্তমান পথ মৃত্যুর ফাঁদ। মেরিন ড্রাইভ পর্যটনের জন্য প্রধান আকর্ষণ হলেও কলাতলী মোড় থেকে সংযোগ রাস্তা ৩০ বছর ধরে অসম্পূর্ণ। মানুষকে ধীরে ধীরে প্রকৃতি দেখার সুযোগ দিতে মেরিন ড্রাইভকে সাধারণ চলাচলের জন্য নয়, পর্যটনের জন্য নিরাপদ করা জরুরি।

কক্সবাজার শহরের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শুধু উঁচু তলার হোটেল বানালেই পর্যটন উন্নয়ন হয় না; জনবান্ধব মাস্টারপ্ল্যান দরকার, যেখানে স্থানীয়রা অংশ নেবে। পরিবেশের কথা বলা হলেও আশপাশে তামাক চাষ পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে, যা বন্ধ হওয়া উচিত।

কক্সবাজারের টেকসই উন্নয়ন সবার জন্য কার্যকর করতে সরকারি নীতি, স্থানীয় অংশীদারত্ব, নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। এগুলো হলে কক্সবাজার শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটকদেরও আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

সুপারিশ

  • কক্সবাজার উন্নয়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

  • মেরিন ড্রাইভ, পাহাড় ও দ্বীপাঞ্চল পর্যটনের জন্য পরিকল্পিতভাবে উন্নত করা।

  • শহরের বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

  • পর্যটন নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা শক্তিশালী করা।

  • স্থানীয়দের কারিগরি ও পর্যটন প্রশিক্ষণ দেওয়া।

  •  পরিবেশ, বন ও জলাশয় সংরক্ষণ করা।

অংশগ্রহণকারী: লুৎফুর রহমান কাজল, মৎস্যজীবী–বিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটি ও সাবেক সংসদ সদস্য। আবদুল্লাহ আল ফারুক, আমির, কক্সবাজার শহর জামায়াতে ইসলামী। শাহজাহান চৌধুরী, সভাপতি, কক্সবাজার জেলা বিএনপি ও সাবেক সংসদ সদস্য। নুর আহমদ আনোয়ারী, আমির, কক্সবাজার জেলা জামায়াতে ইসলামী। রেজাউল করিম চৌধুরী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, কোস্ট ফাউন্ডেশন। সরওয়ার কামাল, সাবেক মেয়র, কক্সবাজার পৌরসভা। শামীম আল ইমরান, উপসচিব ও প্রশাসক, কক্সবাজার পৌরসভা। অলক বিশ্বাস, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি)-কক্সবাজার। খন্দকার মাহমুদ পাশা, উপপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার। অজিত দাশ, সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার জেলা কমিটি। মুকিম খান, সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতি। মাহবুবুর রহমান, সভাপতি, কক্সবাজার প্রেসক্লাব। মোহাম্মদ হাসান সিদ্দিকী, সভাপতি, টেকনাফ উপজেলা বিএনপি। জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন, কক্সবাজার। আব্দুল কুদ্দুস, কক্সবাজার প্রতিনিধি, প্রথম আলো। তুহিন সাইফুল্লাহ, সম্পাদক, আঞ্চলিক সংবাদ, প্রথম আলো। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।